শুক্রবার,  ১৯ অক্টোবর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৬, ১৯:২৬:২৮

পাহাড় অরণ্যে ঘেরা হামহাম জলপ্রপাত

ফেরদৌস জামান
হামহাম অনেকের কাছে চিতা ঝরনা নামেও পরিচিত। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে অবস্থিত প্রাকৃতিক এই জলপ্রপাত। ২০১০ সালে গাইড শ্যামল দেববর্মার সঙ্গে দুর্গম জঙ্গলে ঘোরা একদল পর্যটক এটি আবিষ্কার করেন হামহাম নামের একটি জলপ্রপাত আবিষ্কৃত হয়েছে সিলেটে- ২০১০ সালের শেষে অথবা পরের বছর শুরুর দিকে।
 
অতএব, কত তাড়াতাড়ি গিয়ে সেখানে হানা দেওয়া যায়, সেই ভাবনায় দলের সবার মন অস্থির! তবে কারও পরীক্ষা তো কারও শরীর খারাপ, কেউ নানার বাড়ি তো কেউ দাদার বাড়ি গিয়েছে। এভাবে আজ যাই কাল যাই করতে করতে পেরিয়ে গেছে বেশ কিছু সময়। এদিকে অন্যরা আগেভাগেই হামহামকে দেখে পুরোনো করে ফেলছে। ব্যাপারটা মেনে নেওয়া বেদনাদায়ক!
 
অবশেষে মাস কয়েক আগে ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে সিলেটগামী ট্রেনে রওনা দিই শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে। তখন সারা দেশে বর্ষা।
 
বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকাজুড়ে রয়েছে অসংখ্য ঝরনাধারা, যার অনেকগুলো এখনো অনাবিষ্কৃত ও লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। সিলেট বিভাগের একাধিক জেলায়ও এমন অনেক ঝরনা আছে। হামহাম এ রকম একটি ঝরনা।
 
ট্রেনের বগিতে গানবাজনায় কেটে গেল ঘুমহীন সমস্ত রাত। শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে গিয়ে পৌঁছালাম রাত তিনটায়। ভোর পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মেই অপেক্ষা করতে হবে। কেউ বসে গেল তাস খেলতে, কেউবা পাশে চায়ের দোকানে।
 
সকালের আলো ফোটার আগেই, ঠিক করে রাখা ছাদ খোলা জিপগাড়িটা এসে হাজির। দলে যুক্ত হলো ঢাকা থেকে যাওয়া ছয় সদস্যের অন্য একটি দল। ছাদের ওপরে চেপে পড়লাম সবাই। গাড়ি ছুটে চলছে অপরূপ সৌন্দর্যের লাউয়াছড়া বনের মাঝ দিয়ে। দুপাশের পাহাড় থেকে বৃক্ষগুলো বিছিয়ে দিয়েছে ডালপালা, ঠিক তার নিচ দিয়ে নীরব আঁকাবাঁকা পথ। সে পথে অন্য কোনো গাড়ির যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই গাড়িচালক হেঁকে চললেন তার একলা রাজত্বে। একপর্যায়ে সামান্য সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় চলতে হলো বিকল্প পথে। পৌঁছে গেলাম চাম্পারাই হয়ে কুরমা বাজার। সেখানে তথ্যাদি কিছুটা ঝালিয়ে নিয়ে পনরায় গাড়ির যাত্রা। চা-বাগানের মাঝ দিয়ে অসমতল লাল মাটির রাস্তা। রাস্তার দুপাশের বিস্তীর্ণ বাগানে ফুটে বেরিয়েছে চায়ের নতুন পাতার ঝাঁক। নির্মল প্রকৃতির মাঝে ফট ফট শব্দের বেরসিক গাড়িটাকে ভীষণ বেমানান মনে হচ্ছিল। তবে বিকল্প কিছু ছিল না। প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্য হামহাম জলপ্রপাত দেখতে যাচ্ছি যে আমরা! সকাল সড়ে নয়টায় জিপ গিয়ে নামিয়ে দেয় রাস্তার শেষ মাথা কলাবনপাড়ার আগে।
 
রোদের তীব্রতা ততক্ষণে যথেষ্ট বেড়ে গেছে। কলাবনপাড়ায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ত্রিপুরাদের বসবাস। পাড়ার মুখেই মেলে এক নাছোড়বান্দার দেখা, অবশেষে যাকে গাইড হিসেবে নিতেই হয়েছিল আমাদের।
 
পার্বত্য এলাকায় দু-একটা অভিযানের অভিজ্ঞতা থাকায় তার ওপর দলের সবার আত্মবিশ্বাস ছিল। তাই গাইডকে অনুসরণ করে এগিয়ে চললাম ১৪ সদস্যের দল। রাস্তার চারদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে উঁচুনিচু অনেক পাহাড়। একেকটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ভরা বর্ষায় প্রকৃতিতে এসেছে সবুজের জোয়ার। ঝকঝকে সবুজের মাঝ দিয়ে চিকন ট্রেইল। পাহাড়ের উপরিভাগ পাথুরে না হওয়ায় পথ অত্যধিক পিচ্ছিল। ওদিকে বৃষ্টিও চলছে মাঝারি গতিতে। অগত্যা বেশ কয়েকটা পয়েন্টে দড়ির সাহায্যে ওঠানামা করতে হলো। দড়ি না থাকলে একজনের পক্ষেও অগ্রসর হওয়া সম্ভব হতো না। বৃষ্টির কারণে জোঁকের উপদ্রবও অনেক বেশি।
 
