বৃহস্পতিবার,  ২৩ নভেম্বর ২০১৭  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৬, ১৮:০২:৪১

চিত্তরঞ্জন দাশের সাহিত্যসাধনা ও রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ

পূরবী বসু
আজ ১৬ জুন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ৯১তম প্রয়াণবার্ষিকী। তিনি একজন বাঙালি আইনজীবী, রাজনীতিবিদ। স্বরাজ্য পার্টির প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। কিন্তু তাঁর সাহিত্যচর্চার বিষয়টি আমাদের সামনে ব্যাপকভাবে আসেনি। এ প্রবন্ধে তা তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর প্রয়াণবার্ষিকীতে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর শ্রদ্ধাঞ্জলি
 
দার্জিলিংয়ে স্বাস্থ্য ভালো করার উদ্দেশে বেড়াতে গিয়ে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে চিত্তরঞ্জন দাশের (১৮৭০-১৯২৫) আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। তখন উপমহাদেশের সেই বিশেষ ক্রান্তিকালে চিত্তরঞ্জন যদি মারা না যেতেন, কিংবা তাঁরই উদ্যোগে বাংলার হিন্দু-মুসলমান নেতাদের দ্বারা স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ (১৯২৩) সেই বছরেরই শেষ দিকে কংগ্রেসের অধিবেশনে কংগ্রেসের নেতারা কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত যদি না হতো, বাংলার তথা ভারতের ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণ অন্যভাবে লিখিত হতো। চিত্তরঞ্জনের রাজনৈতিক জীবনের দৈর্ঘ্য বড়ই ছোট। মাত্র ছয়-সাত বছর। এত অল্প সময়ে এত বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর এত বড় প্রভাব আর কোনো জননেতা ফেলতে পেরেছেন বা পারছেন বলে শোনা যায়নি। এই স্বল্পকালীন রাজনৈতিক জীবনই তাঁর আর সব পরিচয়কে আড়াল করে দিয়েছে। তিনি যে তাঁর বাবা-ঠাকুরদার মতোই আইন পেশায় অত্যন্ত সফল একজন আইনজীবী ছিলেন, তাঁদের মতোই সাহিত্যচর্চাও করতেন, মানে কবিতা লিখতেন, তা হয়তো অনেকেই জানেন না।
 
কিশোর বয়স থেকেই চিত্তরঞ্জনের লেখালেখির শুরু। তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রাবস্থায়, বিলাতে অবস্থানকালে, এমনকি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনি যখন অত্যন্ত ব্যস্ত ও সফল আইনজীবী, কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েননি, তখনো তাঁর সাহিত্যচর্চা অব্যাহত ছিল। একপর্যায়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির খামখেয়ালি সভার সদস্য ছিলেন চিত্তরঞ্জন। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) ছাড়াও অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, প্রমথ চৌধুরী, জগদিন্দ্রনাথ রায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে তিনি সাহিত্যপাঠ ও সংগীতচর্চায় অংশ নেন। ১৯১১ সালে চিত্তরঞ্জন যখন দ্বিতীয়বার সপরিবারে বিলেত যান তখন রবীন্দ্রনাথও বিলাতে ছিলেন।  একদিন ইয়েটস ও রদেনস্টাইনকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছিলেন। সেদিন রবীন্দ্রনাথ সেখানে ‘সোনার তরী’সহ তাঁর কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে চিত্তরঞ্জন দাশও তাঁর ‘সাগর-সঙ্গীত’-এর পা-ুলিপি থেকে কয়েকটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। সাহিত্য-সমাজ নিয়ে দুজনে অনেকক্ষণ ধরে সেদিন আলোচনাও করেন।
 
চিত্তরঞ্জনের কন্যা অপর্ণার হিন্দুরীতিতে বিয়ের (১৯১৬) অনুষ্ঠান করায় ক্ষুব্ধ ব্রাহ্মণ সমাজের নেতারা সে বিয়ের অনুষ্ঠান বর্জন ও চিত্তরঞ্জনকে একঘরে করার আহ্বান জানানোর পরও ব্রাহ্মণ সমাজের যে কয়েকজন নেতা সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অপর্ণার বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। এই অপর্ণার পুত্র কংগ্রেস নেতা সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ই পরবর্তিকালে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী, পাঞ্জাবের রাজ্যপাল, পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন।
 
