শুক্রবার,  ১৯ অক্টোবর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৫:৩৫:০৪

ঘুরে আসুন জলের বন

নীলিমা টিনা
বিশাল জলাভূমির মধ্যে কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গাছের একটি জঙ্গল। ডালে ডালে ঘুরে বেড়ায় নানা প্রজাতির পাখি আর বন্যপ্রাণীরা। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত জলের এ বনের নাম রাতারগুল। রাতারগুল আমাদের দেশের একমাত্র ‘ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট’ বা জলাবন।
 
রাতারগুলের উত্তরে মেঘালয় থেকে নেমে আসা স্রোতস্বিনী গোয়াইন নদী, দক্ষিণে বিশাল হাওর। মাঝখানে রাতারগুল। বিশ্বে বর্তমানে মিষ্টি পানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। ভারতীয় উপমহাদেশে আছে এর দুটি, একটি শ্রীলঙ্কায় এবং আরেকটি বাংলাদেশের রাতারগুল।
 
অনিন্দ্যসুন্দর বিশাল এ বনের সঙ্গে তুলনা চলে আমাজনের। রেইন ফরেস্ট নামে পরিচিত হলেও বিশ্বের স্বাদুপানির সবচেয়ে বড় সোয়াম্প বন কিন্তু ওই আমাজনই। ঠিক আমাজন  সোয়াম্পের মতোই স্বাদুপানির বন আমাদের রাতারগুল। সিলেটের স্থানীয় ভাষায় মুর্তা বা পাটিগাছ ‘রাতাগাছ’ নামে পরিচিত। এর নামানুসারে এই বনের নামকরণ। গাছগাছালির বেশির ভাগ অংশই বছরে চার থেকে সাত মাস থাকে পানির নিচে।
 
ভেতরের দিকে জঙ্গলের গভীরতা এত বেশি যে, সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে পানি ছুঁতে পারে না। সিলেট শহর থেকে এ বনের দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার।
সিলেট বন বিভাগের উত্তর সিলেট রেঞ্জ-২-এর অধীনে প্রায় ৩০ হাজার ৩২৫ একর জায়গাজুড়ে এর অবস্থান। এর মধ্যে ৫০৪ একর জায়গায় মূল বন, বাকি জায়গা জলাশয় আর সামান্য কিছু উঁচু জায়গা। তবে বর্ষাকালে পুরো এলাকা পানিতে ডুবে থাকে। শীতে প্রায় শুকিয়ে যায় রাতারগুল। তখন কেবল পানি থাকে বনের ভেতরে খনন করা বড় জলাশয়গুলোতে। পুরোনো দুটি বড় জলাশয় ছাড়াও ২০১০-১১ সালে রাতারগুল বনের ভেতরে পাখির আবাসস্থল হিসেবে ৩ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটারের একটি বড় লেক খনন করা হয়। তাই শীতে এখানে নানা পাখির মিলনমেলা বসে।
 
রাতারগুল মূলত প্রাকৃতিক বন হলেও বন বিভাগ হিজল, বরুন, করচ আর মুর্তাসহ কিছু জলবান্ধব জাতের গাছ লাগিয়েছে।
 
রাতারগুলের গাছপালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কদম, জালি, বেত, অর্জুনসহ প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছপালা ও সিলেটের শীতল পাটি তৈরির মূল উপাদান মুর্তার বড় একটা অংশ আসে এ বন থেকে। বাংলাদেশ বন বিভাগ ১৯৭৩ সালে বনের ৫০৪ একর এলাকাকে বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে। এখানে নানা প্রজাতি পাখির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো মাছরাঙা, বক, ঘুঘু, ফিঙে, বালিহাঁস, পানকৌড়ি ইত্যাদি। প্রাণীর মধ্যে বেশি রয়েছে বানর, উদবিড়াল, কাঠবিড়ালি, মেছো বাঘ ইত্যাদি। পাশাপাশি নানা জাতের সাপেরও অভায়াশ্রম এ বন।
 