শেষ পর্যন্ত পাহাড়ি পথ ফুরল। এবার ছড়াপথ (ঝরনাধারায় সৃষ্ট খাল)। দুপাশে পাহাড়ের খাড়া প্রাচীর, ওপর থেকে তা ঢেকে রেখেছে বাঁশ ও নানা প্রজাতির গাছ। হাঁটুপানি থেকে শুরু করে কোমরপানির পথ। কোথাও কোথাও ছড়িয়ে রয়েছে বড় বড় পিচ্ছিল পাথর। একটু পথ গেলে দূর থেকে কানে ভেসে আসে উঁচু থেকে পানি পড়ার ছর ছর শব্দ। এবার সবার সামনে থাকা বন্ধুটি চিৎকার দিয়ে ওঠে। বাঘ বা ভাল্লুক নয়, জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে হামহাম দেখতে পেয়েছে সে। সাড়ে তিন ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে আমরা উপস্থিত হলাম হামহাম জলপ্রপাতে।
 
দুর্গম গভীর জঙ্গলে এই ঝরনাটি ১৪৭ থেকে ১৬০ ফুট উঁচু। যেখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝরনা মাধবকু-ের উচ্চতা ১৬২ ফুট। তবে ঝরনার উচ্চতা বিষয়ে কোনো পরীক্ষিত মত নেই, সবই পর্যটকদের অনুমান। গবেষকেরা মনে করেন, এর ব্যপ্তি মাধবকু-ের ব্যাপ্তির চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি।
 
একপর্যায়ে ঝরনার ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নিই। বেশ খাড়া পথ, কোথাও কোথাও একেবারে ৪৫ ডিগ্রি খাড়া।
 
সবশেষে ফেরার পালা। ফিরতি পথ আর পাহাড়-পর্বত নয়, ছড়া ধরে ঠিক স্রোতের অনুকূলে। এ পথে পাহাড় ডিঙাতে হলো মাত্র তিন থেকে চারটি। যাতায়াতে দলের প্রায় প্রত্যেকে কয়েকবার করে আছাড়ও খেল। ঝকঝকে, সবুজ আর ঝরনার যৌবন দর্শনে এই ঝুঁকিটুকু নিতে কেউ অস্বীকার করেনি। তবে হামহামকে ঘিরে এখন বেশ কিছু উদে¦গের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সময়ের কিছু দায়িত্বহীন ট্যুরিস্ট গিয়ে নষ্ট করে ফেলছে হামহামের পরিবেশ।
 
যেভাবে যেতে হবে
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে করে গিয়ে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। আপনি বাসেও যেতে পারেন সেখানে। সেখান থেকে ছাদ খোলা জিপ বা চান্দের গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাবেন কলাবনপাড়ায়। এরপর একজন গাইড নিয়ে ট্রেকিং করে হামহাম জলপ্রপাত।
 
শ্রীমঙ্গলে আবাসনব্যবস্থা চমৎকার
বাংলাদেশের চা রাজধানী হিসেবে খ্যাত শ্রীমঙ্গল। এখানে রয়েছে নানা দর্শনীয় স্থান। এখানে থাকার জন্য বেশ কিছু কটেজ, রিসোর্ট আছে যেগুলোর মান অন্য এলাকার চেয়ে ভালো। যেমন শান্তিবাড়ি, রাধানগর। শ্রীমঙ্গলে থাকার শ্রেষ্ঠ জায়গা এগুলো। শহর থেকে পাঁচ কিমি. দূরে রাধানগরের গ্রামীন পরিবেশে গড়ে উঠেছে অসাধারণ সুন্দর ইকো কটেজ। এখানে একটি কাঠের তৈরি দ্বিতল ঘরে রুম আছে চারটি। প্রতিটি রুমে থাকতে পারবেন তিনজন, ভাড়া তিন হাজার টাকা। আর বাঁশের কটেজে রুম আছে দুটি। থাকা যাবে দুজন করে, ভাড়া দুই হাজার।
 
বিদেশি অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের বন রক্ষার বিশেষ প্রকল্পের আওতায় রাধানগরে গড়ে উঠেছে নিসর্গ ইকো কটেজ। এখানে কটেজ আছে সাতটি। প্রতিটিতে দুজন থেকে শুরু করে চারজন থাকা যায়। ভাড়া ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে শুরু। এ ছাড়া রয়েছে হারমিটেজ গেস্ট হাউস। এখান থেকে রাতে ঝরনার শব্দ শোনা যায়। এদের একটি লাইব্রেরিও আছে।
 
পর্যটকেরা রাত কাটাতে পারেন টি রিসোর্টেও। এটি ভানুগাছ রোডে অবস্থিত। শ্রীমঙ্গলে থাকার অন্যতম সেরা জায়গা এটি। এখানে দুই রুমের একটি কটেজের ভাড়া ৫ হাজার ১৭৫ টাকা। দুজন থাকার মতো এক রুমের কটেজের ভাড়া ২ হাজার ৮৭৫ টাকা। এ ছাড়া পাবেন জাঁকজমকপূর্ণ গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট। শ্রীমঙ্গলে পাঁচ তারকা থাকার ব্যবস্থা এটি। ভাড়া ১১ হাজার থেকে শুরু।
যারা একটু কম খরচে (৫০০-১০০০) থাকতে চান, তাদের থাকতে হবে শহরের হোটেলগুলোতে। যেমন হোটেল টি টাউন, হোটেল প্লাজা, হোটেল ইউনাইটেড ইত্যাদি।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close