বুধবার,  ১৭ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০১৬, ২২:২১:০৫

ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য কুমিল্লার ময়নামতি

নীলিমা টিনা
কুমিল্লা শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে কোটবাড়ি বা ময়নামতি অবস্থিত। মধ্যযুগে বৌদ্ধ রাজত্বের রাজধানী ছিল এটি। ঐতিহাসিকদের মতে, রাজা মানিকচন্দ্রের স্ত্রী রানী ময়নামতির নামানুসারে এই অনুচ্চ পাহাড়ি এলাকার নাম রাখা হয় ময়নামতি। বিপুল প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে এখানে। শালবন বিহার, আনন্দবিহার প্রভৃতি বৌদ্ধ সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষ ময়নামতিতেই রয়েছে। ১৯৫৫ সালে এসব নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। বৌদ্ধধর্ম ছাড়াও এখানে জৈন ও হিন্দু দেবদেবীর মূর্তিও রয়েছে। নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের জন্য রয়েছে একটি জাদুঘর। ময়নামতি এলাকা লালমাই ও হিলটিয়া নামেও পরিচিত।
 
ময়নামতি প্রত্নস্থলের কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনা....
শালবন বৌদ্ধ বিহার
শালবন বৌদ্ধ বিহার বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। লালমাই-ময়নামতি প্রত্নস্থলের অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনার একটি এই বৌদ্ধ বিহার। এটি ১২শ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। লালমাই পাহাড়ের মাঝামাঝি এলাকায় এ বিহারটির অবস্থান। বিহারটির আশপাশে একসময় শাল-গজারির ঘন বন ছিল বলে বিহারটির নামকরণ হয়েছিল শালবন বিহার।
 
ইটখোলা মুড়া
ময়নামতিতে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতাত্ত্বিক সৌধস্থল। এটি সদর উপজেলার কোটবাড়ি সড়কের ওপারে রূপবান মুড়ার উল্টোদিকে অবস্থিত। প্রাচীনকাল থেকেই এই স্থানটি ইট পোড়ানোর খনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ জন্য এর এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
 
কোটিলা মুড়া
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট অধিদপ্তরের ভেতরে অবস্থিত এটি ১ হাজার ২০০ বছরের পুরোনো একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। খননের ফলে এখানে পাশাপাশি নির্মিত প্রধান তিনটি বৌদ্ধ স্তূপের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এ স্তূপগুলো বৌদ্ধধর্মের ত্রি-রতেœর (বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ) প্রতীক। খননে সাত-আট শতকের দুটি পাথরের মূর্তি, প্রচুর অদগ্ধ সিলমোহর ও নিবেদন স্তূপ ও শেষ আব্বাসীয় খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহর (১২৮২-১২৫৮) একটি স্বর্ণ মুদ্রা পাওয়া  গেছে। তাই স্থাপনাটি সাত শতক থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত কার্যকর ছিল বলা যায়।
 
রূপবান মুড়া
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতে রূপবান মুড়া অষ্টম শতাব্দীরও আগে নির্মিত। খননের পর এখানে একটি বিহার, একটি মন্দির, একটি ছোট স্তূপ ও একটি বেদির স্থাপত্য নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে।
 
চারপত্র মুড়া
চারপত্র মুড়া ময়নামতির আরেকটি আলোচিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনস্থল। এটি লালমাই শৈলশিরার উত্তরাংশে  সেনানিবাসের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থিত। খননের ফলে এখানে ছোট  একটি হিন্দু পীঠস্থান বা মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পরিকল্পনা, আকৃতি, স্থাপত্য নকশা ও অলঙ্করণের দিক থেকে এ মন্দির বিখ্যাত।
 
ময়নামতি জাদুঘর
ময়নামতির বিহারগুলো খননের ফলে অনেক মূল্যবান সামগ্রী  খুঁজে পাওয়া যায়। এসব পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য ১৯৬৫ সালে কোটবাড়ির শালবন বিহারের দক্ষিণ পাশে এ জাদুঘর স্থাপন করা হয়।
 
এ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে স্থাপত্যসমৃদ্ধ ধ্বংসাবশেষের ভূমি-নকশা, ময়নামতিতে পাওয়া স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, ব্রোঞ্জ ও তামার তৈরি সামগ্রী, লোহার সামগ্রী। এ ছাড়া রয়েছে মাটির তৈরি বিভিন্ন খেলনা, কাঠের নিদর্শন, তুলট কাগজে লেখা প্রাচীন হস্তলিপির পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন নমুনার মৃৎপাত্র ইত্যাদি।
 
ময়নামতির ওয়ার সিমেট্রি
ময়নামতি রণ সমাধিক্ষেত্র মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) নিহত ভারতীয় (তৎকালীন) ও ব্রিটিশ সেনাদের কবরস্থান। এটি ১৯৪৩-১৯৪৪ সালে নির্মিত হয়। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে সেনানিবাসের খুব কাছে এই যুদ্ধ সমাধির অবস্থান। কমনওয়েলথ ওয়্যার গ্র্যাভস কমিশন (সিডব্লিউজিসি) সমাধিক্ষেত্রটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করে। প্রতিবছরের নভেম্বরে সব ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কুমিল্লা ছিল যুদ্ধের সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্র, বিমান ঘাঁটি, আর ১৯৪৪ সালে ইস্ফলে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে চতুর্দশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর। এ সমাধিক্ষেত্রে ৭৩৬টি কবর আছে। যুদ্ধের সময় ও পরে বিভিন্ন স্থান থেকে মৃত সৈনিকদের এনে এখানে সমাহিত করা হয়।
 
সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর আছে। এখানে সমাধিক্ষেত্রের ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলায় লিপিবদ্ধ করে একটি দেয়াল ফলক লাগানো আছে। ভেতরে সরাসরি প্রশস্ত পথ আছে, যার দুপাশে সারি সারি কবর ফলক। ধর্ম অনুযায়ী সেনাদের কবর ফলকে নাম, মৃত্যুর তারিখ, পদবির পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক লক্ষ করা যায়।  প্রশস্ত পথ ধরে সামনে গেলে সিঁড়ি দেওয়া বেদি দেখা যাবে। এর দুপাশে আরও দুটি তোরণ ঘর আছে। এ পথ ধরেই সমাধিক্ষেত্রের পেছন দিকের অংশে যাওয়া যায়। সেখানেও রয়েছে আরও বহু কবরের ফলক। সমাধিক্ষেত্রের সামনের দিকে ব্যতিক্রমী একটি কবর দেখা যায়। সেখানে একসঙ্গে ২৩টি কবরের ফলক দিয়ে একটা স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। এই স্থানটি মূলত ২৩ জন বিমানসৈনিকের একটি গণকবর।
 
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে কুমিল্লা ৯৬ কিলোমিটারের পথ। রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে বিভিন্ন বাসে সরাসরি যেতে পারেন। সময় লাগবে মাত্র দুই ঘণ্টা। বাসভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও  ফেনীর যেকোনো বাসে চড়েও পৌঁছাতে পারেন কুমিল্লা। ইচ্ছে করলে  রেলপথে যেতে পারেন। তবে সময় বেশি লাগবে।
 
আবাসিক ব্যবস্থা
কুমিল্লায় রাতে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। এক রাতের জন্য প্রতি রুমে ভাড়া পড়বে ২০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে। ভ্রমণ শেষে চলে যাওয়ার সময় কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খদ্দরের পোশাক ও মাতৃভান্ডারের রসমালাই নিয়ে যেতে ভুলবেন না।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close