রাতারগুলের সৌন্দর্য বলে শেষ করা যায় না। বনের যতই গহিনে যাওয়া হয়, গাছের ঘনত্ব ততই বাড়ে। দু-এক দিন বৃষ্টি না হলে এখানকার পানি এত বেশি স্বচ্ছ হয় যে বনের সবুজ প্রতিবিম্বকে মনে হয় বনের নিচে আরেকটি বন।
 
যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে প্রথমে যেতে হবে সিলেট শহরে। সড়ক, রেল ও আকাশপথে ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেট আসতে পারেন। ঢাকার ফকিরাপুল, কমলাপুর, সায়েদাবাদ প্রভৃতি জায়গা থেকে বিভিন্ন পরিবহনের এসি বাসে যেতে পারেন সিলেটে। নন-এসি বাসও আছে। ভাড়া ৩০০-৫০০ টাকা।
 
এ ছাড়া কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, বেলা ২টায় ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ও বুধবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। যেভাবেই যান, যেতে হবে সিলেট হয়েই।
 
সিলেট শহর থেকে বিভিন্ন পথে রাতারগুল যাওয়া সম্ভব। তবে পর্যটকেরা দুটি পথ ব্যবহার করতে পারেন। প্রথমত সিলেট-জাফলংয়ের গাড়িতে চড়ে নামতে হবে সারিঘাট। ভাড়া ৪০-৫০ টাকা। সেখান থেকে সিএনজিচালিত বেবি টেক্সিতে চড়ে গোয়াইনঘাট বাজার। এবার নৌকা ভাড়া করে যেতে হবে রাতারগুল। ১০ থেকে ১২ জনের উপযোগী সারা দিনের জন্য একটি নৌকার ভাড়া পড়বে ৮০০-১২০০ টাকা। সারি নদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে খরচ আর সময়, দুটোই বেশি লাগবে এ পথে। আরও সহজ আর সুন্দর আরেকটি পথ হলো সিলেট শহরের পার্শ্ববর্তী খাদিম চা-বাগান আর খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে। খুব অল্প সময়েই এ পথ ধরে রাতারগুল পৌঁছানো সম্ভব। এ পথে সিএনজি অটোরিকশা কিংবা জিপ নিয়ে আসতে হবে শ্রীঙ্গি ব্রিজ। সকালে গিয়ে বিকেলের মধ্যেই বন ঘুরে ফিরে আসা সম্ভব। রাতারগুলে যেতে যে পথই অনুসরণ করেন না কেন, বনে ঢুকতে জেলেদের ছোট নৌকা লাগবেই।
 
সাবধানতা
রাতারগুল বেড়ানোর উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। এ বনের চারদিক জলে পূর্ণ থাকে বলে ভ্রমণকালে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। বর্ষায় বন ডুবে গেলে বেশির ভাগ সাপ আশ্রয় নেয় গাছের ডাল কিংবা শুকনা অংশে। তাই চারপাশ খেয়াল করে চলতে হয়। এ ছাড়া এ সময় জোঁকেরও উপদ্রব আছে। সাঁতার না জানলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখা জরুরি।
 
আবাসিক ব্যবস্থা
রাতারগুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আপনাকে রাতেও অবস্থান নিতে হতে পারে। আর রাতে থাকার জন্য সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। শাহজালাল উপশহরে রয়েছে পাঁচ তারকা মানের হোটেল রোজ ভিউ। নাইওরপুল এলাকায় হোটেল ফরচুন গার্ডেন। জেল সড়কে রয়েছে হোটেল ডালাস। ভিআইপি সড়কে হোটেল হিলটাউন। লিঙ্ক রোডে আছে হোটেল গার্ডেন ইন। শহরের বাইরে বিমানবন্দর সড়কে আছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পর্যটন মোটেল। আরও আছে খাদিমনগরে জেসটেট হলিডে রিসোর্ট, নাজিমগড় রিসোর্ট ইত্যাদি। এসব হোটেল বা রিসোর্টে ৮০০ থেকে ২০ হাজার টাকায় থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close