বুধবার,  ১৭ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৬, ১৯:৫৯:০৯

বিএমইটি-তে হয়রানির শিকার বিদেশগামীরা

এস এম সারফুদ্দিন শাওন

'যত দোষ নন্দ ঘোষ'- এ প্রবাদটি ব্যবহার করার জন্য প্রথমেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাই-বোনদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ কাউকে তিরস্কার বা খাটো করার জন্য নন্দ ঘোষের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এর ব্যবহার হয়েছে কেবল এ দেশের দুঃখী নারী কর্মীদের উদ্দেশ্যে।

বাংলার সবচেয়ে অবহেলিত, নিন্দিত, অধিকার বঞ্চিত বিশেষ করে দরিদ্র মানুষগুলো একমুঠো খাবারের জন্য, কেউবা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য (যে মানুষটি কখনো বাড়ির আঙ্গিনা অতিক্রম করেনি) আজ ঘর থেকে দূরে, বহু দূরে পাড়ি জমাতে চায়। দেশ হতে দেশান্তরে যেতে চায়।

তাদের স্বপ্ন একমুঠো অন্ন, একটুকু সুখের আবেশ, মাথা গোঁজার ঠাঁই, স্বচ্ছলতার জন্য আপনজনদের মায়া-মমতাকে পাথর চাপা দিয়ে যেতে চান স্বপ্নের দেশে। আর স্বপ্ন পূরণের দেশে যেতে ডিজিটাল বাংলাদেশে এনালগি কাজ কারবার সমাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্তরে। এতে তাদের নাভিশ্বাস চরমে। সইতে হয় নানান ঝামেলা।

ঝামেলার শুরুতেই রয়েছে পাসপোর্ট অফিস। তারপর ক্রমাগতভাবে পুলিশ, মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রধানকারী সিন্ডিকেট গামকা, মেডিকেল সার্ভিস। এছাড়া নতুন হয়রানির আর এক ধাপ হিসেবে যুক্ত হয়েছে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন পূর্বক সৌদি অ্যাম্বাসিতে জমাকরণ। অতপর যাচাইয়ান্তে ভিসা স্ট্যামপিং, বিএমইটি (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) কর্তৃক পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সনদ গ্রহণ করা, ছাড়পত্রের পূর্ব শর্ত হিসেবে সকল কর্মীদের ফিঙ্গার প্রিন্ট প্রদান করা।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশী আলোচিত সমালোচিত নতুন আইন হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে সাক্ষাৎকার পদ্ধতি। পাসপোর্ট ব্যতীত প্রতিটি কার্যাবলীর পূর্বেই যা সম্পন্ন করা উচিত। হায় রে প্রশাসন 'আগের কাজ পরে দুর্নীতি পোষে।' সবশেষে রয়েছে বহির্গমন ছাড়পত্র ও বিমান টিকেট।

উপরে উল্লেখিত প্রত্যেকটি সংস্থায় কপাল পোড়া মানুষগুলোর বিড়ম্বনার শেষ নেই। মনে হয় ওদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। সশরীরে দেখলে মনে হয় দুঃখের জন্যই সৃষ্টকর্তা তাদের পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। ওদের জন্য আছে কেবল হৃদয় নিংরানো তুচ্ছতায় গিবদ গাওয়া, কাটা গায়ে লবণের ছিটা দেওয়া। আর তারা দুঃখকে জয় করতে বিএমইটির ধুলাবালি গায়ে মেখে দীর্ঘ সময় লাইনে দাড়িয়ে, কখনো বসে কখনো বা যেখানে-সেখানে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনে।

বিএমইটি-তে হয়রানির শিকার বিদেশগামীরা

বিএমইটি'র এক আজব কাণ্ডের নাম 'সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া'। হায় রে দেশ ও দেশের সচেতন মানুষরা তাদের ভালবাসার কেউ কি নেই? কেউ কি স্বর্গীয় দূত সেজে আসবে না তাদের হয়রানি বা ভোগান্তির দূর করার মহান ব্রত নিয়ে। হ্যাঁ এক জনই আছে সে আমাদের জননেত্রী শেখ হাসিনা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দোহাই দিয়ে নিরীহ মানুষগুলোকে নির্বিচারে কষ্ট দিয়ে কি আদায় করতে চাচ্ছে?

যে মানুষগুলোর কষ্টার্জিত শ্রমের টাকায় বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা দ্রুত থেকে দ্রুততম গতিতে ঘুরছে তাদের ইজ্জত নেই একটু-আধটুকু; বসার জায়গা নেই, আছে কেবল অপরাধীর মত লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সাক্ষাৎকার। অথচ ঐ শক্তিকে পুঁজি করে চলমান সরকার যে সকল প্রকল্প হাতে নিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে পদ্মা সেতুর কাজ, মেট্টো রেলের কাজ, বিআরটি'র কাজ, পাতাল সড়কের কাজ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বহুমুখী প্রকল্পের বিনির্মাণে অংশীদার সে মানুষগুলোকে একটু সমীহ করে কথা বলা, তাদের কাজে সহায়তামূলক মনভাব পোষণ করা, বিদেশ গমনের পথে যে সব অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে সে সব কার্যাবলী সেবার মনভাব নিয়ে সততার সাথে করলে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে একধাপ এগিয়ে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটবে। যা আজ সময়ের দাবি।

আর চলমান প্রক্রিয়ায় হয়রানিগ্রস্ত কর্মীদের ভোগান্তি লাঘবের স্বার্থে অন্ততপক্ষে ফিঙ্গার প্রিন্ট গ্রহণের সময়ে এ কাজটি করা যেতে পারে। নতুবা প্রশিক্ষণ গ্রহনের সময়েও এ কাজটি করা যেতে পারে। এতে করে বার বার এদেরকে ঢাকায় আসতে হবে না। অপরদিকে যানজটও সৃষ্টি হবে না।