চিত্তরঞ্জন দাশের বয়স যখন মাত্র ১৯, তখন তাঁর কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় নব্যভারত পত্রিকার ফাল্গুন ১২৯৫ সংখ্যায়। কবিতাটির নাম ছিল ‘বন্দী’। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ মালঞ্চ প্রকাশিত হয় ১৮৯৬ সালে। চিত্তরঞ্জনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মালা প্রকাশিত হয় ১৯০২, মতান্তরে ১৯০৪ সালে। তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ সাগর সঙ্গীত প্রকাশিত হয় ১৯১১ সালে। চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ অন্তর্যামীতে (১৯১৪) এসে চিত্তরঞ্জনকে আমরা পাই আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে। বৈষ্ণব কবিদের উত্তরসূরি হিসেবে পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনের আকাক্সক্ষাই যাঁর কাব্যসাধনার মূল প্রেরণা। এই শেষ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পর চিত্তরঞ্জন কাব্যচর্চা প্রায় ছেড়ে দেন এবং রাজনীতি বা দেশের কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। রাজনীতি ছাড়া আর যে কাজ চিত্তরঞ্জনকে তাঁর স্বদেশিদের কাছে এত জনপ্রিয় করে তুলেছিল, সে তাঁর অভাবী মানুষের প্রতি অসীম দয়া। তাঁর মতো দানবীর সচরাচর চোখে পড়ে না। একপর্যায়ে তিনি তাঁর বিরাট প্রসারের ওকালতি পেশা ত্যাগ করেন (১৯২০)। পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে এতদিনের শৌখিনতা ছেড়ে সস্তা ও মোটা খদ্দরের ফতুয়া ও খাটো ধুতি পরতে শুরু করেন। তাঁর কলকাতা রসা রোডের পৈতৃক বাড়িটি, যেখানে সমাজের সব শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় হতো, হাসিঠাট্টা হতো, সেটাও তিনি লিখিতভাবে জাতির সেবায় দান করেন (পরে যেখানে মহাত্মা গান্ধীর উদ্যোগে চিত্তরঞ্জন সেবা সদন প্রতিষ্ঠিত হয়)।
 
ইতিমধ্যে চিত্তরঞ্জনের উদ্যোগে ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাংলা সাহিত্যপত্র নারায়ণ। কবি, গল্পকার কিংবা প্রাবন্ধিক চিত্তরঞ্জন দাশকে বাংলা সাহিত্য তেমন মনে না রাখলেও বাংলা সাহিত্যে চিত্তরঞ্জনের নাম বরাবর উল্লেখিত হবে প্রধানত তাঁর সম্পাদিত নারায়ণ পত্রিকা (১৯১৪) ও নারায়ণকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রবিরোধিতার জন্য। রবীন্দ্রনাথ ও চিত্তরঞ্জন পরস্পরের এত ঘনিষ্ঠ ও গুণমুগ্ধ হওয়া সত্ত্বেও চিত্তরঞ্জনের নারায়ণই হয়ে দাঁড়ায় রবীন্দ্রবিরোধিতার অন্যতম বাহন। চিত্তরঞ্জন নিজে অবশ্য রবীন্দ্রনাথের সরাসরি সমালোচনা করে বেশি কিছু লেখেননি। এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নেন রাজনৈতিক নেতা ও লেখক বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২)।
 
