সোমবার,  ১৬ জুলাই ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৬, ১৮:১৪:১৬

রোজার ভুলভ্রান্তির জন্য ফিতরা

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
সদকাতুল ফিতর রমজানের একটি অন্যতম ইবাদত। এটি ঈদের দিন গরিবদের খাবারের জন্য, ঈদের আনন্দ ধনী-গরিব সবাই ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য শরিয়ত প্রদত্ত ব্যবস্থাপত্র। সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এ দিনটিতে তাদের অন্যের কাছে চাওয়া থেকে বিরত রাখো।’
 
জাকাতের মতো সদকাতুল ফিতরও অর্থনৈতিক ইবাদত। রোজা পালন করতে গিয়ে আমাদের অনেক ভুলত্রুটি হয়েছে। তাই আমাদের এ সাধনা যেন বিফলে না যায়, অশেষ নেকি অর্জন করে যেন আখিরাতের জীবনকে ধন্য করতে পারি, সে জন্য আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একটি ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সেটি হলো ‘সদকাতুল ফিতর’ বা ‘ফিতরা’। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা পালনকারীর জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় অপরিহার্য করে দিয়েছেন, যা রোজা পালনকারীর অনর্থক, অশ্লীল কথা ও কাজ পরিশুদ্ধকারী এবং অভাবী মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা। যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের আগে এটা আদায় করবে, তা সদকাতুল ফিতর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। আর যে ঈদের সালাতের পর আদায় করবে তা অপরাপর (নফল) সদকা হিসেবে গৃহীত।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৭১)
 
প্রশ্ন হলো, ফিতরা দেবেন কে? এটি দেবেন সেই রোজাদার ব্যক্তি, যিনি ঈদের দিন ভোরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ হিসেবে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সমপরিমাণ সম্পদের মালিক। তার ওপরই সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের পোষ্য ও অধীনস্থদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন।
 
ফিতরা কত দিতে হবে?
 
১৬৫০ গ্রাম অথবা এর সমমূল্য গম ও আটার হিসাবে দিতে হয়। খেজুর, কিশমিশ, জবের হিসাবে ৩৩০০ গ্রাম অথবা এর সমমূল্য। জেনে রাখা প্রয়োজন, নবীজি (সা.)-এর যুগে মোট চারটি পণ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো। যেমন—খেজুর, কিশমিশ, জব ও পনির। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমাদের সময় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দ্বারা সদকা আদায় করতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল জব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর। (সহিহ বুখারি)
 
রাসুল (সা.)-এর যুগে গমের ভালো ফলন ছিল না বিধায় আলোচিত চারটি পণ্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করা হতো। এরপর হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর যুগে গমের ফলন বেড়ে যাওয়ায় গমকে আলোচিত চারটি পণ্যের সঙ্গে সংযোজন করা হয়। আর তখন গমের দাম ছিল বাকি চারটি পণ্যের তুলনায় বেশি। এই দাম বেশি থাকার কারণেই হজরত মুয়াবিয়া (রা.) গমকে ফিতরার পণ্যের তালিকভুক্ত করেছিলেন। সে হিসাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক এবার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ টাকা।
 
সদকাতুল ফিতর দুই সময়ে দিতে হয়। উত্তম হলো ঈদের নামাজের আগে আদায় করে দেওয়া। কেননা রাসুল (সা.) ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
 
জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত এমন অভাবী লোকদের সদকাতুল ফিতর দিতে হবে। একজন দরিদ্র মানুষকে একাধিক ফিতরা দেওয়া যেমন জায়েজ, তেমনি একটি ফিতরা বণ্টন করে একাধিক মানুষকে দেওয়াও জায়েজ। সদকাতুল ফিতরের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈদের খুশিতে গরিব শ্রেণির লোককেও শামিল করে নেওয়া। এর মাধ্যমে রোজার মধ্যে ত্রুটিবিচ্যুতির ক্ষতিপূরণও হবে। দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা হয়। এর ফলে ঈদের দিনগুলোতে দরিদ্র ব্যক্তিরা ধনীদের মতো সচ্ছলতা বোধ করে। সদকাতুল ফিতরের ফলে ধনী-গরিব সবার জন্য ঈদ আনন্দদায়ক হয়। সদকাতুল ফিতর আদায়কারী দানশীল হিসেবে পরিগণিত হয়। সদকাতুল ফিতর দ্বারা আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা হয়। তিনি নিজ অনুগ্রহে বান্দাকে পূর্ণ এক মাস রোজা পালনের তওফিক দিয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে সদকাতুল ফিতরের মতো আরেকটি ভালো কাজের তাওফিক দান করলেন।
 
সদকায়ে ফিতর গরিবদের ঈদের খুশিতে শরিক করার জন্য দেওয়া হয় বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে, তা যথার্থ নয়। হাদিসে সদকায়ে ফিতরকে প্রথমে কাফফারাতুন লিসসাওম—অর্থাত্ রোজা অবস্থায় অবচেতনভাবে যে ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে যায়, যার কারণে রোজা ভঙ্গ না হলেও দুর্বল হয়ে যায়। তার কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর তুমআতুন লিল মাসাকিন বা গরিবদের আহারের ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায়, সদকায়ে ফিতর আদায়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, রোজাদারের রোজা পূর্ণাঙ্গ করা, আর এতে করে গরিবের আহারের ব্যবস্থাও হয়ে যায়।
 
লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close