বৃহস্পতিবার,  ২৩ নভেম্বর ২০১৭  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৬, ২২:০০:০৪

আকরাম খানের ‘ঘাসফুল’: মন্থর সময়ের মানবিক টানাপোড়েন

বেলায়াত হোসেন মামুন
বিস্মিত উৎসুক জিজ্ঞাসাপূর্ণ চাহনি। ওপরের দিকে। সবুজ ঘাসের ওপরে দাঁড়ানো যুবক। টপশট। কে দেখে কাকে? ফোরগ্রাউন্ডে রেললাইন, পাশে দাঁড়ানো দুই তরুণ প্রথম ফ্রেমেই তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড করে দিয়ে ছুটে আসে ট্রেন ফোরগ্রাউন্ডে; ফোকাস সাবলীলভাবে শিফট হয় দুই তরুণ থেকে ট্রেনের চাকার শব্দদৃশ্যে! ছবিজুড়ে এই দৃশ্যান্তরের গল্প এগিয়ে যায় চিরাচরিত গল্পবয়ানের পথ অনুসরণ না করে। চিত্রনাট্য আপাত সরলতার আবহে বলে যায় টানাপোড়েনের নিখুঁত মানবিক গল্প।
 
যেকোনো মফস্বল শহরের জীবনই বেশ ঢিলেঢালা, শান্ত, নীরব। মফস্বল শহরের পথে মুরব্বিদের দেখলে আদব রক্ষা করে স্থানীয় তরুণ-তরুণী, প্রতিবেশীর আনন্দে প্রতিবেশীর বাড়িতে মিষ্টি পাঠানো আর কারও বাড়িতে ভালো রান্না হলে পাশের বাড়িতে একটু দেওয়ার প্রচলন বেশ আন্তরিক ও ঘরোয়া। মফস্বল শহর মানে নিরিবিলি পথঘাট, পুকুরপাড় অথবা দুপুরের নির্জন আলস্য। যেখানে নিশ্চিন্তে গল্প এগিয়ে যায় তরুণের মুগ্ধ ভালোবাসার; ভোরের শিউলি কুড়ানোর অবসর আর কুয়াশার গভীর থেকে বেড়িয়ে আসা হাজার বছর ধরের ‘মন্তু’ আর ‘টুনি’র সহজাত প্রণয়ের উচ্ছ্বাস। চিত্রগ্রাহক সৈয়দ কাশেফ শাহবাজির ক্যামেরায় মিলেমিশে একাকার হয় প্রণয়, সময় আর যশোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের কুয়াশামাখা লংশট। সাইকেল আরোহী ‘তৌকির’ আর ‘নার্গিস’কে চেনা যায় সানি জুবায়েরের সংগীত পরিচালনায় প্রিয়াঙ্কা গোপের কোমল স্বরের মধুরতায়।
 
চলচ্চিত্র মূলত গল্পবলা মাধ্যম হলেও এই মাধ্যমে সবাই গল্প বলে সফলতা দেখাতে পারেন না। আকরাম খান তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ঘাসফুল-এ সহজ গল্প বলেননি। স্মৃতিহারা তরুণ তৌকির কেন ‘স্মৃতিহারা’, তা তিনি প্রতিষ্ঠিত করেননি। চিকিৎসকের উপস্থিতিতে তৌকিরের মা নাজনীন হায়দার কিছু একটা ‘রোগের’ কথা উল্লেখ করলেও তা আবছায়াই থেকে যায়। কেন? যেন নির্মাতা রোগকে নয় রোগীকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান! স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এই তৌকিরের পরিচয় কী? কেন সে তার বর্তমান ‘অস্তিত্ব’কে অস্বীকার করতে চাইছে, কী খোঁজে সে? ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘোরগ্রস্তের মতো সে খুঁজে বেড়ায় পুরোনো বন্ধুকে...অচেনা গলিতে, অচেনা বাড়িতে সে ঠকঠকায়, ‘নাফিস...নাফিস’ বলে! সে কি ‘নাফিস’কে খোঁজে নাকি ‘নার্গিস’কে? চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে লক্ষ করি এই রকমই একটি গলিতে ‘নার্গিস’কে এগিয়ে দিতে এসে বাড়ি পর্যন্ত আসা হয় না তৌকিরের, তবে কি পেছনের জন্মে পৌঁছাতে না পারা পথ পাড়ি দিতে চায় তৌকির? ফলে আপাত তার এই অসুস্থতাকে তার ‘অস্বীকার’ বলে মনে হয়। সে যেন তার আগের পরিচয়ে বা রূপে ফিরতে চায়। সে যেন পুত্র তৌকির নয়, পিতা তৌকিরে ফেরার লড়াই করছে বলে মনে হয়।
 
