বৃহস্পতিবার,  ২৩ নভেম্বর ২০১৭  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৬, ১৭:২৫:১৫
কামিনী রায়

বাঙালি নারী আন্দোলন

সানাউল্লাহ সাগর
করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,-
পাছে লোকে কিছু বলে।
(পাছে লোকে কিছু বলে)
এই বিখ্যাত পঙ্ক্তির জন্ম হয়েছে যার হাতে, তিনি কবি কামিনী রায়। যেখানে যে কথা বলা উচিত। মনের স্বাধীনতা মন যা করতে চায় সমাজ-রাষ্ট্র আর দেয়াল তুলে রাখা সামাজিক তথাকথিত সম্মানের ভয়ে আমরা অনেক সময়ই তা করতে পারি না। নিজের মধ্যে ফুলে ফুলে সে কথা জোর বিপ্লব করতে থাকলেও তাকে নিজের মধ্যেই চেপে রাখতে হয় সমাজ নামক দেয়ালের মধ্যে। যেখানে বাক্‌স্বাধীনতা নেই। নিয়মের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মরে যায় অঙ্কুরিত সাহসী চিন্তা। কবি কামিনী রায়ের কলম সে কথা বলতে থেমে থাকেনি। তিনি অকপটে বলে গেছেন। তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা। বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের আধুনিক কালে যেসব নারীদের হাতে সম্মৃদ্ধি লাভ করেছে কবি কামিনী রায়ে তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বৃহত্তম বরিশালের ঝালকাঠী জেলার বাসন্ডা গ্রামে ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন ভারতীয় প্রথম মহিলা স্নাতক ডিগ্রিধারী। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ১৮৮৬ সালেই তিনি বেথুন কলেজের স্কুল বিভাগে শিক্ষয়িত্রীর পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি ওই কলেজে অধ্যাপনাও করেছিলেন। যে যুগে মেয়েদের শিক্ষাও বিরল ঘটনা ছিল, সেই সময়ে কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর অনেক প্রবন্ধেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি নারী শ্রম তদন্ত কমিশন (১৯২২-২৩)-এর সদস্য ছিলেন। ১৯০৫ সালে তিনি প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বালিকা শিক্ষা’র আদর্শ রচনা করেন।
বাংলাকাব্যে রবীন্দ্র যুগেই কামিনী রায়ের আবির্ভাব। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে আর কামিনী রায়ের জন্ম ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে। সে হিসাবে কামিনী রায় প্রায় রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক কবি। কিন্তু তাঁর কবিতায় নিজস্বতা রয়েছে। রবীন্দ্র আলোয় থেকেও তাঁর কবিতার ভাষা হয়েছে অন্য রকম। আর নারীদের অধিকার আদায়ের উচ্চারণ স্পষ্ট। কবি নিজের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর ‘লক্ষ্যতারা’ কবিতায়-
‘বিশাল গগন মাঝে এক জ্যোতির্ম্ময়ী তারা
তাহারেই লক্ষ্য করি চলিয়াছি অবিরাম।
ঘনঘোর তমোজালে জগৎ হয়েছে হারা,
পরবাসী আত্মা মম চাহে সে আলোকধাম।
কঠোর বসুধা-বুকে ভ্রমিতেছি শুষ্ক মুখে,
থামিব কি এইখানে? কোন স্থানে কোন দিন
ধরারে ধরিয়া হাতে স্বরগ লইবে সাথে,
আলোক নীরধি মাঝে আঁধার হইবে ক্ষীণ।’
কবিতাটির ইতিহাস কবি ব্যক্ত করেছেন যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তকে? ‘যেদিন বেথুন স্কুলে শিক্ষয়িত্রীরূপে প্রবেশ করিলাম, সেই দিন সন্ধ্যাকালে Lady Superintendent-এর বাড়ীতে নির্জ্জন প্রকোষ্ঠে বসিয়া এই কবিতাটি লিখি। পুরাতন স্থানে নূতন জীবন আরম্ভ করিয়াছিলাম, অনেক দিন পরে আবার পরিবার হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া আসিলাম, বড়ই একলা মনে হইতেছিল। কিছু কাজ করিব, জীবনটা নষ্ট হইতে দিব না, এই একটা আকাক্সক্ষা চিরদিনই ছিল। জীবনে আদর্শ ছিল কাজে লাগা। সেই আদর্শ অনুসরণ করিয়া বেথুন কলেজে চাকরী লই। বাড়ীতে স্বজন পরিবেষ্টিত হইয়া কি কাজে আসিতাম না? রুল করা ঊীবৎপরংব নড়ড়শ-এর পাতা ছিঁড়িয়া তাহার উপর কবিতাটি লিখিয়াছিলাম পেন্সিল দিয়া, এখনও বেশ মনে পড়ে।’
তৎকালীন বাঙালি নারীদের মধ্যে প্রথম স্নাতক ডিগ্রি লাভের ফলে তিনি এ অঞ্চলের নারীদের পিছিয়ে পড়া, শিক্ষার অভাব, অবলা বলে অবহেলিত করে রাখার বিষয় তাঁর মধ্যে কিছু করার তাড়না বোধ করেন। আর সে কারণেই তাঁর লেখার মধ্যে বাঙালি নারীদের দুঃখ-দুর্দশার কথা সহজ ভাবে প্রতিবাদী স্বরে চলে এসছে।
