মঙ্গলবার,  ১৬ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৬, ১৪:৫৩:০৪

নজরুল ও নার্গিস

ড. তাহা ইয়াসিন
‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে
ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে’
নজরুল একটি গানে লিখেছেন উপরের কথাগুলো। বিরুদ্ধ পরিবেশকে জয় করে সব সময় এগোতে হয়েছে তাঁকে। ফেলে দেওয়া, পায়ে পেষা ফুল তুলে নিয়ে হৃদয়ের কথা জানাতে হয়েছে অঝর নয়নে। না ফুটতে যে ফুল ঝরে যায়, তার জন্য হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হওয়াই বোধ হয় নিয়ম। প্রেমপ্রত্যাশী কবিকে প্রেমের ছলনায় দিগ্্ভ্রান্ত পথিকের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে।
নজরুলজীবনে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা আলী আকবর খানের মাধ্যমে। আলী আকবর খানের বাড়ি দৌলতপুর যেতে রাজি হওয়াটাই ছিল নজরুলজীবনের এক বড় অধ্যায়ের সূচনা। আলী আকবর খানের পরিবারের কর্ত্রী ছিলেন তাঁর বিধবা বড় বোন। তাঁর অপর আরেক বোনের বিয়ে হয়েছিল ওই গ্রামের নিকটেই মুন্সী আবদুল খালেকের সঙ্গে, এই বোনটিও তখন বিধবা। মৃত আবদুল খালেকের ছেলে জাহাজে চাকরি করতেন, আর মেয়ে সৈয়দা খাতুন মায়ের সঙ্গেই থাকতেন। নজরুল আলী আকবর খানের বাড়িতে এলে আবদুল খালেকের স্ত্রী ও সৈয়দা খাতুন এ বাড়িতে যাতায়াত করেন। এর মধ্যে সৈয়দা খাতুনের সঙ্গে নজরুলের বিয়ের উদ্যোগ নেন আলী আকবর। নজরুলের বিয়ের জন্য কুমিল্লা থেকে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছিলেন আলী আকবর। এঁরা ছাড়াও বিয়ের আসরে যোগ দিয়েছিলেন বাঙ্গোরার জমিদার রায়বাহাদুর রূপেন্দ্রলোচন মজুমদার এবং বাঙ্গোরা হাই স্কুলের হেডমাস্টার অবনীমোহন মজুমদার। এত আয়োজনের পরও নজরুলের বিয়ে সম্পন্ন হয়নি। মুজফফর আহমদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে যে সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস বেগমের বিয়ে (আক্দ) হয়নি, এ সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত হয়েছি। ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসা হতে যে কজন নিমন্ত্রিত দৌলতপুরে গিয়েছিলেন, তাঁদের ভেতরে সন্তোষকুমার সেন নামক পনের ষোল বছর বয়ষ্ক এক কিশোর ছিল।...সন্তোষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ...তার দেওয়া তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, আলী আকবর খানও বিয়ে ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর মুসাবিদা করা কাবিননামায় শর্ত ছিল এই যে কাজী নজরুল ইসলাম দৌলতপুর গ্রামে এসে নার্গিস বেগমের সঙ্গে বাস করতে পারবে, কিন্তু নার্গিস বেগমকে অন্য কোথাও সে নিয়ে যেতে পারবে না। এই শর্ত হয়তো নজরুল ইসলামের গৌরবে বেধেছিল। তাই বিয়ে না করেই বিয়ের মজলিস হতে উঠে রাতেই কুমিল্লা (কান্দিরপাড়) চলে যায়।’ কাবিননামায় ‘ঘরজামাই’ করার শর্ত থাকায় নজরুলের আত্মমর্যাদায় লাগে এবং বিয়ের আসর থেকে উঠে চলে যান। নজরুল দৌলতপুর থেকে কুমিল্লায় গিয়ে বিরজাসুন্দরী দেবীর আশ্রয়ে ছিলেন। সেখান থেকে মুজফফর আহমদকে কলকাতায় পোস্টকার্ডে লেখা একটি চিঠিতে জানান, আলী আকবর খানের দ্বারা তিনি অপমানিত হয়েছেন, তিনি খুবই অসুস্থ, তাঁকে যেন কিছু টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নজরুলের বন্ধুরা সব জেনে খুবই দুঃখিত হন এবং মুজফফর আহমদকে অনুরোধ করেন কুমিল্লা গিয়ে নজরুলকে নিয়ে আসতে। মুজফফর আহমদ সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ফকিরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ত্রিশটি টাকা ধার করে ১৯২১ সালের ৬ জুলাই কুমিল্লায় পৌঁছেন। মুজফফর আহমদকে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পরিবার সম্মানের সঙ্গে আপ্যায়ন করেন। এই পরিবারে তিন বছর পর আশালতা ওরফে প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
নজরুল কলকাতায় ফিরে এসে প্রথমে আফজালুল হকের সঙ্গে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র কার্যালয় ৩২, স্ট্রিটে কয়েক দিন অবস্থানের পর মুজফফর আহমদের সঙ্গে ৩/৪সি তালতলা লেনের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। নজরুল কলকাতা ফেরার মাস দুয়েক পর সেপ্টেম্বর মাসে একদিন সন্ধ্যার পর আলী আকবর খান নজরুলদের তালতলা লেনের বাড়িতে আসেন। তিনি একটা মিটমাট করে নজরুলকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। নজরুল যেন সব ভুলে গিয়ে তাঁর ভাগ্নিকে গ্রহণ করেন এই ছিল অনুরোধ। কিন্তু তিনি সফল হননি।
সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস খানমকে এরপর আলী আকবর খান ঢাকায় নিয়ে এসে নিজের কাছে রাখেন। নজরুলের সঙ্গে এ ঘটনার ১৫ বছর পর ১৯৩৭ সালে আলী আকবর খানের পুস্তক ব্যবসার কর্মচারী আজীজুল হাকীমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন।
নজরুলের সঙ্গে বিয়ে সম্পর্কিত ঘটনার পর নার্গিস কী করেছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি বুলবুল ইসলামকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘নজরুল চলে যাবার পর বেশ কয়েক বছর বাড়িতে ছিলাম। ছোট মামা (আলী আকবর খান) ওকে (নজরুলকে) ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তারপর আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। লেখাপড়া আর সাহিত্যচর্চা শুরু করি। ১৯৩৫-এ প্রাইভেট দিয়ে ম্যাট্রিক এবং ১৯৩৭-এ ইডেন কলেজ থেকে নিয়মিতভাবে আই-এ পাস করি।’
আজিজুল হাকীমের সঙ্গে বিয়ের আগে নার্গিস নজরুলকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি কী লিখেছিলেন, বুলবুল ইসলাম তা জিজ্ঞাসা করলে নার্গিস উত্তরে বলেন, ‘আমি যে তাঁর (নজরুল) পথ চেয়ে আছি এবং তাঁকে না পেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেব, এ কথাও লিখেছিলাম। অনুরোধ করেছিলাম প্রমীলাকে বিয়ে করেছ এতে আমার কিছু আসে যায় না; ও যদি সত্যি আমায় ভালোবেসে থাকে, তবে যেন একবার ঢাকায় এসে দেখা করে...আমার বিপর্যয় চোখে দেখেও নজরুল এক মহামানবসুলভ উপদেশের ঢিল ছুড়ে ছুড়ে সুদীর্ঘ উত্তর দিল।...আমি তো নারী হয়ে জন্ম নিয়েছি, তাই মাঠে নেমে চিৎকার করে সভা জয় করতে পারলাম না।’
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close