আমি গভীরভাবে লক্ষ করেছি, যে দিন থেকে সাক্ষাৎকার ব্যবস্থা চালু করেছে তার কয়েক দিন পর মহানগরীতে যানজটে নাকাল নগরবাসী। ধারণা করা হচ্ছে, গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হররোজ অসংখ্য মানুষ সাক্ষাৎকার এবং ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে আসায় নগর জীবনে দেখা দিয়েছে যানজট নামক মহামারী।

যতই ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হোক না কেন প্রশাসনিক কর্ম পরিধির বিকেন্দ্রীকরণ না করলে, বিদেশগামী কর্মীদের এক বারে যে কাজ করা সম্ভব সে কাজ বার বার করার নিমিত্তে তাদের ঢাকায় আসাতে বাধ্য করা হলে যানজট সমস্যা সমাধান করা স্বপ্নই থেকে যাবে।

যতটুকু বুঝতে পেরেছি সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত মতে কম বয়সী আর বেশী বয়স্ক নারী কর্মী বিদেশ গমনে কঠোরতা আরোপ করার জন্যই আজকের এ দৃশ্যপট। নিঃসন্দেহে সকল বাঙালি এ কার্যক্রমকে স্বাগতম জানাতে প্রস্তুত। আপত্তি শুধু বিশৃঙ্খল মানবতাহীন অবস্থায় স্বল্প সময়ের অর্থাৎ সকাল ৯ থেকে ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে এজেন্সি মারফত আবেদন জমা দিতে হবে। অতঃপর সাক্ষাৎকার। এক মিনিট গত হলে যতই অনুনয়-বিনয় করুক না কেন তাদের হৃদয়ে নূন্যতম জাগরণ সৃষ্টি করতে পারা যায় না।

আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই 'প্রয়োজন আইন মানে না'। যে সব কর্মীরা বিদেশ যায় তাদের বেশীর ভাগ লোকদের হয়ত এটাই প্রথম ঢাকায় সফর। দুই নম্বরে তাদের ঢাকায় থাকা খাওয়ার তেমন কোন ব্যবস্থাও নেই। এমনিতে যানজটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব হয়ে উঠে না।

এ কারণে প্রতিদিন শত শত কর্মী হয় সাক্ষাৎকার বঞ্চিত। বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ সকলের।

সরজমিনে জানা গেল ছকিনা বেগম নামে এক কর্মী তিন দিন পর সাক্ষাৎকারে সক্ষম হয়েছেন। এ যদি হয় বিএমইটির অবস্থা, ক্ষুধা-মন্দা লাগতে বেশী দেরি হবে না।

বিশ্বাস করি, আমার দেশের নারী কর্মীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্যাতিত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য আমার দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতরা দেশের এ শ্রমজীবী মানুষগুলোর কল্যাণে বিশেষ কোন ভূমিকা রাখছে-এমনটা দেখা যায় না। প্রবাসী কর্মীদের মাধ্যমে জানতে পারলাম তাদের অভিযোগ শোনার মত সময় তাদের নেই। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন এসে যায় তাদের কাজ কি?

যে লোকগুলোর রেমিটেন্সের টাকা আর আমার দেশের গরীব কৃষকের করের টাকায় যাদের বেতন চলে তাদের কথা শোনার সময় নেই; আছে কেবল আরাম-আয়েশ করে বিলাস বহুল জীবনযাপনে সদা ব্যস্ত। এ হল আমার দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা। মোদ্দা কথা কর্মীর স্বার্থের চাইতে নিজস্ব স্বার্থেই বেশী কাজ করে থাকেন ঐ সব রাষ্ট্রদূতরা। তাই এ দিকটা বেশী সচেতন হওয়ার দাবি করছি।

দেশ-বিদেশে গৃহকর্মী নির্যাতন মাঝে মধ্যেই মিডিয়ার কল্যাণে দেখতে পাই। তাই বলে গৃহকর্মী নিয়োগ বা প্রেরণ বন্ধ করে দেওয়া সমাধানের পথ হতে পারে না। মাথায় টিউমার হয়েছে তাই মাথা কেটে ফেলে দেয়া যেমন সমাধান হতে পারে না। তেমনি সমস্যা সমাধানের পথ আবিষ্কার করা হবে অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

তাই দেশে বিদেশে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে এমন একদিন আসবে আমাদের বিদেশ যেতে হবে না। বিদেশি প্রভুদের তোষামোদি করতে হবে না। জনগণকে জনসম্পদে পরিণত করতে পারলে এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স সদব্যবহারের ফলে আমরা উন্নত হবোই।

পরিশেষে আবারও বিনীত অনুরোধ করব, বিদেশ গমনে গৃহকর্মীদের কষ্ট লাঘবে, ঢাকাকে যানজটমুক্ত রাখতে বিএমইটি পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাচাই-বাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভর্তি ও প্রশিক্ষণ সনদ প্রদান করলে অসহায় কর্মীরা কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন। নগরবাসীও সুফল পাবের। মন্ত্রী পরিষদে অনুমোদিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মতে ১৪২ তলা ভবন নির্মাণেও গতি সঞ্চার হবে।

মানুষজন যত বেশী বিদেশ যাবে অর্থনীতি তত বেশী চাঙ্গা হবে। বিএমইটির কর্মকর্তাদের এ কথাটি মাথায় রেখে সেবার মনভাব নিয়ে কাজ করলে ইনশাল্লাহ সোনার বাংলা রূপায়ন দ্রুততম সময়ে মধ্যেই সম্ভব।

লেখক: এস এম সারফুদ্দিন শাওন, পেশাজীবী।

এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close