সোমবার,  ২৩ এপ্রিল ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৯:৪৫:৪৪

রহস্যময় আলুটিলা গুহায় একদিন

ফেরদৌস জামান
দেশের পূর্ব-দক্ষিণের জেলা চট্টগ্রাম পেরোচ্ছি, বৃষ্টিভেজা কালো সে পথ যেন বিশাল সবুজ চাদরের ওপর পড়ে থাকা একটা অজগর সাপ। অজগরটা আমাদের বহনকারী বাসকে এগিয়ে নিয়ে চলল উঁচু থেকে আরও উঁচুতে। রীতিমতো বর্ষা চলছে। দূর পাহাড়ের প্রাচীর মেঘের আড়ালে চুপ করে লুকিয়ে আছে। মেঘের ভেলা ধীরে ধীরে আমাদেরও গ্রাস করে ফেলে। এমন ঘটনা সেখানে নিত্যদিনের ব্যাপার। বর্ষায় বৃষ্টির ফোঁটা, চলতি এই পথকে ভিজিয়ে দেয় প্রায়ই। এ পথেই দেশের রহস্যময় আলুটিলা গুহার পথ। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের স্থান।রহস্যময় আলুটিলা গুহায় একদিন
খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলা শহর থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে আলুটিলা পাহাড়ে এই গুহা অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা তিন হাজার ফুট। পাহাড়ের পেটের মধ্যে এ গুহা লুকিয়ে আছে। আমরা দলবল বেঁধে সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। রাজধানীর ফকিরাপুল পৌঁছে দেখি, খাগড়াছড়িগামী রাতের বাস মাত্র চাকা গড়িয়েছে। হঠাৎই সিদ্ধান্ত হলো খাগড়াছড়ি যাব। বাস চলছে দুর্দান্ত গতিতে। বাসের সুপারভাইজার টিকিট দেখতে এসে জানতে চান কোথায় নামব? বলি, কোথায় নামলে ভালো হবে?
অবাক হওয়া সুপারভাইজারের চেহারা দেখে বুঝতে পেরে বলি, ঘুরতে বেরিয়েছি। তাকেই প্রশ্ন করি, খাগড়াছড়ির কোন কোন জায়গা ঘুরে দেখা যায়? হাসিমুখে সুপাভাইজার উত্তর দেন, আলুটিলা নামতে পারেন। সেখানে একটা সুড়ঙ্গ আছে, সুন্দর জায়গা, মন্দ লাগবে না। আমাদের জায়গামতো নামিয়ে দেওয়া হলো। মেঘ-কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে রয়েছে চারপাশ। বাস থেকে নামার পরেই দেখি পুরোনো বটগাছের নিচে আলুটিলা পার্কের প্রধান ফটক। টিকিট কাউন্টার তখনো খোলা হয়নি। ঘুম থেকে উঠে চোখ ঘষতে ঘষতে কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাবুল বিকাশ ত্রিপুরা জানালেন, ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে। দিনের প্রথম পর্যটককে অপেক্ষমাণ দেখে বোধ হয় তার মায়া হয়। কয়েক মিনিট বাদেই একটা চাবি দিয়ে বলেন, ভেতরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন, এই ফাঁকে কাউন্টার খুলে নিই।
অভিভূত হয়ে সুযোগটা গ্রহণ করি। আশপাশে পাখিদের ঘুম মনে হয় সবে ভাঙল। পথের ধারে দু-চারটা কড়ই ও মেহগনিগাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি এখনো ঝরছে টপ টপ করে।
কিছুক্ষণ বাদে বাবুল বিকাশের উচ্চ আহ্বানে কাউন্টারে ফিরে পাঁচ টাকায় প্রবেশ টিকিট ও ১০ টাকায় কিনতে হলো মশাল। কাচা সরু বাঁশের নলে সামান্য কেরোসিন তেল ভরা। তার মাথায় পাটের ছিপি আটকানো, এই হলো গুহা ঘুরে দেখার আলোর মশাল। শিখিয়ে দেওয়া হলো ব্যবহারবিধি। সঙ্গে অন্য কেউ না থাকায় প্রস্তাব করলে তিনি নিজেই আমার সঙ্গী হলেন। পথ এগিয়েছে ঢালু হয়ে, দুপাশে পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমে গেছে ধানখেত। অতপর রেলিং বাঁধা দীর্ঘ সিঁড়ি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নেমে গেছে গুহা মুখে। বাবুল বিকাশের কথামতো অন্ধকার গুহার মুখ থেকেই মশাল জ্বালিয়ে নিতে হলো। এঁকেবেঁকে প্রায় ১৫ মিনিটের দৈর্ঘ্য। কোথাও সরু, কোথাও অল্প প্রস্থ, আবার একাধিক জায়গায় কোমর হেলে এগোতে হয়। পায়ের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় হিম শীতল পানির স্রোত। পানিপ্রবাহের মৃদু শব্দ কানে বাজতে থাকে। গা ছমছম পরিবেশ। এক পাশ দিয়ে প্রবেশ করে অন্য পাশে দিয়ে বেরোতে হয়। বের হওয়ার মুখ তুলনামূলক চওড়া ও গভীর। বেরোনোর পর চোখ মেলে তাকালে মনে হয় এতক্ষণ কোনো অন্ধকূপে আবদ্ধ হয়ে ছিলাম। কারণ, ওপর থেকে গাছের অজস্র ডালপালা ঢেকে রেখেছে গুহার দুই মুখ। দেখতে দেখতে এরই মধ্যে কখন যে বাইরে ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হয়েছে, বুঝতেই পাইনি। অনেক অচেনা এক অভিজ্ঞতা হলো। স্বল্পস্থায়ী। কিন্তু চিরদিন মনে থাকবে।
বাংলার নিউজিল্যান্ড
খানিক বাদে বৃষ্টি থেমে গেলে রওনা দিলাম বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ডে। কবে যেন পত্রিকায় পড়েছিলাম, খাগড়াছড়ি জেলা শহরের উপকণ্ঠে এর অবস্থান। জায়গাটায় নাকি নিউজিল্যান্ডের আবহের মিল রয়েছে। কে, কবে, কখন এমন নামকরণ করল, তা স্থানীয় কারও ধারণায় নেই। তবে এমন বিচিত্র নামের পরিচিতি বেশি নয়, মাত্র কয়েক বছরের। ইতিমধ্যে বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু আকাশে মেঘেদের বেশ ঘোরাঘুরি। ইট বিছানো পথের পর বিশাল ফাঁকা মাঠজুড়ে ধানক্ষেত। মাঠের ওপারেই পাহাড়ের প্রাচীর। এই হলো বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড। কিন্তু দেশের একটি জায়গার নাম কেন ভিনদেশি নামে হবে, তা এক রহস্য বটে! দর্শনার্থীদের কেউ কেউ হতাশ হয় এরূপ নামকরণের কারণে। তবে পাহাড়ঘেরা উপত্যকাটি নিজস্ব সৌন্দর্য, স্বকীয়তায় হয়ে উঠতে পারে পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র। এ জন্য দরকার উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close