মঙ্গলবার,  ১৭ জুলাই ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৬, ১২:৪৭:০৪

ঈদের আনন্দ বঞ্চিত হচ্ছেন ১৫০১৯জন পুলশিক্ষক

মো. আবু তালেব
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নিয়োগকৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫০১৯ জন পুল শিক্ষকের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাদের জীবনে নেমে এসেছে চরম হতাশা, মানসিক যন্ত্রণা আর সীমাহীন দুর্ভোগ। সরকারের একের পর এক আশ্বাস সত্ত্বেও নিয়োগ না পাওয়া এসব শিক্ষকের অনেকের চাকরির বয়স পেরিয়ে গেছে। তাদের পরিবারে দেখা দিয়েছে অশান্তি,চরম অভাব,অনাটন।ফলে তারা অনাহারে, অর্ধাহারে দিন পাতিত করছে। মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন কেউ কেউ। তারা আদৌ চাকরি পাবেন কি না এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বরাবরের মতো এবারও ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন পুল শিক্ষকরা।যেখানে অন্য সহকারি শিক্ষকগণ নিয়মিত বেতন ছাড়াও ঈদ বোনাস,বৈশাখী ভাতা সহ যাবতীয় সু্যোগ সুবিধা পান।সেখানে একই যোগ্যতা সম্পন্ন এবং সম পরিমাণ পরিশ্রম করে পুল শিক্ষকগন পূর্ণ বেতন তো দুরের কথা, ঈদ বোনাস, বৈশাখী ভাতা ইত্যাদি কোনি সুযোগ সুবিধাই পান না।সর্বসাকুল্যে তাদের কে মাসিক সম্মানী ৬০০০ টাকা মাত্র। ফলে তাদেরকে বরাবরের মতো এবারও ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
 
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৪ আগস্টে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদের বিপরীতে প্রাথমিক সহকারি শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। উক্ত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ২০১২ সালে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে সকল যোগ্যতা প্রমাণ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ২৭,৭২০ জনের মধ্যে ১২,৭০১ জনকে নিয়মিত নিয়োগ দিয়ে অবশিষ্ট ১৫,০১৯ জনকে পরবর্তীতে নিয়োগের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।
 
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখিয়ে দীর্ঘ দিন নিয়োগ বঞ্চিত রাখার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে ২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পুল শিক্ষকদের নিয়োগের উদ্যোগ নেয়।
 
কিন্তু দুঃখের বিষয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক অদ্ভুত, অসহায়ত্ব ও অমানবিক নীতিমালা জারি নিম্নোক্ত শর্তের বিনিময়ে বাড়ি হতে ২০ থেকে ৫০ কি.মি. দূরের কোন বিদ্যালয়ে ৭ দিন হতে সর্বোচ্চ ৬ মাসের নিয়োগ প্রদান করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
 
নীতিমালার কয়েকটি শর্ত যেমন-
১.পুল শিক্ষকদের মাসিক সম্মানী হবে সর্বসাকুল্যে ৬০০০ টকা।
২.তাদের কোন ছুটি প্রদান করা হবেনা।
৩.একদিন অনুপস্থিত থাকলে আড়াআড়ি ভাবে ২০০ টাকা কেটে নেওয়া হবে।
৪.এ চাকরি হবে সাময়িক ও সর্বোচ্চ ৬ মাসের জন্য অর্থাৎ মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা ডিপিএড ও সিএনএট জনিত প্রশিক্ষণে থাকা সাময়িক শূন্যপদে।
৫.এ চাকরি স্থায়ীকরনের জন্য কোন আন্দোলন করা যাবেনা।
৬.পরপর ৭ দিন অনুপস্থিত থাকলে অটোমেটিকলি চাকরি বাতিল বলে গণ্য হবে।
৭.চাকরিতে যোগদানের সময় ১৫০ টাকার নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে সই দিতে হবে এবং ইত্যাদি।
 
যেখানে একই বিদ্যালয়ের একজন পিয়নের বেতন ১৪০০০ টাকা এবং অন্য সহকারি শিক্ষকদের বেতন ১৮০০০ টাকা। আর সেখানে পুল শিক্ষকদের সর্বসাকুল্যে সম্মানী ভাতা ৬০০০ টাকা।যা দিয়ে সংসারের ভরন পোষণ তো দূরের কথা বিদ্যালয়ে যাতায়াত বাবদই সব শেষ হয়। অথচ পুল শিক্ষকগন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে ডিগ্রি,অনার্স,মাস্টার্স কম্পিলিট করেছে। বর্তমানে অনেকেরই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স শেষ হয়ে গেছে।ফলে এই পুল শিক্ষকই তাদের শেষ সম্বল। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে নিয়োগ বঞ্চিত থাকার ফলে চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলা দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে একই বিদ্যালয়ের পিয়ন, সহকারি শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক এবং বন্ধু বান্ধবির উপহাস, তিরস্কার নিরবে সহ্য করতে হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উপরের কোন শর্তই উল্লেখ ছিলনা। এটা সম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষের মনগড়া শর্ত।ফলে ১৫০১৯ জন পুল শিক্ষকদের জীবনে নেমে এসেছে নিরব অসহনীয় ও অমানবিক মানসিক যন্ত্রণা।
 
এ ছাড়াও ২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক জারিকৃত "পুল শিক্ষক নীতিমালা ২০১৪" এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে করা ৭২ টি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ০৩/০২/২০১৬ তারিখে ২৫০০ জন পুল শিক্ষককে নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন করে নিয়োগের প্রতি আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করে।সরকার পক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও চেম্বার জজ আদালত পুল শিক্ষকদের পক্ষেই রায় বহাল রাখে।
 
কুড়িগ্রামের পুল শিক্ষক মো. আ: হাকিম দু:খ প্রকাশ করে বলেন, সামনে ঈদ আসলেও আর্থিক সংকটের কারণে ঈদের কেনাকাটা করতে পারছি না।
 
ময়মনসিংহের পুল শিক্ষক মো. ফরহাদ হোসেন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবান্ধব ও ডিজিটাল বাংলাদেশে ১৫০১৯ জন পুল শিক্ষক বিগত কয়েকটি ঈদের মতো এবারও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।এটা কখনই মেনে নেওয়া যায় না।
 
কিশোরগঞ্জের পুল শিক্ষক কাউসার আহমেদ মামুন বলেন,আমরা সহকারি শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছি।আমরা পুল শিক্ষক নই।আদালত পুল শিক্ষক নীতিমালা কে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
 
তাই অন্য সহকারি শিক্ষকদের মতো ঈদ বোনাস পাওয়ার যোগ্য আমরাও।অথচ আমাদের কে ঈদ উদযাপন  তথা ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে।ঈদের দিনেও মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমাদের একটাই দাবি আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পুল শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ প্রদান করা হোক।
 
লেখক: পুল শিক্ষক, কালিগঞ্জ, লালমনিরহাট।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close