রোববার,  ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৬, ১৬:০২:৫৭

‘নিখোঁজ অনেকের অভিভাবক সমাজচ্যুতির ভয়ে’

অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশে পুলিশ এবং র‍্যাব নিখোঁজদের লম্বা তালিকা নিয়ে এখন নিখোঁজের কারণ জানার চেষ্টা করছে। জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে কেউ নিখোঁজ হয়েছে কিনা, তারা সেটাই খুঁজছে। র‍্যাব সর্বশেষ ২৬১ জন নিখোঁজের তালিকা প্রকাশ করেছে। জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে সন্তান নিখোঁজ হয়েছে কিনা, এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে।
 
ঢাকার গুলশানে যে রেস্তোঁরায় জঙ্গি হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ ২২ জন নিহত হয়েছে, সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রেস্তোঁরাটি এখনও পুলিশ ঘিরে রেখেছে। পুলিশের প্রতিবন্ধকতার বাইরে রাস্তাটির মোড়ে প্রতিদিনই অনেক মানুষ এসে একটি জায়গায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন নিহতদের স্মরণে। পাশ দিয়েই যানবাহন চলাচল করছে। এই রেস্তোঁরায় জঙ্গি হামলায় ঘর ছাড়া তরুণদের জড়িত থাকার বিষয় প্রকাশের পর নিখোঁজদের তথ্য সংগ্রহের কাজে নেমেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিখোঁজ সন্তানের জন্য একজন মায়ের উদ্বেগের বিষয়কে তুলে ধরে ছোট নাটিকা প্রচার করা হচ্ছে টেলিভিশনগুলোতে। এছাড়াও পুলিশের পক্ষ থেকে নিখোঁজ দশজন যুবকের ছবি টেলিভিশনে এবং পত্রিকায় প্রচার করে তাদের অভিভাবকের কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। যারা জঙ্গি কানেকশনে দেশ ছেড়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে।
টেলিভিশনে ছবি দেখে প্রতিবেশীরা নিখোঁজ সন্তান সম্পর্কে তারা বেগমকে জানিয়েছেন। প্রায় আড়াই বছর ধরে তার সন্তান নিখোঁজ রয়েছে। খবর: বিবিসি বাংলা
 
জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে সন্তান নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারে, এখন প্রতিবেশীদের এমন ইঙ্গিতে তারা বেগমের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। লক্ষ্মীপুর জেলা শহরে একটি প্রাইমারি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন। তার প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অস্বস্তিতে। তারা বেগম বলছিলেন, তার ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল। সেখানেই বিয়ে করে সংসার গড়েছিল। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে তাঁর ছেলে স্ত্রীসহ নিখোঁজ হয়।
 
পুলিশের প্রচারণার কারণে হঠাৎ জানতে পারেন নিখোঁজ সন্তান সম্পর্কে, এমন একজন অভিভাবকের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ঢাকার বাড্ডা এলাকায় তার বাসা থেকে অনেক দূরত্বে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলেন।
 
তিনি কণ্ঠ দিলেও নাম প্রকাশ করতে বা কোন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, তার ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ-তে ভর্তি হয়ে কিছুদিন ক্লাস করার পর পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। এক বছর ধরে সে নিখোঁজ।
 
টেলিভিশনে নিখোঁজ যাদের ছবি প্রচার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ঢাকায় চারজনের বাসায় গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের পাওয়া যায়নি।
 
এমন প্রচারণার পর থেকে পরিবারগুলো কোথায় গেছে, তা তাদের প্রতিবেশীরা বলতে পারেননি। এমন নিখোঁজ আরও দু’জনের বাসায় তাদের বাবা-মায়ের দেখা মেলে।
তাঁরা মাইকের সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
 
উচ্চবিত্ত এই অভিভাবকদের চিন্তা হচ্ছে, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী বা সমাজ তাদের এখন কোন চোখে দেখবে।
 
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, সমাজও অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি করতে পারে, এই ভয় বেশি তাড়া করছে নিখোঁজ সন্তানের অভিভাবকদের মধ্যে।
 
তিনি বলেন, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া উচ্চ শিক্ষিত অনেকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে কয়েকজন তরুণের জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে নিখোঁজ হওয়ার খবর যখন প্রকাশ হলো, যাদের সন্তান নিখোঁজ হয়েছে, তাদের অনেকে আগে হয়তো পুলিশের কাছে রিপোর্টই করেনি। এখন তাদের মধ্যে সমাজচ্যুতির একটা ভয় বা একটা আশংকা কাজ করছে।
 
