মঙ্গলবার,  ১১ ডিসেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৬, ২১:১৬:২৯

প্রসঙ্গ : সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন

মুফতি দিদার শফিক
অন্য কোনো দেশের চাঁদের সঙ্গে মিল রেখে একই দিন রোজা রাখা বা ঈদ উদযাপন করা যুক্তি সঙ্গত নয়। সারা পৃথিবীতে একই দিন ঈদ করা সম্ভব নয়। পৃথিবীজুড়ে একই দিনে চাঁদ ওঠে না। সময়ের ব্যবধান হয় অনেক। এ ব্যবধান চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতার কারণে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই পালনীয় ও অনুসৃত বিধান হল-নিজ দেশে চাঁদ দেখে রোজা রাখা এবং ঈদ উদযাপন করা। এটাই হাদিসের দাবি।
 
রাসুলের (সা.) নির্দেশ। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত নবি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো। চাঁদ দেখে রোজা ভাঙ্গো। (অর্থাৎ ঈদ করো।) আর যদি চাঁদ দেখতে কোনও কিছু প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে ৩০ দিনে মাস পূর্ণ করো। (মুসলিম:১০৮১) (তিরমিজি:৬৮৮, নাসায়ি:২১২৪, ২১২৫, ২১২৯, আবু দাউদ:২৩২৭, মুয়াত্তামালেক: ৬৩৫,দারেমি:১৬৮৩)
ইবনে ওমর রা. ও আবুবকর থেকেও এ হাদিস বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিসে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে এক দেশে চাঁদ দেখে অন্য দেশে রোজা ও ঈদ পালন করা যাবে না। দুটি দেশের মাঝে বিদ্যমান দূরত্ব ও উদয়স্থলের ভিন্নতার কারণে প্রতিটি দেশেই ভিন্ন ভিন্নভাবে চাঁদ দেখে রোজা রাখতে হবে। ঈদ উদযাপন করতে হবে। হাদিসে বিধৃত হয়েছে উম্মে ফজল বিনতে হারিস কুরাইবকে হযরত মুয়াবিয়ারা. এর কাছে পাঠানো হয়েছিল।
 
কুরাইব বলেন, ‘আমি শামে (সিরিয়ায়) তার প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করি। আমি শামে থাকাকালীন রমজানের নতুন চাঁদ দেখি। আমরা শুক্রবার রাতে রমজানের প্রথম দিনের নতুন চাঁদ দেখেছি। আমি মাসের শেষের দিকে মদিনায় ফিরে আসি। হযরত ইবনে আব্বাস রা. নতুন চাঁদের ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করে বললেন, ‘তোমরা (শামে) কখন নতুন চাঁদ দেখেছো?’ আমি বললাম, ‘আমরা জুমার (শুক্রবার) রাতে দেখেছি।’ তিনি বললেন, ‘তুমি কি জুমার রাতে দেখেছো?’ আমি বললাম,‘ লোকজন দেখে রোজা রেখেছে এবং হযরত মুয়াবিয়া রা. রোজা রেখেছেন।’ তিনি বললেন, ‘আমরা শনিবার রাতে দেখেছি। তাই ৩০ দিন পূর্ণ করা পর্যন্ত রোজা রাখা অব্যাহত রাখবো অথবা চাঁদ দেখলে রোজা (ভেঙ্গে ঈদ করবো।) ভাঙবো।’ আমি বললাম, ‘হযরত মুয়াবিয়া রা. এর চাঁদ দেখা ও রোজা রাখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়? ’তিনি বললেন, ‘না’। রাসুল (সা.) আমাদেরকে এমন আদেশই করেছেন। ( তিরমিজি:২৯৩, মুসলিম:১০৮৭, আবু দাউদ: ২৩৩২,নাসায়ি:২১১১)
 
