বুধবার,  ২০ জুন ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৬, ১৭:৫৮:৩৫

সাংবাদিকতায় নজরুলের অবদান

ড. তাহা ইয়াসিন
ভারতের নবজাগরণ বা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সাংবাদিক হিসেবে নজরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরাধীন ভারতের মুক্তি আন্দোলনের ভূমিকায় তিনি নেমেছিলেন প্রাণের সহজাত উত্তাপ নিয়ে। দেশ যখন আন্দোলনের তরঙ্গে উত্তাল, সে সময় অর্থাৎ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ১২ জুলাই নজরুল ও মুজফফর আহমদ সম্পাদিত সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ প্রকাশিত হয়। সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসার মাত্র তিন মাস পর মুজফফর আহমদ ও নজরুল পত্রিকা বের করার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর্থিক ব্যয়ভারের কথা চিন্তা না করেই। পরে মুজফফর আহমদ নজরুলকে নিয়ে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছে পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তাব নিয়ে যান। ফজলুল হকের একটা প্রেস ছিল।
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এক হাজার টাকা জমা দিয়ে মুহম্মদ ওয়াজেদ আলীর নামে পত্রিকার ডিক্লারেশন নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে মুহম্মদ ওয়ায়েজ আলী প্রত্যক্ষভাবে পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকেননি, তবে ডিক্লারেশনে নাম ব্যবহারের সমর্থন দেন। মুজফফর আহমদের মতে, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তাঁর মাকে শুধু বাংলায় চিঠি লিখতেন। এ ছাড়া তিনি বাংলায় কোনো কিছুর চর্চা করতেন না, সে কারণে পত্রিকা চালাতে গিয়ে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ-এ নজরুলের ক্ষুরধার লেখা প্রকাশের কারণে সরকারের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ার করা হয়। নজরুলের এসব লেখার কারণে ফজলুল হক তাঁর ওপর মনঃক্ষুণ্ন হন।
সহকর্মী হিসেবে মুজফফর আহমদ জানান, এ কথা মানতেই হবে যে নজরুলের জোরালো লেখার গুণেই নবযুগ জনপ্রিয় হয়েছিল। শুধু জোরালো লেখা বললে সবকিছু বলা হলো না, নজরুলের লেখা হেডিংগুলো হতো অতুলনীয়। নবযুগ-এর সম্পাদকদ্বয় যুগোচিত রাজনৈতিক চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করে তোলার পুণ্যব্রত গ্রহণ করেন। এর সঙ্গে কৃষক মজুরদের দাবিও তুলে ধরেন। ফলে শিগগিরই নবযুগ রাজরোষে পড়ে এবং তার জামিনের এক হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। তখন আবার দুই হাজার টাকা জমা দিয়ে কাগজ বের করা হয়। এ সময় পত্রিকার মত ও পথ নিয়ে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে নজরুলের মনোমালিন্য হয়। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র সাত মাস কাজ করার পর নজরুল নবযুগ ছেড়ে চলে যান। নবযুগ-এর মতাদর্শ সম্পর্কে মুজফফর আহমদ বলেন, ‘আমরা যখন নবযুগ বার করি, তখন ফজলুল হক সাহেব আমাদের কাগজের কোনো নীতির কথা বলেননি। শুধু বলেছিলেন, কৃষক ও শ্রমিকের কথাও তোমাদের লিখতে হবে।’ নজরুল চলে যাওয়ার পর মুজফফর আহমদ আরও কিছুদিন থাকেন। পরে তিনিও ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে নবযুগ ছেড়ে চলে যান।
একুশ বছরের ব্যবধানে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে নবযুগ দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয়বারও নজরুলকে সম্পাদক করা হয়। কিন্তু নজরুল তখন অভাব-দারিদ্র্য-রোগে জীর্ণ। তারপরও ফজলুল হক নজরুলকে কোনো সহায়তা করেননি। অর্থাৎ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক নজরুলকে যতটা কাজে লাগিয়েছেন, ততটা মিত্র ভাবেননি। এ ব্যাপারে আগ্রহী পাঠক শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত নজরুলের পত্রাবলী নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত বইটির দীর্ঘ ভূমিকা ও কিছু চিঠিপত্রে বিস্তারিত জানা যায়। নবযুগ-এ লেখা প্রবন্ধ ও সম্পাদকীয়গুলো পরবর্তী সময়ে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে যুগবাণী গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হয়।
নবযুগ পত্রিকার লেখাগুলোতে নজরুলের সমাজ ও যুগচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। সমসাময়িক দেশ ও বিদেশের ঘটনাবলি নজরুলের ক্ষুরধার লেখায় জীবন্ত রূপে ফুটে ওঠে। ‘নবযুগ’ নামক লেখাটিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালীন জাগরণের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। নজরুল ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে অভিন্ন বিবেচনা করে এবং সাম্রাজবাদবিরোধী মহাবিশ্বে ‘মহাজাগরণ’ রূপে সেসব সংগ্রামকে অভিনন্দিত করেছেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সেনাকর্মকর্তা জেনারেল ও ডায়ার নিরীহ মানুষের ওপর যে নৃশংস হত্যাকা- চালায়, নজরুল ‘ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’ নামক প্রবন্ধে তার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। তিনি লেখেন, ‘এই যে সেদিন জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকা- সংঘটিত হইয়া গেল, সেখানে আমাদের ভাইরা নিজের বুকের রক্ত দিয়া আমাদিগকে এমন উদ্বুদ্ধ করিয়া গেল, সেই জালিয়ানওয়ালাবাগের নিহত সব হতভাগ্যেরই স্মৃতিস্তম্ভ বেদনা-শেলের মত আমাদের সামনে জাগিয়া থাক ইহা খুব ভাল কথা, কিন্তু সেই সঙ্গে তাহাদেরই দুশমন ডায়ারকে বাদ দিলে চলিবে না। ইহার যে স্মৃতিস্তম্ভ খাড়া হইবে, তাহার চূড়া এত উচ্চ যে ভারতের যে কোন প্রান্তর হইতে তাহা যেন স্পষ্ট মূর্ত হইয়া চোখের সামনে জাগিয়া উঠে। এ ডায়ারকে ভুলিব না, আমাদের মুমূর্ষু জাতিকে চির সজাগ রাখিতে যুগে যুগে এই জল্লাদ কসাই-এর আবির্ভাব মস্ত বড় মঙ্গলের কথা।’
নবযুগ-এ এ রকম আরও মর্মস্পর্শী লেখা যেমন ‘মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?’ ‘কালা আদমীকে গুলি মারা’ প্রভৃতি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।  জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকা-ের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ প্রদত্ত ‘নাইট’ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন। সে সময় সারা ভারতবর্ষে এ ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করে। সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে নজরুল যেসব প্রতিবাদী এবং জাগরণী লেখা লেখেন, এতে ইংরেজ শাসক এবং তাদের দোসররা চুপ থাকতে পারেনি। নজরুল বাঙালির মনে যে জাগরণ সূচিত করেন, তা সমকালে এক বিরাট আবেদন সৃষ্টি করে তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর কারণে। যুগবাণী নিষিদ্ধ হয়। সাংবাদিকতাও যে স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, নজরুল নবযুগ পত্রিকায় কয়েক মাস কাজ করে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close