তিনি আরও বলেছেন, একদিকে সন্তান নিখোঁজ হয়েছে। অন্যদিকে এখনকার পরিস্থিতিতে সেটা প্রকাশ পেলে মিডিয়া-পুলিশসহ সকলের চাপের মুখে পড়তে হবে- এই ভয়ও তৈরি হয়েছে। এটা সমাজে এক ধরণের ট্রমাটিক ইভেন্ট পয়দা করবে।ৎ
 
অভিভাবকদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, সন্তান নিখোঁজের বিষয়ে তারা আগে যখন পুলিশের কাছে গেছেন, পুলিশ কোনো গুরুত্ব দেয়নি।
 
ছেলে অভিমান করেছে, ফিরে আসবে, এমন ঠাট্টার মুখেও পড়তে হয়েছে অনেক অভিভাবককে।
 
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, গুলশানে এবং শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় নিখোঁজ তরুণদের জড়িত থাকার বিষয় জানার পরই তারা নিখোঁজদের ব্যাপারে বেশি সজাগ হয়েছেন।
 
তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, পুলিশের প্রচারণার পরই অনেক অভিভাবক তথ্য জানাচ্ছেন।
 
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুলশানের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে দেখলাম, অনেকে নিখোঁজ হয়েছে। কিন্তু পুলিশের কাছে রিপোর্ট করেনি। ঢাকা নগরীতে মাত্র ২৩জনের নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হলেও নিখোঁজের কারণ আমাদের বলেনি। অনেক কারণেই তো নিখোঁজ হতে পারে। ফলে আমরা কনফিউজড ছিলাম। কিন্তু গুলশানের ঘটনার পর নিখোঁজের ঘটনাগুলো আমরা নতুন করে তদন্ত করছি।
 
ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা উদ্বিগ্ন। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা অন্তত দু’জনের নাম এসেছে গুলশানে এবং শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ব্যাপারে।
 
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী নিখোঁজ রয়েছে, এমন অভিযোগও পুলিশ তুলেছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আতিকুল ইসলাম বলেছেন, শিক্ষার্থীরা অসুস্থতাসহ নানান কারণে অনুপস্থিত থাকে। এখন অনুপস্থিতির বিষয়ে মনিটর করার ওপর তারা জোর দিয়েছেন।
 
নামীদামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী যেমন নিখোঁজ রয়েছে, ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলা থেকেও অনেকের নিখোঁজ হওয়ার খবরগুলো এখন আসছে।
র‍্যাব সারাদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সর্বশেষ ২৬১ জন নিখোঁজের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। পুলিশও নিখোঁজের একটি তালিকা তৈরি করেছে।
 
পুলিশ এবং র‍্যাব নিখোঁজদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয় খতিয়ে দেখার কথা বলছে। পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া মনে করেন, নিখোঁজদের মধ্যে অল্প সংখ্যকই জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকতে পারে। নিখোঁজের বিষয়ে ভয় বা আতংকের কিছু নেই। তবে কেউ কেউ বাংলাদেশের বাইরে গেছে। সিরিয়া থেকে তিনজন বাংলাদেশী যুবকের ভিডিও আমরা দেখেছি। এরকম কিছু হয়তো চলে গেছে। তাদের সংখ্যা হাতে গোনা এবং খুবই নগণ্য।
 
নিখোঁজদের বেশিরভাগই তরুণ। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাছে নিখোঁজের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে।
 
তবে সরকারের তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মনে করেন, নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি বড় ধরণের কোনো প্রবণতা হয়ে দাঁড়ায়নি।
 
তরুণরা কী করছে, কোন পরিবেশে যাচ্ছে, এসবের খোঁজখবর রাখা হয় না, এটিকে বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জঙ্গি সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে।
 
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অভিভাবকের কাছে বেশি সময় কাটায়। সেখানে অভিভাবকদের দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আতিকুল ইসলাম।
 
নিখোঁজদের কিভাবে খুঁজে বের করা যাবে, সেটিও এখন বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে তথ্য সংগ্রহ করার পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা চাইছে।
 
নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে যারা নিখোঁজ হয়েছে, তাদের খুঁজে বের করার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেছেন, বিদেশে খোঁজার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।
 
পুলিশ বলছে, তাদের তালিকার তুলনায় নিখোঁজের আসল সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। তবে জঙ্গি সম্পৃক্ততার কারণে ঠিক কতজন নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close