ঘাসফুল-এ নির্মাতা আকরাম খান একটি চিঠির মাধ্যমে গল্পের সূত্রমুখ উন্মুক্ত করেন। কিন্তু এই চিঠি কী করে তৌকিরের প্যান্টের পকেটে এল, তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেননা পরেও এর কোনো ডিটেইল চোখে পড়েনি। আমরা দেখি নার্গিস তাঁর প্র্যাগনেন্সির কথা তৌকিরের সঙ্গে সামনাসামনি আলাপ করেছে। যখন তৌকির বলে, ‘তোমাকে এই অবস্থায় রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না।’ ছবির খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ‘চিঠি’ যা গল্পকে সামনে এগোতে পথ করে দিয়েছে, তা পকেটে আসার পথ অজানাই থেকে গেল!
 
ঘাসফুল শুধু দুজন তরুণ-তরুণীর প্রেমের ছবি নয়। একই সঙ্গে এই ছবি দুজন মায়েরও ছবি। দুজনই তৌকিরের মা! দুজনই তৌকিরকে বাঁচাতে সংগ্রাম করেন। এখানে তৌকির সন্তান, পিতা ও প্রেমিকরূপে উপস্থিত। তৌকির একজন সন্তান হিসেবে মায়ের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে তার নাতিরূপে; আর আরেকজন নারীর কাছ থেকে প্রেমিক হিসেবে হারিয়ে গিয়ে ফিরে আসে সন্তানরূপে। এই ফিরে আসার সূত্রধর হন একজন বাউল সাধুগুরু। যিনি মায়ের দুপুর নিদ্রার স্বপ্নে আসেন মায়ের শোক লাঘব করে সুসংবাদ রূপে। শোকাহত মায়ের ইচ্ছাপূরণ কর্তারূপে বাউল সাধুর আবির্ভাবকে যুক্ত করার অভিপ্রায় নির্মাতার চিন্তার দূরাগত দৃষ্টির সামর্থ্যকে স্পষ্ট করে। গল্পের স্থানিকতার গুরুত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়; যেকোনো চরিত্র গল্পে হাজির হয় তার শারীরিক কাঠামোর পাশাপাশি চিন্তা ও চর্চার অন্তর-বাহিরসহ। ফলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকর্মগুলোতে আমরা দেখি চরিত্র তার বাহ্যিক অবয়বের সঙ্গে মানসিক কাঠামোসহ হাজির হন। আর এই সম্মিলনের ভেতর দিয়ে শুধু একটি গল্প নয় গল্পের চরিত্র মানুষের সামগ্রিক অবয়বে উপস্থিত হয়। ফলে কুষ্টিয়া অঞ্চলের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানহারা মা যখন পুত্রশোকে কাতর হন তখন উদ্ধারকর্তারূপে একজন বাউল সাধুগুরুকেই স্বপ্নে দেখেন।
 
