মঙ্গলবার,  ১৬ অক্টোবর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৬, ২১:৫০:১৭

ভুল বোঝাবুঝি

মিজানুর রহমান নাসিম
ঝরুর মুখে হাসিটা সহসা ফুটতে চায় না। কালেভদ্রে শুধু খানিকটা ঝিলিক দেখা যায়। ফুটতে না ফুটতেই তৎক্ষণাৎ ফের হাওয়া। এমন বিষমুখ নিয়ে ওর স্বামী টু-া আইনালের কোনো অভিযোগ নেই। প্রথম বউয়ের ঘর ছেড়ে যেদিন আসবে খাবারটা আর রাতে ওকে নিয়ে শুতে পারলেই হলো। কপালের ফের ঝরুর নিজের। চৌদ্দটি বছরে বীমার কিস্তি চালিয়ে যাচ্ছিল দাসীগিরি করা সামান্য টাকা থেকে। বলতে গেলে জানটা ফানা ফানা করে। বেজন্মা ছেলেটার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পলিসি খুলেছিল। হোক বেজন্মা পেটে তো ধরেছে সে নিজে। দায় তারই। তবে টাকা জমানোর কথা কাউকেই বলেনি। দেখতে দেখতে দশ বছর হয়ে গেল। আজ ইনস্যুরেন্স অফিস থেকে লোকটি এল লাভ দেওয়ার জন্য। এমন সুখকর ঘটনা তার জীবনে, পরিবারে বা বংশেই প্রথম। অথচ কে জানত তার স্বামী শুভক্ষণে উড়ে এসে জুড়ে বসবে।
আজ টু-া কাঁটায় কাঁটায় এসে হাজির। আতঙ্কে ঝরুর মুখ শুকিয়ে গেল। টাকার লেনদেন হবে সে জানল কেমন করে? শেষ পর্যন্ত সব বরবাদ। যদি জানলই, আগে জানলেই ভালো হতো। তাহলে আর তাকে এতদিন জানটা কোরবানি করতে হতো না। একটা-দুইটা দিন না, দশ-দশটি বছর। ঝরুর নারকেলে কপালের বাম পাশের রগটা ব্যথায় চিনচিন করে ফুলে উঠল। 
এখন সামনাসামনি আড়াল করা একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু শেষরক্ষার উপায় তো একটা বের করতেই হবে। ঝরু আকারে-ইশারায় অফিসের লোকটিকে বাগে আনতে প্রাণপাত করল। চাইল অফিসের লোকটি একথা-সেকথা বলে উঠে যাক। পরে মোবাইলে যোগাযোগ করা যাবে। অফিসের লোকটি ও টুণ্ডা আয়নাল বসেছিল সামনাসামনি টুলে। দুই হাত দূর থেকে স্বামীর চোখটা আড়াল করতে ঝরু তার মাথার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। এরপর অফিসের লোকটির দিকে কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইশারায় ভ্রু কুঁচকে মৃদু হাসল। ঠোঁট বাঁকাল। এমনকি নিজের ঠোঁটে নিজেই একটা ছোট্ট কামড় বসিয়ে দিল। যাতে ওর দিকে লোকটির নজর পড়ে।
এমন কসরৎ পথের ধারে আবছা অন্ধকারে প্রতি সন্ধ্যায় দেখা মেলে। তাই অফিসের লোকটি মনে করল বেহায়া মেয়েলোকটা তাকে ভজাচ্ছে। মনে মনে পণ করল মাতারিটার দিকে তাকাবেই না। সে জানে, শুধু একবার ফাঁদে পড়া। ব্যস। নানা ছল-ছুতোয় পেঁয়াজের খোসা ছড়ানোর মতো করে তার গাঁট খালি করে দেবে। তাই ঝরু যতই কাকুতি-মিনতি করে বোঝাতে যায়, লোকটি ততই নিজেকে ঋজু করে তোলে। লোকটি বোঝে, লোভী পুরুষ মনটাকে লাগাম পরিয়ে রাখতে হয়। তাই এখন সে ঝরুর দিকে তাকাচ্ছেই না বা তাকাতে সাহস পাচ্ছে না।
ঝরু মাথা কুটতে লাগল। হতাশায় তার বুকের ভেতরটা ফালি ফালি হয়ে যাচ্ছিল। সে জানে, অফিসের লোকটি চলে যাওয়া মাত্রই বজ্জাত টুণ্ডা তার মাথা খাবে। যতক্ষণ না টাকাটা থেকে কিছু গলাতে পারবে, ততক্ষণ তার জান পয়মাল করে দেবে। দৃশ্যটি কল্পনা করে ঝরুর ইচ্ছা হলো ক্ষোভে নিজের মাথার চুল নিজ হাতে টেনে ছেঁড়ার। তবু সে হাল ছাড়ল না। জান থাকতে টাকাটা সে কোনোভাবেই দরিয়ায় ফেলতে দেবে না। বোঝাতে তাকে হবেই। লোকটি যদি শেষমেশ আরজিটি বুঝতে পেরে মুখে কুলুপ আঁটে তবেই রক্ষা।