ইমাম তিরিমিজি রহ. (আবুমূসা) “তিরমিজি শরিফে ”এ হাদিস উল্লেখ করে বলেন, ‘অবশ্যই প্রত্যেক দেশের অধিবাসীদের চাঁদ দেখতে হবে।’ এ কথার উপর কুরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণের আমল। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাদাতা ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শারফ আননাবাবি রহ. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমামদের ৩ টি মত উল্লেখ করেছেন। ১. চাঁদের উদয়স্থল এক হলে চাঁদ দেখার পরবর্তী বিধান সবার জন্য অবশ্য পালনীয়। ২. দেশ এক হলে চাঁদ দেখার পরবর্তী বিধান পালন সবার জন্য আবশ্যক। ভিন্ন হলে আবশ্যক নয়। ৩. এক দেশে চাঁদ দেখলে চাঁদ দেখার পরবর্তী বিধান দূরবর্তী দেশের জন্য প্রমাণিত হয় না। (সহিহ মুসলিম বিশর হিননাবাবি ৭/১৩০৫ পৃ.)
 
সারা পৃথিবীতে একই দিন চাঁদ ওঠে না। সময়ের ব্যবধান হয়। চাঁদ কোথাও আগে ওঠে, কোথা ওপরে। আগে-পরে উদিত চাঁদের প্রতি লক্ষ্য করেই চাঁদ একটি হওয়া সত্ত্বেও কুরআনে বহুবচন শব্দে “ নতুন চাঁদসমূহ” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উদয়স্থলের ভিন্নতার প্রতি স্পষ্ট ঈঙ্গিত রয়েছে। উদয়স্থলের ভিন্নতা মানেই এক দেশে চাঁদ দেখে অন্য দেশে ঈদ করা যাবে না। নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখে ঈদ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে নবী (সা.) লোকেরা আপনাকে নতুন চাঁদসমূহের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, আপনি উত্তরে তাদেরকে বলুন, ‘নতুন চাঁদগুলো সকল মানুষের জন্য আলাদা আলাদা সময় নির্ধারণকারী এবং হজের জন্য একই সময় নির্ধারণকারী। (সূরা: বাকারা:১৮৯) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির গ্রন্থ রূহুল মায়ানিতে বলা হয়েছে “ উক্ত আয়াতের সাথে পূর্বের আয়াতগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। পূর্বের আয়াতগুলোতে রোজা ও রমজান মাসের বর্ণনা ছিল। কেননা, রোজা ও ঈদ নতুনচাঁদ দেখার সাথে সম্পৃক্ত। আর এ জন্যই নবী সা. বলেছেন,‘ তোমরা নতুন চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং নতুন চাঁদ দেখে ঈদ করো।” (রূহুল মায়ানি:১/৪৬৮, দারুলকুতুব, আল ইলমিয়া, বয়রুত, লেবানন।)
 
বিশ্বময় মুসলিমের ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষে গোটা পৃথিবীতে এক দিনেই ঈদ করার দাবিতে সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক রক্ষামূলক সংগঠন রাবেতাতুল আলামিল ইসলামি (রাবেতারফিকহি বোর্ড) ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক বিশ্ব আলেম সম্মেলন করে। এতে উপস্থিত ছিলেন পুরো বিশ্বের সকল মাজহাবের বড় বড় ব্যক্তিত্ব। এ সভায় তারা নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন। “মুসলিম জাহানে চাঁদ ও ঈদ এক করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তা মুসলিমের ঐক্য নিশ্চিত করে না। যেমনটা চাঁদ ও ঈদ এক করার অনেক প্রস্তাবকারীর ধারনা। চাঁদ প্রমাণ হওয়ার বিষয়টি দেশগুলোর কাযা (বিচারবিভাগ) ও ফতোয়া বিভাগের উপর ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন। কারণ, এটিই ইসলামের সাধারণ কল্যাণ বিবেচনায় অধিকতর উত্তম ও উপযোগী। যে বিষয়টি উম্মাহর (জাতির) ঐক্য নিশ্চিত করবে তা হচ্ছে সকল বিষয়ে আল্লাহর রাসুলের সা. সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়া।” ( কারারাতুল মাজমাউল ফিকহিল ইসলামি, মক্কা মুকাররমা, মাসিকআলকাউসার)
 
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ, চকবাজার, ঢাকা।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close