বুধবার,  ১৭ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২০ মে ২০১৬, ২২:২৫:৩০

নার্গিসকে লেখা নজরুলের চিঠি

ড. তাহা ইয়াসিন
নজরুল দৌলতপুরে জ্যৈষ্ঠ মাসে লিখেছিলেন, ‘সে যেন কোন দূরের মেয়ে আমার কবির মানস বধূ/ বুক-পোরা আর মুখ-ভরা তার পিছলে পড়ে ব্যথার মধু!/ নিশীথ-রাতের স্বপন হেন/ পেয়েও তারে পাইনি যেন,/ মিলন মোদের স্বপন-কূলে কাঁদন-ভরা চুমায় চুমায়।/ নাম-হারা সেই আমার প্রিয়া, তারেই চেয়ে জনম খোয়ায়।’ কবিতাটি তাঁর ছায়ানট কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তরুণ বয়সে  কবিত্বের ব্যর্থ কল্পলোকে হারানো কোনো প্রিয়তমার উদ্দেশে রচনা করেছেন এমন অনেক কবিতা। মানবী প্রেম কল্পনার আঁধারঘেরা রহস্যলোকে চিরদিন খুঁজে ফিরেছে কখনো চক্রবাক-চক্রবাকীর মাঝে, কখনো গুবাকতরুর সারিতে কখনো বা সিন্ধুর উত্তাল ঢেউয়ে।
নার্গিসের চিঠিটি পাওয়া যায়নি, কিন্তু নজরুল নার্গিসকে ১ জুলাই ১৯৩৭ সালে যে চিঠি লিখেছিলেন, সেটিতে নার্গিসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ধরা পড়েছে। এই চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিল নার্গিসের দ্বিতীয় স্বামী আজিজুল হাকিমের কাছ থেকে ১৯৫৩ সালে। এটি শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত নজরুলের পত্রাবলীতে পরবর্তীকালে সংকলিত হয়। নার্গিস-নজরুল সম্পর্কের এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। নজরুল লিখেছেন,
 