‘ত্রিদিবে দেবতা নাও যদি থাকে ধরায় দেবতা চাহি গো চাহি,
মানব সবাই নয় গো মানব, কেহ বা দৈত্য, কেহ বা দানব,
উৎপীড়ন করে দুর্বল নরে, তাদের তরে যে ভরসা নাহি,
ধরায় দেবের প্রতিষ্ঠা চাহি।’
(ধরায় দেবতা চাহি)
প্রচলিত পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষের প্রতি আস্থা নাই। পুরুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টায় নারীদের কোণঠাসা করে রেখেছে। যার কারণে নারী তাঁর অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে নারীরা আরও পিছিয়ে পড়বেন। এ জন্য কবি পৃথিবীতে আবার সেই দেবতাকে চেয়েছেন, যাকে দিয়ে নারী-পুরুষের সমঅধিকার বাস্তবায়ন হবে। যে এলে পুরুষের এই একক দৌরাত্ম্য আর নারীদের ওপর অত্যাচার কমে যাবে। নারীরাও কথা বলতে পারবে। সমাজের সব স্তরে তাঁদেরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দেবতা না এলে নারীকে দেবতার মতো বর দিয়ে যেন সৃষ্টিকর্তা নারী-পুরুষে সমতা ফিরিয়ে আনেন, সে প্রার্থনা করেছেন কবি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার নিকট নারীর অধিকার আদায়ের বাসনা নিয়ে বসে থেকে থেকে ক্লান্ত কবি। তাঁর অপেক্ষার সময় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে, তবু প্রত্যাশিত দেবতা আসে না। যে কিনা নারীদের কষ্ট বুঝতে পারবে। আর পুরুষের এই কর্তৃত্ব কমিয়ে দিয়ে নারীদের যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়তা করবে। নারীদের মুখে ফিরিয়ে দেবে স্বর্গীয় হাসি। কিন্তু শেষে যেন সকৃষ্টিকর্তার প্রতিও বিশ্বাস রাখতে পারেন না কবি। তাঁর ধৈর্যের সীমা ভেঙে যেতে থাকে। তাই যেন কবি অনন্ত অভিমান নিয়ে উচ্চারণ করেন?
‘প্রেমময় বিধাতার বরে
সে বাসনা পূর্ণ হ’লো তার...
অনুভূতি কঠোর প্রস্তরে,
প্রতিমায় জীবন সঞ্চার।
পাষাণের প্রতিমাটি যবে
প্রাণময়ী নারীরূপ ধরে,
নারী তবে পাবে না কি তবে
দেবী হতে বিধাতার বরে?
(মুগ্ধ প্রণয়)
কিন্তু দেবতাকে চাইলেই তো তিনি নেমে আসবে না। এই মানুষ্য পৃথিবীতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, হানাহানি আর লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেবতার আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ দেখে কবি শেষে পুরুষের প্রতি এ কথা বলেন?
মোরে প্রিয় কর’না জিজ্ঞাসা,
সুখে আমি আছি কিনা আছি।
ডরি আমি রসনার ভাষা;
দোঁহে যবে এতা কাছাকাছি,
মাঝখানে ভাষা কেন চাই;
বুঝবার আর কিছু নাই?
হাত মোর বাঁধা তব হাতে
শ্রান্ত শীর তব স্কন্ধোপরি
জানি না এ সুগন্ধি সন্ধ্যাতে
অশ্রু যেন ওঠে আঁখি ভরি।’
(কর’না জিজ্ঞাসা)
অন্য এক কবিতায় নারীদের দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন?
‘এদেরও তো গড়েছন নিজে ভগবান,
নবরূপে দিয়েছেন চেতনা ও প্রাণ;
সুখে দুঃখে হাসে কাঁদে স্নেহে প্রেমে গৃহ বাঁধে
বিধে শল্যসম হৃদে ঘৃণা অপমান,
জীবন্ত মানুষ এরা মায়ের সন্তান॥’
(এরা যদি জানে)
বাংলা সাহিত্যের নারী জাগরণের কথকতায় যাদের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে তাঁদের মধ্যে বেগম রোকেয়া পরবর্তী সময়ে সুফিয়া কামাল। বাংলা সাহিত্যে বেগম রোকেয়া ও সুফিয়া কামাল আর হালের তসলিমা নাসরিনের হাতে যে নারীবাদীর ঝা-া আর প্রতিবাদী উচ্চারণ, তার শুরুটা হয়েছিল কবি কামিনী রায়ের হাতেই। কামিনী রায়ের কবিতার ভাব-পরিম-ল প্রকৃতিবোধ, স্বদেশপ্রেম, গার্হস্থ্য জীবন, মৃত্যুচেতনা, নীতিচিন্তা, নারীবাদী চিন্তা- এইসব বিষয় নিয়ে গড়ে উঠলেও। নারীরবাদের কথা প্রধান হয়ে উঠেছে। তাঁর গদ্যরচনাতেও উপযুক্ত বিষয়সমহ কমবেশি পাওয়া যায়। তবে শতবর্ষ পূর্বে কামিনী রায়ের সাহিত্যকর্মে লিঙ্গবৈষম্য ও সচেতনতার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা রীতিমতো বিস্ময়কর।
‘জ্ঞানবৃক্ষের ফল’ নামক প্রবন্ধে কামিনী রায় লিখেছেন?
