বুধবার,  ১২ ডিসেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫, ২১:৪৯:৪৬

টাকা জাদুঘর

আসাদুজ্জামান সুপ্ত

টাকা কথা বলে, শুনতেই চমকে উঠবে সবাই। আসলেই কি তাই? আক্ষরিক অর্থে টাকা কথা না বললেও টাকা যে কথা বলে সেটা ভাবার্থে প্রকাশ পায়। আজ থেকে ১০০ বছর পূর্বের টাকা দেখে তৎকালীন সময়ের সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য খুব সহজেই বোঝা সম্ভব। সমসাময়িক টাকা, যোগানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আর সংরক্ষিত টাকা ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের কারেন্সি সংরক্ষণ করে রাখার জন্য 'কারেন্সি মিউজিয়াম'-এর উদ্ভব ঘটায়, যা খুব সহজেই আকৃষ্ট করে দর্শনার্থীদের। বাংলাদেশে যদিও 'কারেন্সি মিউজিয়াম'-এর যাত্রা খুব বেশী দিনের নয়, তবুও স্বল্প সময়ে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে নিয়েছে দেশের একমাত্র 'কারেন্সি মিউজিয়াম' তথা 'টাকা জাদুঘর'।

রাজধানী ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির দ্বিতীয় তলায় স্থাপন করা হয়েছে 'টাকা জাদুঘর'। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মূল ভবনে ২০০৯ সালে স্থাপিত হওয়া 'কারেন্সি মিউজিয়াম'-এর আধুনিক রুপ হলো এই 'টাকা জাদুঘর'।

২৭ এপ্রিল ২০১৩, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক শিলান্যাসের মধ্য দিয়ে টাকা জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী আধুনিক আঙ্গিকে স্থাপিত 'টাকা জাদুঘর' উদ্বোধন করেন ৫ অক্টোবর ২০১৩ সালে।

'টাকা জাদুঘর' মূলত মুদ্রা সম্পর্কিত একটি বিশেষায়িত জাদুঘর। বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশের মুদ্রার ক্রমবিকাশের ধারাকে লালন, সংরক্ষণ, উপস্থাপন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ইতিহাস দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরাই 'টাকা জাদুঘর' প্রতিষ্ঠার মুখ্য উদ্দেশ্য।

এখানে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে প্রাচীন আমল থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত মুদ্রিত বিভিন্ন ধরনের ধাতব মুদ্রা, কাগজের নোট ও মুদ্রা সম্পর্কিত দ্রব্যসামগ্রী। প্রদর্শিত মুদ্রাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত পাঞ্চ মার্কড (রৌপ্য মুদ্রা) যার ব্যাপ্তি খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম-৪র্থ শতক থেকে খিস্টাব্দ ২য় শতক পর্যন্ত। কুষাণ মুদ্রা, হরিকেল মুদ্রা, দিল্লী ও বাংলার সুলতানদের মুদ্রা, মোগল ও ব্রিটিশ শাসকদের মুদ্রাসহ আধুনিক মুদ্রা সম্ভার।

স্মরণাতীতকাল থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত বাংলায় ক্ষুদ্র লেনদেনে মুদ্রা হিসেবে কড়ি ব্যবহার করা হত, সে সব কড়ির কিছু নমুনাও রয়েছে প্রদর্শনীতে। কুষাণ সম্রাটগণের প্রদত্ত শক পার্থিয়ান ও তাম্রমুদ্রার কিছু নমুনা রয়েছে যা খ্রিস্টাব্দ ১ম ও ২য় শতকে ব্যবহার করা হত। হরিকেল মুদ্রা মূলত ৭ম ও ৮ম খিস্টাব্দের দিকে বর্তমান সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লার ময়নামতি, চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যবহার হত।

উল্লেখ্য, ময়নামতির প্রত্নস্থল থেকে বিপুল হরিকেল মুদ্রা পাওয়া যায়। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনামলে তথা সুলতানি শাসনামলে (১৪শ ও ১৫শ শতকে) ২৬ জন শাসক বাংলার বিভিন্ন টাকশাল থেকে মুদ্রা জারি করেন। মুদ্রার তথ্যের উপর ভিত্তি করে এখন পর্যন্ত ৪০টি টাকশালের নাম পাওয়া গেছে। গজনীর সুলতান মাহমুদ সর্বপ্রথম মুদ্রাকে 'টঙ্কা' বা 'টাকা' হিসেবে পরিচিতি প্রদান করেন। দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ তার স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার নাম দিয়েছিলেন 'তানকাহ' বা 'টাকা'। এছাড়াও 'টাকা জাদুঘর'-এ রয়েছে মোঘল সময়কালের 'কোচ' ও 'অহম' বা 'আসাম' মুদ্রা।

