সোমবার,  ১০ ডিসেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৬, ০৯:৫১:২৩

বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে হয় ৫৯ শতাংশ মেয়ের

সাম্প্রতিক দেশকাল প্রতিবেদক
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস সোমবার। সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হবে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগ আগামী প্রজন্মের সুরক্ষা’। দিবসটি উপলক্ষে জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক বক্তৃতা, র‌্যালি, সেমিনার, আলোচনাসভা, রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার, সংবাদ সম্মেলন, চিত্রপ্রদর্শনী, জনসংখ্যা ও পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতা এবং ক্রীড়া অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হবে ২১ জুলাই।
 
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। এখানে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী দেড় কোটিরও বেশি কিশোরী বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাল্যবিয়ের ফলে শতকরা ৮৬ জন কিশোরী স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশে ৫৯ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে এবং ২১ শতাংশ কিশোরী অপরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ করে। এ ছাড়া ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে ৩১ শতাংশই গর্ভবতী হয়ে পড়েন বিয়ের প্রথম বছর। পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণের হার মাত্র ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ। পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণে পুরুষ ও মহিলার অংশগ্রহণের অনুপাত ১:৯। পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা এখনো ১২ শতাংশ। বিভিন্ন পদ্ধতিতে ড্রপআউটের হার ৩০ শতাংশ। মাত্র ১১ শতাংশ বিবাহিত নারীকে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মী দ্বারা সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুবিধাদিপ্রাপ্ত মায়ের সংখ্যা ৩৭ শতাংশ। দুর্গম এলাকার (হাওর, বাঁওড়, বিল, চর) জনগণের কাছে এখনো পরিবার পরিকল্পনা সেবা যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
 
বিডিএইচএস ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৫২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন। এ বিপুল জনসংখ্যার ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার পুরুষ এবং ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৩৭ হাজার নারীসহ মোট ৯ কোটি ৫৫ লাখ ৮৪ হাজার লোক কর্মক্ষম। এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা ১ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার ও তরুণীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৬ লাখ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- এ তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৪০ শতাংশ কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ হলো কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী। যারা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল জনমিতিক সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। যদি এ সম্ভাবনাময় কিশোর-কিশোরীদের জন্য সঠিক উন্নয়ন কৌশল, কর্মপরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা যায় এবং তাদের উপযোগী কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবে এই জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। যেমনটি হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং ইউরোপে।
 
বিডিএইচএস ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৯৭৪-এর ২ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার ১৯৭৫ সালে ছিল ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১৪ সালে ৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের ড্রপআউটের হার ২০০৪ সালে ছিল ৪৯ শতাংশ থেকে ২০১৪ সালে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মোট প্রজনন হার বা নারীপ্রতি গড় সন্তান জন্মদানের হার ১৯৭১ সালের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০১৪ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার (প্রতি হাজারে) ১৯৭৫ সালের ১৫০ থেকে ২০১৪ সালে ৩৮-এ হ্রাস পেয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাদানকারীর সহায়তায় ৪২ শতাংশ শিশু জন্মগ্রহণ করছে। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুবিধাপ্রাপ্ত মায়ের সংখ্যা ২০০৪ সালের ১২ থেকে ২০১৪ সালে ৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ১৯৯১ সালের ৫৬ দশমিক ১ থেকে ২০১২ সালে ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
 
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনা মা ও শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে প্রতি বছর দুটি পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও প্রচার সপ্তাহ পালন করা হয়। সেবা ও প্রচার সপ্তাহ পালনের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। পরিবার পরিকল্পনার স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণকারী বৃদ্ধি, ড্রপআউট হ্রাস এবং মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, অপূর্ণ চাহিদা পূরণ, মোট প্রজনন হার (টিএফআর) হ্রাসে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৈশোরের প্রজনন স্বাস্থ্য স্ট্র্যাটেজি প্রণীত এবং সব সেবাকেন্দ্রকে পর্যায়ক্রমে কৈশোরবান্ধব করার জন্য ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে।
 
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (আইইএম) মো. ফেরদৌস আলম বলেন, প্রতিবছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়। তবে আমাদের দেশে দিবসটি পালন করা হবে আগামী ২১ জুলাই। দিবসটি উপলক্ষে বেশ কিছু কর্মসূচি পালিত হয়। তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য, শিক্ষা ও উদ্বুদ্ধকরণ (আইইএম) ইউনিট থেকে পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ, শিশু বিয়ে রোধ, দু’সন্তানের মধ্যে বিরতির সময় বৃদ্ধি, সন্তান সংখ্যা সীমিত রাখা, দক্ষ দাই দ্বারা সন্তান প্রসব করানো, গর্ভবতীর সেবাপ্রাপ্তির ৩টি বিলম্ব ও ৫টি প্রসবকালীন বিপদচিহ্ন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরামর্শ প্রদান করা হয়ে থাকে।
 
পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্যক্রম সম্পর্কিত পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাফলতা প্রসঙ্গে বলা হয়- গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনমিতিক সূচকে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো এমডিজি অ্যাওয়ার্ড-২০১০ অর্জন করেন। দীর্ঘ প্রায় ৬ দশকের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে অনেক সাফল্য এসেছে। তবে ২০১৬ সাল নাগাদ এইচপিএনএসডিপি-এর লক্ষ্যমাত্রা এবং ভিশন-২০২১ পূরণের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এজন্য পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্যক্রমকে আরও বেগবান করতে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৩৬৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসক কর্মকর্তার ৫৩৫টি, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৩৮৬৯টি পদে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বর্তমানে ২০ হাজার ২৬২ জন পরিবার কল্যাণ সহকারী, ৩ হাজার ৬২৯ জন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, ৪ হাজার ৮৮৮ জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা এবং ২ হাজার ২৫৪ জন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার মাঠ পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে সেবা ও পরামর্শ দিচ্ছেন। এ ছাড়া মা ও শিশুস্বাস্থ্যে উন্নয়নে সারা দেশে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতি মাসে ৮টি করে প্রায় ৩০ হাজার স্যাটেলাইট কিনিক আয়োজন করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার আজিমপুরের এমসিএইচটিআই, মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার, ৯৭টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র (এমসিডব্লিউসি), ৪২৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মা ও শিশুস্বাস্থ্য ইউনিট, ৩ হাজার ৯২৪টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, মা ও শিশু এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সেবায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।  
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close