‘পুরুষের প্রভুত্বপ্রিয়তাই স্ত্রীলোকের জ্ঞানর্জ্জনের একমাত্র অন্তরায় না হইলেও মুখ্য অন্তরায়। আমরা দেখিতে পাই অনুশীলনের অভাবে শিক্ষা অনেক সময় ব্যর্থ হইয়া যায়। স্ত্রীজাতি জননী জাতি বলিয়া অধীত বিষয়ের অনুশীলনে তাহার অবসর পুরুষ হইতে অনেক কম। পত্নীত্ব ও জননীত্ব নারীর কর্তব্যক্ষেত্রে যেমন সীমাবদ্ধ করিয়াছে, শিক্ষাকালও তদ্রুপ অল্প পরিসর করিয়াছে। নারী কি সে জন্য অসুখী? বর্তমানে এক কথায় ইহার উত্তর সম্ভবে না। জগতের সংখ্যাতীত রমণী এবং বহুল পুরুষ জ্ঞানলাভে নিরুৎসুক, এমনকি একান্ত বিমুখ। কিন্তু পুরুষ সাধারণের জন্য শিক্ষার যেরূপ ব্যবসা, নারী সাধারণের জন্য তদ্রুপ ব্যবসা নাই। সংসারে প্রবেশ করিয়া সকল পুরুষ জ্ঞানর্জ্জনে ব্যস্ত থাকে না। আপনাপন ব্যবসা ও চাকরী লইয়াই অধিকাংশ সময় কাটায়। নারী আপনার গৃহকর্ম ও গৃহধর্ম্মে ব্যস্ত থাকিবে বলিয়া পূর্ব হইতেই তাহার শিক্ষার পথ রুদ্ধ। যে জন্মান্ধ সে আলোকের জন্য কাঁদে না। কিন্তু যে একবার আলোক দেখিয়া দর্শন সুখে বঞ্চিত আছে সে নিতান্তই দুঃখী। এরূপ দুঃখিনী নারীর সংখ্যা নিতান্ত বিরল নহে।’
কবি কামিনী রায় যে কাজ শুরু করেছিলেন, তিনি জানতেন হয়তো তিনি সফল হবেন না। তবে তাঁর পথ ধরে যে নতুন পথের তৈরি হবে, তাতে তাঁর কোনো সন্দেহ ছিল না। আর সেই নতুন পথ তৈরি করে দেবে বাঙালি নারীদের প্রতিবাদের ভাষা, অধিকার আদায়ের ভাষা। তিনি প্রত্যাশা আর প্রশ্ন রেখে গেছেন পুরুষশাসিত এই সমাজ-রাষ্ট্রের কাছে?
‘নৈরাশপূরিত ভবে
শুভ যুগ কবে হবে,
একটি প্রাণের তরে আর একটি প্রাণ
কাঁদিবে না সারা পথে;
প্রণয়ের মনোরথে
স্বর্গমর্ত্যে কেহ নাহি বাধা দান?’
(প্রণয়ের ব্যথা)
আমরাও কবি কামিনী রায়ের মতো প্রত্যাশায় থাকি। মানুষের ভেদাভেদ আর লিঙ্গবৈষম্য দূর হয়ে সমাজে আসুক সেই শুভ দিন যখন সব মানুষ সুযোগ পাবে তাঁর চিন্তা প্রকাশ করা, তাঁর কথা বলার। নারী বলে তাদের আর অবলা ভাবা হবে না।
কবি কামিনী রায়ের লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আলো ও ছায়া (১৮৮৯), নির্মাল্য (১৮৯১), পৌরাণিকী (১৮৯৭), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), অশোক সঙ্গীত (সনেট সংগ্রহ, ১৯১৪), অম্বা (নাট্যকাব্য, ১৯১৫), দীপ ও ধূপ (১৯২৯), জীবন পথে (১৯৩০), একলব্য, দ্রোণ-ধৃষ্টদ্যুম্ন, শ্রাদ্ধিকী। এ ছাড়া অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘মহাশ্বেতা’ ও ‘পু-রীক’ তাঁর দুটি প্রসিদ্ধ দীর্ঘ কবিতা।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close