'টাকা জাদুঘর'-এর প্রদর্শনীতে বিশেষ ভাবে স্থান পেয়েছে দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুগলক শাহ, মোগল সম্রাট শাহজাহান, আওরঙ্গজেব, ফররুখশিয়ার ও ব্রিটিশ ভারতীয় স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র মুদ্রা এবং কাগজের নোট। এছাড়াও আছে ব্রিটিশ পরবর্তী পাকিস্তান আমল, স্বাধীন বাংলাদেশের মুদ্রা ও কাগজের নোটের ধারাবাহিক ইতিহাস।

জাদুঘরে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২০টি দেশের কাগজের নোট, পলিমার, হাইব্রিড নোট ও ধাতব মুদ্রা রয়েছে। জাপান ও জার্মান টাকশালের মুদ্রা তৈরির মাস্টার জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ। বিভিন্ন দেশ তথা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন,  সাবেক চেকোস্লোভাকিয়া, ইতালি, আফগানিস্তান, চীন, ল্যাটিন আমেরিকা, ভিয়েতনাম, লিথুনিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া এবং কমিউনিস্ট আমলের পোলিশ ব্যাংক নোট, চেক ও বন্ড। বর্তমান সময়ের যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, জামার্নি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান এর মুদ্রা।

ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, দিবস এবং কালজয়ী ব্যক্তিদের স্মরণে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ১২টি স্মারক মুদ্রা ও ৪টি স্মারক নোট প্রকাশ করেছে। এগুলোর মধ্যে ১টি স্বর্ণের, একটি নিকেলের ও বাকিগুলো রৌপ্য মুদ্রা। এ সকল মুদ্রা ও নোটগুলো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে। শুধুমাত্র মুদ্রা বা নোট নয় আছে মুদ্রা তৈরির ডাইস, মুদ্রায় নির্মিত বাংলার ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কার, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা দ্রব্যাদি, শস্য সংরক্ষণে রাখা মাটির মটকি প্রভৃতি।

সময়ের চাহিদা মেটাতে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের প্রচেষ্টায় বদ্ধ পরিকর টাকা জাদুঘর। এখানে আছে ডিজিটাল সাইনেজ, ডিজিটাল কিয়স্ক, এলইডি টিভি, থ্রিডি টিভি, প্রজেক্টর এবং ফটো কিয়স্ক। ডিজিটাল সাইনেজ দ্বারা বিভিন্ন তথ্যকে আধুনিক প্রক্রিয়ায় দেখানো হচ্ছে। ডিজিটাল কিয়স্ক দ্বারা ভিডিও চিত্র এবং তথ্য ধারণ করা হয়েছে। ফলাফলে দর্শনার্থীরা আঙুলের স্পর্শে নিমিশেই পেয়ে যাবে মুদ্রা/নোট এর যেকোন ধরনের তথ্য। এলইডি টিভিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যাবলী প্রদর্শন করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে দর্শনার্থীরা নিজেদের ছবি সম্মলিত স্যুভেনিয়র নোট মুদ্রণ করে নিয়ে যেতে পারেন ফটো কিয়স্ক এর মাধ্যমে। 'টাকা জাদুঘর'-এর অডিও গাইডের মাধ্যমে মুহূর্তেই 'টাকা জাদুঘর' ও মুদ্রা সম্পর্কে অজানা তথ্য জানা যাবে।

জাদুঘরে আছে বিভিন্ন ধরনের স্যুভেনিয়র শপ। এখান থেকে ক্রয় করা যাবে বিভিন্ন ধরনের স্যুভেনিয়র দ্রব্য, স্মারক মুদ্রা, জাদুঘর কর্তৃক প্রকাশিত প্রকাশনাসমূহ প্রভৃতি।  

সৌন্দর্য বর্ধনে আছে টাকাগাছ যেখানে বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা ও নোটের রেপ্লিকা শোভা পাচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা স্কুল ব্যাংকিং সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবে এই 'টাকা জাদুঘর' থেকে।

'টাকা জাদুঘর'কে বর্ধিত করে গবেষণাগার, লাইব্রেরি, মাল্টিপারপাস সিনেপ্লেক্স করার প্রক্রিয়া চলমান। প্রতিদিন শতশত শিক্ষার্থী, গবেষক, দর্শনার্থীদের পদভারে মুখর হয়ে উঠে দেশের একমাত্র এই 'কারেন্সি মিউজিয়াম' তথা 'টাকা জাদুঘর'।  দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর খোলা থাকে, শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১১.০০টা থেকে বিকেল ৫.০০টা পর্যন্ত। শুক্রবার বিকেল ৪.০০টা থেকে সন্ধ্যা ৭.০০টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার ও সরকারি ছুটির দিনসমূহ বন্ধ।

এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close