সোমবার,  ১৬ জুলাই ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৬, ২১:১৯:১৯
ফেয়ারলি হাউস

ঢাকায় একমাত্র ইংলিশ গার্ডেন

মোকারম হোসেন
বছর দশেক আগের কথা। লোকমুখে অনেক দিন ধরেই গুঞ্জন চলে, ফেয়ারলি হাউস ভেঙে সেখানে আকাশচুম্বী দালান হবে। সেখানে একটি ইংলিশ রীতির হোম গার্ডেন ছিল। বাড়িটি সংরক্ষিত হওয়ায় সেখানে কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না। অনেক কষ্টে একদিন বাড়িতে ঢোকার অনুমতিও মিলল। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মাকে নিয়ে গেলাম সেখানে। তিনি ১৯৬৫ সালের দিকেই বাগানটির প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পেয়েছিলেন।
তখন বিচিত্র বৃক্ষে সুশোভিত ছিল এ বাগান। পথের পাশে ও অন্যত্র বড় বড় আমগাছ, পূর্ব পাশের একটি গাছে জেঁকে বসা নীলমণিলতা, মাঝখানে চওড়া লন, চৌচালা ঘরের পোর্টিকোর গায়ে সেঁধে-থাকা মস্ত বাগানবিলাস, দূরে জ্যাকারান্ডা, কুরচি ও কাঠগোলাপ, আঁকাবাঁকা কেয়ারিতে বিন্যস্ত গুল্ম ছিল এর উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ। এখন আর এসবের তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। সম্প্রতি বেশ কিছু গাছ কেটে তৈরি করা হয়েছে অনেকগুলো চালাঘর।
রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউর বাংলামোটর-সংলগ্ন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাশেই বাড়িটির অবস্থান। ২ দশমিক ৩২ একর (সাত বিঘা) জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বাড়িতে আছে অ্যাজবেস্টার আচ্ছাদিত ৫ দশমিক ৫০০ বর্গফুট আয়তনের একটি বাংলো। রয়েছে তিন হাজার বর্গফুটের দুটি কটেজ। কটেজ-লাগোয়া সবুজ ঘাসের চত্বর। শেষ মাথায় একটি ছোট্ট ফোয়ারা, অ্যাঙ্কর সাইন যেগুলো প্রায় পরিত্যক্ত।
দ্বিজেন শর্মা তাঁর এক লেখায় বাড়িটি সম্পর্কে তুলে ধরেছেন এভাবে : ‘প্রকৃতি-লেখক মোকারম হোসেন সম্ভবত ২০০৫ সালের কোনো এক সময় বাগান-বিষয়ক একটি বইয়ের গল্পের খোঁজে ফেয়ারলি হাউসে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যান। দেখলাম বাগানটি আগের মতোই আছে, তবে অযতেœ মলিন। বাড়ির লোকেরা কেউই এই হাউস-উদ্যানের ইতিবৃত্ত জানাতে পারলেন না। কয়েক দিন পর আমেনে ইস্পাহানির সঙ্গে দেখা। তাঁকে চিনি অনেক দিন তাঁদের গার্ডেন ক্লাবে যাতায়াতের সুবাদে। ফেয়ারলি হাউসের বাগান দেখার কাহিনি তাঁকে বললাম। তথ্যাদি জোগাড়ের আশ্বাস দিলেন।’ আমেনে ইস্পাহানির কথার সূত্র ধরে এই বাড়িটির একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস উদ্ধার সম্ভব হয়। তিনি চিঠি লিখেছিলেন ইংল্যান্ডবাসী মাইকেল হিল্ডকে, যিনি একসময় ফেয়ারলি হাউসে থাকতেন। চিঠির উত্তর এল দ্রুত।