চিত্তরঞ্জন ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের ভক্ত। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যিক ও দার্শনিক ভাবধারার দ্বারা চিত্তরঞ্জন ও বিপিন উভয়েই গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। নারায়ণ-এর প্রকাশ শুরুর কয়েক মাস আগে প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মাসিক সবুজপত্র। আদর্শ, লক্ষ্য, ভাষার বিন্যাস, উপস্থাপনা- সব ব্যাপারেই নারায়ণ-এর অবস্থান ছিল সবুজপত্র-এর সরাসরি বিপক্ষে। ফলে নারায়ণ ও সবুজপত্র বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয়ে প্রায়ই তর্কযুদ্ধে লিপ্ত থাকত আদর্শগত অমিল অথবা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে। প্রমথ চৌধুরীর প্রস্তাবিত মুখের ভাষাকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার যে নীতি রবীন্দ্রনাথের সম্মতিতে সবুজপত্র গ্রহণ করেছিল, তার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নারায়ণ সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য এক অভিন্ন মান লেখ্য ভাষার প্রস্তাব করে। এ বিষয়ে নারায়ণ-এর বক্তব্য ছিল : ‘ভাষা এমন হওয়া চাই, যাহা সমগ্র বাঙ্গালী জাতি ব্যবহার করিতে পারে।’ এ কথার দ্বারা নারায়ণ কথ্য ভাষা নয়, কার্যত প্রচলিত লেখ্য ভাষারই একটি সহজরূপের পক্ষে মত দেয়।
 
 ভগিনী নিবেদিতার মতো চিত্তরঞ্জনও রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতার ধারণাকে মেনে নিতে পারেননি। আসলে সেই বিশেষ স্পর্শকাতর সময়টিতে যখন জাতীয়বাদের প্রবল স্রোতে দেশ ও জাতি ভেসে যাচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদের কড়া সমালোচনা খুব জনপ্রিয় বা নন্দিত হয়নি, হওয়ার কথাও ছিল না।
 
বহু দেশে ঘুরে, বহু জাতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ মনে করতে শুরু করেছিলেন, জাতীয়তাবাদের ক্ষুদ্র ও সীমিত পরিসর ও দৃষ্টিপাতই জাতিতে জাতিতে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধের মূল কারণ, যে ব্যাপারে তাঁর নিকটতম রাজনৈতিক সহচরেরাও একমত হতে পারেননি, অন্তত ভারতের সেই ঘন দুর্দিনে, পরাশক্তির হাত থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার লগ্নে।
 
শুধু জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই নয়, শিক্ষা, ধর্মচিন্তা, শিল্পনীতি ইত্যাদি আরও নানা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব সত্ত্বেও এত অল্প বয়সে হঠাৎ চিত্তরঞ্জন মারা গেলে রবীন্দ্রনাথ খুবই কাতর হয়ে পড়েছিলেন। বিনা দ্বিধায়, নিঃশর্তভাবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, লিখেছিলেন, এই উপমহাদেশে বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে মানুষের এতখানি শ্রদ্ধা ও সম্মান আর কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাগ্যে জোটেনি, যেটা পেয়েছেন চিত্তরঞ্জন দাশ।
কলকাতায় চিত্তরঞ্জনের রসা রোডের বাড়িতে শুধু রাজনৈতিক মিটিং নয়, ওখানে অনুষ্ঠিত সাহিত্য ও সংগীত আসরে খোদ রবীন্দ্রনাথসহ ঠাকুরবাড়ির অনেকেরই, যেমন সরলাদেব চৌধুরানী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী প্রমুখের আসা-যাওয়া ছিল। এই আসরে আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আরও অনেকে। মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ বসুর পাখোয়াজ সংগীতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও অমলা দাশ (চিত্তরঞ্জনের চিরকুমারী বোন ও পরবর্তীকালের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী) একত্রে গান করেন এ বাসায়। নিজের পরিবারের লোকজন ছাড়া বাইরের লোক, যিনি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে সরাসরি গান শিখে প্রকাশ্যে গাইতে আরম্ভ করেন এবং পরে রেকর্ড করেন, তিনি হলেন চিত্তরঞ্জন দাশের ভগ্নী অমলা দাশ। যদিও রেকর্ডে নাম থাকত মিস দাশ, অ্যামেচার। ১৯১১-তে রবীন্দ্রনাথের লেখা দেশাত্মবোধক সংগীত, ‘জনগণমন অধি’ প্রথম ১৯১১ সালের কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের সভায় সরলা দেবী চৌধুরানী ও অমলা দাশের যৌথ নেতৃত্বে সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পায়।
 
