মঙ্গলবার,  ১৬ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৬, ২২:৪০:৪৬

সাফাদি বিতর্কে মিডিয়ায় বৈষম্যমূলক কভারেজ

কদরুদ্দীন শিশির
গত ২৭ মে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, ‘সজীব ওয়াজেদের সঙ্গে “বৈঠক” হয়েছে : সাফাদি।’ তার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী জাহিদ এফ সরদার সাদী নামের এক বাংলাদেশি (যিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট) নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও আপলোড করেন।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন ও সাদীর ভিডিও দুটোই বাংলাদেশে সম্প্রতি আলোচিত ইসরায়েলি রাজনীতিক ও বাংলাদেশ সরকারের মতে ‘মোসাদ এজেন্ট’ মেন্দি এন সাফাদির দুটি আলাদা সাক্ষাৎকার। উভয় সাক্ষাৎকারে সাফাদি জানিয়েছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাগারে আটক বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে ভারতে সাক্ষাৎ করার আগে তাঁর (সাফাদি) সঙ্গে বিবিসি কথিত বাংলাদেশি নাগরিকেরও দেখা হয়েছিল।
প্রায় এক মাস ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মেন্দি এন সাফাদি এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকার কয়েকটি পত্রিকায় ‘গোয়েন্দা সূত্রের’ বরাতে আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে সাফাদির বৈঠকের খবর প্রচারিত হয়। প্রতিবেদনগুলোতে দাবি করা হয়, আসলাম ‘মোসাদ এজেন্ট’ সাফাদির সঙ্গে মিলে শেখ হাসিনা সরকারকে ভারতে বসে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে। মিডিয়ায় এমন প্রচারণার ভিত্তিতে ১৫ মে সরকার আসলামকে গ্রেপ্তার করে এবং ২৬ মে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে।
রাজনীতিতে ইতিমধ্যে কোণঠাসা হয়ে থাকা বিরোধী দল বিএনপি নতুন এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’-এ আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। রিমান্ডে আসলাম সব ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করে বিএনপি এবং জোটের আরও বেশ কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্ট থাকার তথ্য জানিয়েছেনÑএমন প্রতিবেদন ১৫ মের পর থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পত্রিকায় বড় ধরনের কভারেজে ছাপা হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতা, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সাফাদি ইস্যুতে বিএনপির সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন এবং এমন ষড়যন্ত্রের পরিণতি ভালো হবে না বলে তাঁরা নিয়মিত হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। ফলে সাফাদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ‘হট ইস্যু’র মর্যাদা পাচ্ছেন। এ অবস্থায় রাজনীতি-সচেতন প্রত্যেক মানুষ খুবই সতর্কতার সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে থাকবেন, এটিই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ বিষয়ে সাফাদির যেকোনো নতুন বক্তব্য বা তথ্য সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু সাফাদি-সংক্রান্ত বিবিসিতে প্রকাশিত ২৭ মের প্রতিবেদনটি পরের দিনের ঢাকাই পত্রিকাগুলোতে একেবারে ‘ব্ল্যাকআউট’ করে দেওয়া হয়।               
অথচ একই দিন সাফাদির সঙ্গে আসলামের বৈঠক ইস্যুতে একাধিক প্রতিবেদন ছিল এসব পত্রিকায়। ২৮ মের জাতীয় পত্রিকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১০টিকে বেছে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, মাত্র একটি পত্রিকা ছাড়া বাকি নয়টিতে সজীব ওয়াজেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া নিয়ে সাফাদির বক্তব্যের ওপর কোনো প্রতিবেদন ছাপা হয়নি! পর্যবেক্ষণকৃত পত্রিকাগুলো হচ্ছে, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ইনকিলাব, কালের কণ্ঠ, সমকাল, ইত্তেফাক, যুগান্তর, জনকণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন।
একমাত্র দৈনিক ইনকিলাব সাফাদির বক্তব্য ছাপিয়েছে। তবে সেটা করতে পত্রিকাটিকে ‘কৌশলের’ আশ্রয় নিতে হয়েছে। প্রথম পাতায় সিঙ্গেল কলামের সংবাদটির শিরোনাম হচ্ছে, ‘জয়ের সাথে এন সাফাদির বৈঠকের খবর জানা নাই, এটা অপপ্রচার হতে পারে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।’ প্রতিবেদনের নিচের দিকে সাফাদি কথিত সাক্ষাৎ বিষয়ে কী বলেছেন, তা পুরোটা তুলে ধরলেও বিবিসির প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু ছাপানোর ‘ঝুঁকি’ নিতে চায়নি পত্রিকাটি! বাকি ৯টি পত্রিকায় কথিত সাক্ষাৎকার নিয়ে সাফাদির কোনো বক্তব্য নেই। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে এটিকে অপপ্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, সেই তথ্যটা এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি কেউ। কিন্তু এই একই সাফাদি নিয়ে আসলাম-সংক্রান্ত নানা তথ্য ঠিকই রয়েছে পত্রিকাগুলোতে! বিশেষ করে দৈনিক যুগান্তর-এর একটি রিপোর্ট ছিল বেশি লক্ষণীয়। ‘যমুনা টিভির এক্সক্লুসিভ : সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির কথা স্বীকার সাফাদির’ শিরোনামে প্রথম পাতায় একটি সংবাদ ছাপিয়েছে পত্রিকাটি। অর্থাৎ তারা সরকারপ্রধানের উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক-সংক্রান্ত সাফাদির সাক্ষাৎকারকে ব্ল্যাকআউট করে গেলেও বিএনপি নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎকার সংক্রান্ত রিপোর্টটিকে ঠিকই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে! বাকি ৮টি পত্রিকায় আসলামের সঙ্গে ‘সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে’ আরও অনেকের জড়িত থাকা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, আসলামের রিমান্ড আবেদন, বিএনপির মুখপাত্র রিজভী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের এ-সংক্রান্ত বক্তব্য ইত্যাদি নিয়ে এক বা একাধিক প্রতিবেদন ছিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে দেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে প্রথম সারি বলে স্বীকৃত কোনোটিতেও খবরটি ২৭ বা ২৮ মে পরিবেশিত হয়নি। দ্বিতীয় সারির কয়েকটিতে অবশ্য দেখা গেছে ভিডিওসহ এই খবরটি।
একই ইস্যু, একই রকম অভিযোগ। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি ভিন্ন হওয়ায় মিডিয়া কভারেজে এমন বৈষম্য সংবাদ পাঠকদের জন্য বিভ্রান্তিকর।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close