শনিবার,  ২১ এপ্রিল ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৬, ০৯:২৩:১৮

জঙ্গি মোকাবেলায় 'কুইক রিসপন্স টিম'

অনলাইন ডেস্ক
জঙ্গি দমনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সমন্বিত এই ইউনিটে থাকবেন সব বাহিনীর চৌকস সদস্যরা। কোথাও হামলা হলে তারা দ্রুত সেখানে অপারেশন পরিচালনা করবেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবেন। এই ইউনিটের নাম হবে 'কুইক রিসপন্স টিম' (কিউআরটি)। দেশের যে কোনো সংকটকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিট কীভাবে ভূমিকা রাখবে, তা নির্ধারণ করতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) গঠন করা হবে। এটি হলো সংকটকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ইউনিটের ভূমিকা সুনির্দিষ্ট করে নির্ধারণ করার একটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত পদ্ধতি।
 
গত ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে জঙ্গি হামলার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সর্বপ্রথম এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর এই ইউনিট গঠনের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে সামনে আসে। গতকাল রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বিশেষ বৈঠকেও সব বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর আগে গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠকে বর্তমান বাস্তবতায় কুইক রেসপন্স টিম গঠনের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।
 
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া গতকাল বলেন, আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের আগেও প্রধানমন্ত্রী এসওপি গঠনের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে কাজ চলছে।
 
এদিকে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। কমিটি মনে করে, প্রতিটি সংস্থার গোয়েন্দাদের আরও সমন্বয় খুবই জরুরি। গোয়েন্দাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য থাকলে অনেক বড় ঘটনা আগে থেকেই মোকাবেলা করা সম্ভব।
 
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের এ ব্যাপারে অবহিত করেন। তিনি জানান, ভারতের বিতর্কিত ইসলামী বক্তা জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে 'জঙ্গিবাদে উৎসাহ জোগানোর' অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশে তার পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার (আজ) এ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া জুমার বয়ান ও খুতবা মনিটরিং করার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিলও মনিটরিংয়ের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
 
দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংকটকালীন সময়ে যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে নির্ধারণ করে দিতে এসওপি রয়েছে। তারাই নির্ধারণ করে, বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার পর অভিযানে কে মূল কমান্ডারের ভূমিকা পালন করবে। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইউনিটের কী ভূমিকা থাকবে। কারা কখন কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে।
 
বিদেশিদের নিরাপত্তায় আনসার : সূত্র জানায়, বৈঠকে বিদেশিদের নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি আনসার মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো বিদেশি নিরাপত্তা চাইলে তাকে পুলিশ দেওয়া না গেলে যেন আনসার দেওয়া যায়, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈঠকে বলা হয়, ৬১ লাখ আনসার-ভিডিপির সদস্যকে প্রশিক্ষিত করে তৃণমূল পর্যায়ে সন্ত্রাস ও নাশকতা দমনে কাজে লাগাতে হবে।
 
শোলাকিয়ার ঘটনায় পুলিশের প্রশংসা : বৈঠকে শোলাকিয়ায় পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে কমিটি। এ জন্য পুলিশকে পুরস্কৃত করারও ঘোষণা দেওয়া হয়। নিহত পুলিশ সদস্যদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
 
সন্দেহভাজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি : বৈঠকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কেন বিপথগামী হচ্ছে, তার কারণও খুঁজে বের করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈঠক থেকে গত কয়েক মাসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কত শিক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে, তার হিসাব চাওয়া হয়েছে। এসব শিক্ষার্থী কোন কারণে অনুপস্থিত থাকছে এবং তাদের পারিবারিক অবস্থানসহ বিস্তারিত তথ্য দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব থানায় নির্দেশনা পাঠাতে পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া জঙ্গিদের জামিনের ব্যাপারে আরও সতর্ক থাকার কথাও বলা হয়। এমনকি উগ্রপন্থিদের দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
 
গুলশান-বারিধারায় চেকপোস্ট বাড়ানো : বৈঠকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। তবে গতানুগতিক নয়, দৃশ্যমান তৎপরতা বাড়াতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় হতে হবে। পরে এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ বাহিনীকে আরও সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশেষ করে অভিজাত ও কূটনৈতিক এলাকা গুলশান ও বারিধারায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে সঙ্গে আরও চেকপোস্ট বাড়ানো ও তল্লাশি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
 
জনসচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ : জঙ্গি দমনে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বৈঠকে একজন মন্ত্রী বলেন, জঙ্গিদের 'টার্গেটেড সন্ত্রাস'-এর পরিকল্পনা থাকলে তাদের রোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার জনসচেতনতা। তাই তৃণমূলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবার আগে বিশেষ বয়ানে মুসলিমদের সচেতন করতে হবে। অন্যান্য মসজিদে জুমার দিনের বয়ানে কী বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে মনিটর করার জন্য প্রতিটি এলাকায় কমিটি গঠন করতে হবে।
 
পুলিশে সংযোজন হচ্ছে চেতনানাশক গ্যাস : বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চেতনানাশক গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। উগ্রবাদীরা কোথাও আক্রমণ করলে ওইসব ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চেতনানাশক গ্যাস ব্যবহার করবে। ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাস্তবতার নিরিখে এটি খুব প্রয়োজন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
 
ইটারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে : দেশে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে যারা জঙ্গিবাদকে উৎসাহিত করে বিদেশে পালিয়ে রয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে সরকার। এজন্য আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নিতে পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
 
পুলিশে মনোবল বাড়ানোর উদ্যোগ : সন্ত্রাসী হামলার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা যাতে মনোবল না হারান সেজন্য তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে তাদের নিয়ে তিন মাসের জন্য কাউন্সেলিং সভা করার প্রস্তাব উঠেছে বৈঠকে।
 
বৈঠকে আরও যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে : আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের বলেন, এটি নিয়মিত বৈঠক নয়। উগ্রপন্থিদের হামলার কারণে বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, গুলশানের এক রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলার পর রাজধানীর অভিজাত এই আবাসিক এলাকার অননুমোদিত রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এজন্য ওই এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ ধরনের স্থাপনাগুলো তদারকির মধ্যে এনে সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
মন্ত্রী বলেন, দেশের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সব রকম নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি নিরাপত্তার আওতায় আনা হবে।
 
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু, পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সূত্র: সমকাল  
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close