দশ পা আরও পেছনে সরে গিয়ে ঝরু ঘরের চৌকাঠে পা রেখে উঁচু হয়ে দাঁড়াল। কোমল হেসে লোকটিকে আলতো হাত ইশারা করল। অফিসের লোকটি ভাবল এ কেমন বেহায়া মাতারি। স্বামী-সংসার সবই আছে। তারপরও কি শুধু টাকার জন্যই নিজেকে এমন উদোম করে দিতে হবে। স্বামী যেখানে সাক্ষাৎ বসে আছে, তখন সে এমন ছিনালি করে কী করে! আবার পরক্ষণেই ভাবল, হয়তো বা স্বামী নামধারী এই বজ্জাতই নিজের বউকে তার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। তাই সে আরও সতর্ক হলো। মেয়েলোকটাকে পাত্তাই দিল না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝরুর উসখুস বেড়ে যাচ্ছিল। এক্ষণি বুঝি পাষাণ লোকটা সব কথা গরগর করে উগলিয়ে দিবে। কিন্তু লোকটি তো জানে না সোয়ামি নামক এই হারামখোরটি তাকে বিয়ে করেছে স্রেফ তার কামাইয়ে ভাগ বসানোর জন্য। দুই ভাতারের ঘর ছেড়ে এসে তার তো কোনো উপায় ছিল না। তাই সতীনের ঘর জেনেও তৃতীয় ভাতার বানাতে প্রেম করেছে সাইকেল মেকার টুণ্ডা আয়নালের সঙ্গে। কী প্রেম! প্রথম দিনেই বিছানায় শোয়াশুয়ি! ওসব কথা মনে হতেই ঝরু নিজের বুকে খানিকটা থুতু ছিটিয়ে নিল। কিন্তু তা যেমন তেমন, আজ এভাবে হাঁড়ি না ফাটালে অফিসের লোকটার কি এমন ক্ষতি হতো। ধনী মানুষের বেলায় টুঁ শব্দ নেই, শুধু গরিবের দুই পয়সাতেই এত ঢোল। নাকি জমা টাকা ভাঙানোর জন্য এটা অফিসেরই চালাকি?
   শেষমেশ অফিসের লোকটি অনিচ্ছাবশত ঝরুকে ডাকল সই দিয়ে টাকাটা বুঝে নেওয়ার জন্য। ঝরু এক ঝটকায় উড়ে এসে কাঁপা হাতে সই করে ঢোক গিলল। ‘গুইনে নেন ভাই’ বলে লোকটি টুণ্ডা আয়নালের দিকে বান্ডিলটি ধরতেই ঝরু অজ্ঞান হবার জোগাড়। কিন্তু আয়নাল হাত বাড়াল না। সে বউয়ের দিকে তাকাল, ‘তোর টাহা। তুই নিজের হাতে গুনেক।’ ঝরু ছোঁ মেরে বান্ডিলটি নিয়ে থুতু ছিটিয়ে গুনতে লাগল।
গুনতে গুনতে ঝরু সত্যিই হাঁপসে গেল। কিন্তু তবুও খুশিতে সে টগবগÑপাঁচ শ টাকার পিঙল রঙের কতগুলো নোট! তার দশ বছরের কষ্টের পুরস্কার। আয়নালও বউয়ের দিকে তাকিয়ে পুলকিত হলো। নীরবতা ভেঙে অফিসের লোকটিকে সে মোলায়েম স্বরে বলল, ‘ছার, চিন্তে করবার পাবান নন, কত কষ্ট করি অই টাকা জমাছে।’ গোনা শেষ হতে কোনো দিকে না তাকিয়ে ঝরু হন্তদন্ত করে ঘরের ভেতরে ছুট দিল।
   ভেবেছিল রাগ হবে কিন্তু ভুল। রাতে আয়নাল মাথা আছড়ে বউয়ের কাছে স্বীকার করল, ‘দুই-এক পায়সে তর হাতোত তুলি দিলে তুই আরও জমবার পারলু হয়। আসলেই মুই একখান বাউদে বটে। আইজ অসিয়ে মোর একখান লাভ হছে কি জানিস?
   ‘কী?’ আগ্রহভরে ঝরু জানতে চাইল।
   ‘টাহা জমানির চিন্তে।’ স্বামীর কথায় ঝরু অবাক। সবকিছুতেই স্বামী সম্পর্কে ভুল ভাবনার জন্য তার খারাপ লাগল। ‘ভালমুন্দ মিলিই মানুশ’- ঝরু অনুতপ্ত হলো। সাইনবোর্ড হলেও তো সোয়ামি। বোহেমিয়ান হোক কিন্তু ওর মনটা ছোট নয়। অন্য কেউ হলে টাকাটা রাতেই হাত করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির করত। না দিলে হাড়গোড় পিষে দিত। কিন্তু লোকটা টাকা ছুঁলই না। বরং নিজের ভুলটাই স্বীকার করল। ঝরুর মনটা স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় গলে গেল। মিছিমিছি অফিসের লোকটির সামনে যে নাটক শুরু করেছিল, তা মনে হতে ভীষণ লজ্জা পেল। বিছানায় আয়নালের কাছে আজ নিজেকে সে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিল।
যে মানুষ কোনো দিন মুখে আনেনি, সেও টাকা জমানোর কথা বলল। ছোট্ট একটা ঘটনা মানুষের মনটাকে কেমন করে বদলে ফেলে-ভেবে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো ঝরু। সকালে উঠানে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে সে একটা লম্বা সুখের শ্বাস ছাড়ল।  ঝরুর বুকটা ধক করে উঠল। সে এক দৌড়ে ঘরে ঢুকল। পুরো বিছানাটি তছনছ করল। কোথাও তার বান্ডিলটা নেই। অনেক ডাকাডাকি-খোঁজাখুঁজি করেও টুণ্ডা আয়নালের কোনো পাত্তা পাওয়া গেল না।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close