‘কল্যাণীয়াসু!
তোমার পত্র পেয়েছি- সেদিন নববর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে মেঘ-মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাড়ে এমনি বারিধারা প্লাবন নেমেছিলÑ তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এ মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে, মালবিকার দেশে, তাঁর প্রিয়ার কাছে। এ মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চয়। এ আষাঢ় আমার কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে। যাক্, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দিই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাকো, তাহলে আমায় ভুল বুঝবে, আর তা মিথ্যা।
তোমার উপর আমি কোন ‘জিঘাংসা’ পোষণ করি না-এ আমি সব অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি তা দিয়ে তোমায় কোনদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এ আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি অগ্নিবীণা বাজাতে পারতাম না- আমি ‘ধূমকেতু’র বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণ-রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত- মন্দিরের মত চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের আগুন বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।
তুমি ভুলে যেও না, আমি কবি- আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর, কুৎসিত সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়। আমার অন্তর্যামী জানেন (তুমি কি জান বা শুনেছ, জানি না) তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবীও নেই।
আমি কখনো কোনো ‘দূত’ প্রেরণ করিনি তোমার কাছে। আমাদের মাঝে যে অসীম ব্যবধানের সৃষ্টি হয়েছে, তাঁর ‘সেতু’ কোন লোক তো নয়ই- স্বয়ং বিধাতাও হতে পারেন কিনা সন্দেহ। আমায় বিশ্বাস করো, আমি সেই ‘ক্ষুদ্র’দের কথা বিশ্বাস করিনি। করলে পত্রোত্তর দিতাম না। তোমার ওপর আমার কোন অশ্রদ্ধাও নেই, কোন অধিকারও নেইÑ আবার বলছি। আমি যদিও গ্রামোফোনের ট্রেড মার্ক ‘কুকুরে’র সেবা করছি, তবুও কোন কুকুর লেলিয়ে দিই নাই। তোমাদের ঢাকার কুকুর একবার আমায় কামড়েছিল আমার অসাবধানতায়, কিন্তু শক্তি থাকতেও আমি তাঁর প্রতিশোধ গ্রহণ করিনি- তাদের প্রতিআঘাত করিনি। সেই কুকুরের ভয়ে ঢাকায় যেতে আমার সাহসের অভাবের উল্লেখ করেছ, এতে হাসি পেল। তুমি জান, ছেলেরা (যুবকেরা) আমায় কত ভালবাসে। আমারই অনুরোধে আমার ভক্তরা ক্ষমা করেছিল। নৈলে তাদের চিহ্নও থাকত না এ পৃথিবীতে। তুমি আমায় জানবার যথেষ্ট সুযোগ পাওনি, তাই এ কথা লিখেছ...। যাক তুমি রূপবতী, বিত্তশালিনী, গুণবতী, কাজেই তোমার উমেদার অনেক জুটবে- তুমি যদি স্বেচ্ছায় স্বয়ম্বরা হও, আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। আমি কোন অধিকারে তোমায় বারণ করব- বা আদেশ দেব? নিষ্ঠুর নিয়তি সমস্ত অধিকার থেকে আমায় মুক্তি দিয়েছেন।
তোমায় আজকার রূপ কি, জানি না। আমি জানি তোমার সেই কিশোরী মূর্তিকে, যাকে দেবীমূর্তির মতো আমার হৃদয়-বেদীতে অনন্ত প্রেম অনন্ত শ্রদ্ধার সাথে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলে না। পাষাণ-দেবীর মতই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদী-পাঠ।... জীবন ভরে সেইখানেই চলেছে আমার পূজা-আরতি। আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ, তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়ত সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব, অধিকতর বেদনা পাব, তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি।
দেখা? না-ই হল এ ধূলির ধরায়! প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস, আমাকে চাও, ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লাইলী মজনুকে পায়নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমকে পায়নি। আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতিপুরাতন কথা হলেও পরম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর, আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। প্রেমের সোনার-কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাক তাহলে তোমার মত ভাগ্যবতী কে আছে? তারি মায়া স্পর্শে তোমার সব কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে। দুঃখ নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয় না। মানুষ ইচ্ছে করলে সাধনা দিয়ে তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল-রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোন ভুল করে থাক জীবনে, এ জীবনেই তার সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ, মুক্তি; তবেই হবে সর্ব দুঃখের অবসান। নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা কর। স্বয়ং বিধাতা তোমার সহায় হবেন। আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এ সংসারের বাধাকে অতিক্রম করে ঊর্ধ্বলোকেÑ সেখানে গেলে পৃথিবীর সব অসম্পূর্ণতা সব অপরাধ ক্ষমাসুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা দেয়। হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনের বছর আগেরকার কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্র ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল। তোমার সেই তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজও অনুভব করতে পারি। তুমি কি চেয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিল জল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রীবিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের করুণ মিনতি। মনে হয় যেন কালকার কথা। মহাকাল সে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলো না। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল! সারা দিনরাত আমার চোখে ঘুম ছিল না।
যাকÑ আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষরশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে। তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এ আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। সেখানেই থাকি বিশ্বাস করো, আমার অক্ষয় আশীর্বাদী কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাও- এ প্রার্থনা। আমাকে যত মন্দ বলে বিশ্বাস কর, আমি তত মন্দ নইÑ এ আমার শেষ কৈফিয়ৎ।
 
ইতি-
নিত্য শুভার্থী-
নজরুল ইসলাম
 
আমার ‘চক্রবাক’ নামক কবিতা-পুস্তকের কবিতাগুলো পড়েছ? তোমার বহু অভিযোগের উত্তর পাবে তাতে। তোমার কোনো পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কটূক্তি ছিল। ইতি, Gentleman.
 
চিঠিটি নজরুল লিখেছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল রুমে। এ দীর্ঘ  চিঠিতে নজরুল-নার্গিসের সম্পর্কের কিছু অজানা পরিচয় উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ত্রিশোর্ধ্ব নার্গিস বিবাহিত নজরুলকে পাওয়ার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করে যে চিঠি নজরুলকে লিখেছিলেন, এটি ছিল তার উত্তর। এতে নার্গিসের চিঠিতে যা লেখা ছিল, তার উত্তর নজরুল যেভাবে লিখেছেন, তাতে আমরা অনুমান করতে পারি, নার্গিস কী লিখেছিলেন।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close