চলচ্চিত্র ঘাসফুল অনেকগুলো ছোট ছোট ঘটনার সুগ্রন্থিত দৃশ্যকাব্য। মন্থরলয়ের এই দৃশ্যকাব্যের চিত্রনাট্য ঠাসবুনোটে গাঁথা। চলচ্চিত্র সম্পাদক সামির আহমেদ এই ঘটনাগুলোর বিভিন্ন পর্বকে গেঁেথছেন চমৎকার সুচিকর্মে; দৃশ্যের পাশাপাশি শব্দ-ধারণের যতœ টের পাওয়া যায় নাহিদ মাসুদের নিবিড় শ্রমে। যখন শ্রুতি ও দৃশ্য একটি অন্যটিকে সহযোগিতা করে, তখন নির্মাতার গল্প বলার কাজটি সহজ হয় আর দর্শকের জন্য তা হয় স¦াদু। তবে এখানেও বেশ কিছু কিন্তু থাকে। পরিমিতিবোধ প্রতিমুহূর্তে পরীক্ষার পথে এগোয়। ঘাসফুল-এ কোথাও কোথাও পরিমিতিবোধ রক্ষা করা যায়নি। যেমন বর্ষণমুখর দিনে নার্গিস ও তৌকিরের মিলনের সিকোয়েন্সটির সুন্দর পরিণতি হয়নি। সিকোয়েন্সটির শেষ দৃশ্যে চারটি পাইপে জল ঝরার দৃশ্যের সঙ্গে তৌকিরের স্মৃতিচারণা ‘ভেসে যাওয়ার’ উল্লেখ পুরো সিকোয়েন্সটির মধুর মুহূর্তটিকে প্রায় পীড়নে রূপান্তরিত করে। অভিনয়ে দক্ষতার প্রশ্নে মা নায়লা আজাদ নূপুর কিংবা বাবা মানস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৌকির চরিত্রে কাজী আসিফ রহমান সবক্ষেত্রে চরিত্রানুগ সাফল্য দেখাতে পারেনি। নায়লা আজাদ নূপুর ও মানস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ে মঞ্চের আচ্ছন্নতা তাদের স্বামী-স্ত্রী চরিত্রের কেমিস্ট্রিতে বাধা হিসেবে কাজ করেছে। আর তৌকিরের চরিত্রে কাজী আসিফ রহমান কোনো কোনো সময় ঠিকঠাক সংলাপ উচ্চারণেও ব্যর্থ হয়েছেন। তবে ঘাসফুল-এর সব অভিনয়শিল্পীর যতœ ও শ্রম দৃষ্টি এড়ায়নি। মায়ের ভূমিকায় নায়লা আজাদ নূপুরের ‘ঘাসফুলের বা নার্গিসের’ চিঠি পড়ার দৃশ্যটিতে তার অভিনয় অনবদ্য হয়েছে। চিঠি পড়তে পড়তে তার মুখের রং ও মুড বদলে যাওয়া দৃশ্যটি বহুদিন মনে থাকবে। অন্যদিকে এই চলচ্চিত্রে চরিত্রানুগ সাবলীল অভিনয়ের জন্য নার্গিস বা শায়লা সাবিকে অভিনন্দন জানানোই যায়। তার অভিনয় চোখে লেগেছে মনেও লেগেছে। চলচ্চিত্রে হয়ত আরও একজন ভালো অভিনয়শিল্পীর পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। তানিয়া বিষ্টিকে পাশের বাড়ির মিষ্টি মেয়ের ভূমিকায় যথাযথ কাস্টিং মনে হয়েছে। তার উপস্থিতি সহজ ও সুন্দর হয়েছে।
 
আকরাম খান অনেক যত্নে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এই যত্ন আমরা সচরাচর কোনো নতুন নির্মাতার কাছে পেতে অভ্যস্থ নই। তাঁর যতেœর ছাপ রয়েছে পুরো চলচ্চিত্রে। ঘাসফুল-এর ডিটেইলের কাজ সুন্দর। সত্তরের দশক আর নব্বইয়ের দশককে তিনি টেলিভিশনের রঙিন ও সাদাকালো খবর ও রুনা লায়লার গানের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে, অভিনয়শিল্পীদের চরিত্রানুগ মেকআপ ও পোশাক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বাবা মানস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা নায়লা আজাদ নূপুরের বয়সের পরিবর্তনের গ্রাফ পোশাকে, অভিনয়ে ও চরিত্রের শারীরিক গতির কমবেশির মধ্য দিয়ে প্রায় নিখুঁত করে তুলেছেন। এই চলচ্চিত্রের দৃশ্যরূপে তিনি অনেক চলচ্চিত্রিক মুহূর্ত তৈরি করেছেন। যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রূপকের কাজ করেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরিত্রের মুহূর্তের মুডকে দৃশ্যান্তরে নিয়ে গেছে। ফলে দর্শকের ভাবনাকে তা উসকে দেয়। ঘাসফুল খুব অনায়াস আস্বাদনের চলচ্চিত্র নয়; এর স্বাদ আহরণের জন্য দর্শককে ‘একটু’ যত্নের সঙ্গে চলচ্চিত্রটি দেখতে হবে। আর এই ‘একটু’ যত্ন নিয়ে দেখার চলচ্চিত্র আমাদের দেশে বিরল। অভিনন্দন আকরাম খান।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close