চিঠির বর্ণনামতে, খাজা শাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে পুরনো জয়েন্ট রিভার কোম্পানি পরীবাগের আমবাগানে এ জমি কেনেন। সেখানে ১৮৫০ সালে বাড়িটি বানান টেড বেরি। বাগানের নকশা তৈরিতে তিনি কলকাতার হর্টিকালচারাল গার্ডেন্সের সাহায্য নিয়েছিলেন। ঘর পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে অ্যাভিনিউর আদলে আমগাছের একটি সারি রাখা হয় অন্য বাগানের সঙ্গে। ১৮৫৪ সালে মাইকেল এসে বাগানটি নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলেন।
বাগানের সরলরৈখিক জ্যামিতিক গড়ন বদলে ঋজু ঘোরালো কেয়ারিতে লাগানো হয় নানা জাতের গুল্ম। আর ফাঁকে ফাঁকে কলাবতী ও মৌসুমি ফুল। মাঝখানের এক একর আয়তনের লনের একপাশে আমগাছের তলার ছোট একটি সুইমিংপুল ঘিরে ছিল অনেকটা বাঁধানো জায়গা। মাইকেল নানা রঙের বাগানবিলাস লাগিয়ে সেগুলো গাছে তুলে দেয়। লনের পাশে ছিল চিতাফুলের একটি কেয়ারি, লালচে কুন্দ, নীলমণিলতা ও গন্ধরাজ। আরও ছিল জ্যাকারান্ডা, কৃষ্ণচূড়াসহ কিছু বড় বড় ফুলগাছ।
বাড়িটির নিসর্গ নির্মাণে যে উদ্যানরীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তা মূলত ইংলিশ গার্ডেনেরই একটি ধারা। সতের শতকি ফর্মাল ইংলিশ গার্ডেন আঠোরো শতকে রোমান্টিক শৈলীতে পরিবর্তিত হতে থাকে। তখন উদ্যানপ্রেমী জমিদারদের গোটা প্রাসাদ ঘিরে সবুজ লন, সীমানায় বড় বড় গাছ- যেগুলো পাশের গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে মিশে গিয়ে বাগানের আয়তন বাড়িয়ে দিত। এখানে গাছের সারি, পথ, আঁকাবাঁকা ঝিলের আদলের জলবিন্যাস বাগানকে প্রকৃতির কাছে টেনে নেয়, তবে তাতে আরণ্যক খেয়ালের বদলে থাকে সামঞ্জস্য, সৌম্য ও সমানুপাত। জমিদারদের ভিলার এসব বিশাল উদ্যান উনিশ শতকের শহরে পৌঁছে অনিবার্যভাবেই ছোট হতে থাকে। তাই আজকের ইংল্যান্ডের ব্যক্তিগত বাগানগুলো সবই আঠারো শতকি সমস্ত উদ্যানের মিনিয়েচার ফর্ম। ফেয়ারলি হাউসের বাগানও তাই। সম্ভবত ঢাকায় এটিই একমাত্র ইংলিশ গার্ডেন। ব্রিটিশ আমলে ফেয়ারলি হাউসে সাদা চামড়ার সাহেবদের নিয়মিতভাবে আসা-যাওয়া করতে দেখা যেত। এসব সাহেবের কেউ কেউ স্টিমার কোম্পানির বড় কর্মকর্তা ছিলেন, কেউ সারেংয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রথম ১৮৩৪ সালে যান্ত্রিক স্টিমার চলাচল শুরু হয়।
ঢাকার ইতিহাস লেখক যতীন্দ্রমোহন রায়ের বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে ইংরেজ শাসকেরা কলকাতা-ঢাকা-আসাম পথে ইঞ্জিনচালিত স্টিমার সার্ভিস চালু করেন। কলকাতার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ সহজ করে তুলতে ব্রিটিশ মালিকানাধীন সম্মিলিত স্টিমার কোম্পানি (আইজিএ) ও রেল কোম্পানি মিলে গোয়ালন্দের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় স্টিমার সার্ভিস চালু করে। সম্ভবত সে সময়েই আইজিএ ও রেল কোম্পানির যৌথ প্রচেষ্টায় ঢাকায় ফেয়ারলি হাউস গড়ে ওঠে।
বর্তমানে ফেয়ারলি হাউসে প্রবেশ খুব সহজ নয়। বিআইডব্লিউটিএ নামক অভ্যন্তরীণ জলপরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে বা হাউসের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে একপলক দেখা যেতে পারে।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close