চিত্ররঞ্জনের আরেক বোন তরলা দাশের বিয়ে হয়েছিল বিক্রমপুরের বিখ্যাত গুপ্ত পরিবারে। কালীনারায়ণ গুপ্তের পুত্র প্যারীমোহন গুপ্তের (অতুলপ্রসাদ সেনের মামা) সঙ্গে তরলার বিয়ে হয়। এই দম্পতির কন্যা সাহানা দেবী উপমহাদেশের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে খুবই সুখ্যাতি অর্জন করেন। সাহানা দেবী রবীন্দ্রনাথের বিশেষ স্নেহের পাত্রী ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গানের স্বরলিপিও তৈরি করেছিলেন। এ ছাড়া চিত্তরঞ্জনের বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক কাকা দুর্গামোহন দাশের দুই কন্যা অবলা দাশ (পরে অবলা বসু যখন জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে বিয়ে হয়) ও সরলা দাশও রবীন্দ্রনাথের অতি স্নেহের পাত্রী ছিলেন। সরলা দাশের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ তাঁর দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী-স্থাপিত সখী-সমিতির জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশে পরিবেশিত নৃত্যনাট্য ‘মায়ার খেলা’ লিখে দিয়েছিলেন। আর বাংলার বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী অবলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সখ্যর কথা তো সর্বজনবিদিত। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় জগদীশ চন্দ্রবসু প্রায় সপ্তাহান্তেই স্ত্রী অবলাকে নিয়ে শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়িতে অথবা পদ্মার বুকে নৌকায় সাহিত্য আড্ডা দিতে চলে যেতেন। কখনো কখনো বসু দম্পতির সঙ্গে থাকতেন ভগিনী নিবেদিতা। ফলে চিত্তরঞ্জন ও দাশ পরিবারের অনেকের সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথের হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। 
 
রবীন্দ্রনাথ চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি দুটি : ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’ আর নজরুল তাঁর মৃত্যুকে তুলনা করেছিলেন ইন্দ্রপতনের সঙ্গে। লিখেছিলেন : ‘পয়গাম্বর ও অবতার-যুগে জন্মিনি মোরা কেহ,/ দেখিনি ক  মোরা তাদের, দেখিনি দেবের জ্যোতির্দেহ।/ কিন্তু যখনি বসিতে পেয়েছি  তোমার চরণ-তলে,/ না জানিতে কিছু না বুঝিতে কিছু নয়ন ভরেছে জলে।/ ...বুদ্ধের ত্যাগ শুনেছি মহান, দেখিনি ক চোখে তাহে/ নাহি আফসোস, দেখেছি আমরা ত্যাগের শাহানশাহে।...’ ইত্যাদি।
 
এখানে উল্লেখ্য, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকেই সম্মান করতেন না, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনও তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবীকেও খুব শ্রদ্ধা করতেন। বাসন্তী দেবীকে নজরুল মা বলে সম্বোধন করতেন। নজরুলের চিত্তনামা কাব্যগ্রন্থ (১৩৩২), যার সবগুলো কবিতাই সদ্যপ্রয়াত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনকে নিয়ে লেখা, বাসন্তী দেবীর নামে উৎসর্গ করেন নজরুল। উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলেন, মাতা বাসন্তী দেবীর শ্রী শ্রীচরনাবিন্দেণ্ড। বাসন্তী দেবীও এই পাগলাটে প্রতিভাময়তরুণ কবিটিকে খুব স্নেহ করতেন। নজরুলকে তিনি আদর করে নিজের হাতে শিশুর মতো করে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন বলে শোনা যায়। বিক্রমপুরের বরদানাথ হালদারের কন্যা বাসন্তী দেবী কেবল একজন বিখ্যাত কংগ্রেস নেত্রী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী ও বিদ্রোহী কবির মাতৃসমাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জগৎখ্যাত চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়ের শাশুড়ির (বিজয়া রায়ের মা মাধুরীর) আপন বোন।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close