শুক্রবার,  ১৯ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৬:৩৫:১২

কবিতায় স্বাদেশিক জাতীয়তাবাদ ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

শেখর দেব
আমাদের কবিতার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। চর্যাপদের আলো-আঁধারি জঠর ভেদ করে বাংলা কবিতার জন্ম। অতঃপর পার করেছি লীলাময় মধ্যযুগ। যেখানে প্রেম আধ্যাত্ম চেতনার প্রতিবিম্ব নিয়ে বিমোহিত করেছে কাব্য-বাঁশির সুর। অতিমানবীয় প্রেম যুগপৎ আমাদের মনের দৌরাত্ম্য ও চিন্তার সীমাকে নিয়ে গেছে ভিন্ন জগতে। এরপর  আধুনিক হয়ে উঠি। তিরিশের দশকের কবিতায় যা আমরা প্রত্যক্ষ করি। ’৪৭-এর আগে আমরা ছিলাম সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে। এরপর ভারতীয় উপমহাদেশ দুটি ভূখণ্ডে ভাগ হয়ে যায়। আমরা পাই পাকিস্তান নামের একটি দেশ। পাকিস্তান নামে যে দেশটি আমরা পেয়েছিলাম, তা মূূলত ছিল একটি ঔপনিবেশিক শক্তি, যা পূর্ব পাকিস্তান নামের ভূখণ্ডে শাসন ও শোষণের মধ্যে দিয়ে অপশক্তি প্রয়োগ করে গেছে এবং পরিচয় দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবহেলা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জীবন অসহনীয় করে তুলেছিল। পরবর্তী সময়ে বাঙালির সংগ্রামের ফলে আজকের বাংলাদেশ। ’৪৭ থেকে ’৭১- এই সময়ের মধ্যে বাংলা কবিতা থেমে ছিল না। বরং এ সময় কবিতার অক্ষয় শরীরে লেগেছে নতুন ছোঁয়া, নতুন মাত্রা। ঔপনিবেশিক সমাজে বেড়ে ওঠা কবিরা বিদ্রোহ করেছেন স্বদেশ চেতনায়।
 
জাতীয়তাবাদ শব্দটির অন্তর্নিহিত ভাব হলো চেতনা। আদিম যুগ থেকেই একই ধ্যানধারণার মানুষগুলো একত্রে থাকার চেষ্টা করেছে। একই জাতীয় বলতে ভাষিক মিল, সাংস্কৃতিক মিল এবং একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী। একই জাতীয় মানুষ একই ভূখণ্ডে অবস্থান করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে হয়ে ওঠে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ চেতনাই হলো জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদ একটি স্বদেশ প্রত্যাশা করে। যে দেশে সবকিছু নিজের মতো করে হবে। থাকবে না কোনো অপশক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আগ্রাসন। এটাই স্বাদেশিকতা। ’৪৭-পরবর্তী সাহিত্যে এ চেতনার প্রকাশ ঘটেছে বিভিন্নভাবে। কবিতার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলা কবিতায় এই স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদ ফুটে ওঠে ’৫২ সালে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক মিলের ওপর ভিত্তি করে। যাকে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলি। ভাষার প্রশ্নে এই ভূখণ্ডে যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রাণ দিল অনেক তাজা প্রাণ, সে চেতনা যে সব কবি দক্ষতার সঙ্গে কবিতায় তুলে এনেছেন, তাঁদের মধ্যে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান ও আলাউদ্দিন আল আজাদ অন্যতম। একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবি নিয়ে এসেছি’-এর কবি হলেন মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। ’৪৭-পরবর্তী এটিই প্রথম কবিতা, যেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রচ্ছন্নতার প্রকাশ ঘটে। এ কবিতায় প্রতিবাদের ভাষার ফাঁকে ফুটে উঠেছে জাতীয় সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের চিত্র।
 
একুশের আকস্মিকতায় কবি হাসান হাফিজুর রহমান দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন ‘দেশ আমার’ বলে। এখানেই স্বাদেশিক চেতনার বিস্ফোরণ ঘটে। আস্তে আস্তে দানা বাঁধতে থাকে স্বাদেশিক জাতীয়তাবাদের।
 
সাহিত্যের প-িতেরা ’৪৭-পরবর্তী সময়কে উত্তর-ঔপনিবেশিক কাল হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। এ ধারণা মূলত ব্রিটিশ শাসনের করাল থাবা থেকে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে ধরা হয়েছে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। পাকিস্তানের নিপীড়ন ও শোষণের হাত থেকে বেরিয়ে এসে স্বদেশ পেয়েছি। তাই ’৪৭ থেকে ’৭১ সময়টাকেও ঔপনিবেশিক সমাজ হিসেবে দেখি। কারণ এই সময়ে আমরা ছিলাম নিজ দেশে পরাধীন। এই পরাধীনতার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে আমরা বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছি। এই স্বদেশ এমনি এমনি আসেনি। এর জন্য রচিত হয়েছে দীর্ঘ নির্যাতনের ইতিহাস। বাংলার দামাল ছেলেদের অংশ নিতে হয়েছে মুক্তির সংগ্রামে। সেই মুক্তি সংগ্রামের ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায়-
 
    তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
    সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
    সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।
 
তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলের জনগণ ছিল অনগ্রসর। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা সামাজিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রেখেছিল বাংলার সহজ-সরল মানুষদের। শিক্ষায় ছিল অনেক পিছিয়ে, ছিল ক্ষুধার্ত। এর পরও তারা এ আগ্রাসন ভেদ করে মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছে এবং পেরেছেও। কবি শহীদ কাদরী ‘সেলুনে যাওয়ার আগে’ কবিতায় চুলের রূপকে ফুটিয়েছেন এক অনন্য চিত্র। কবিতাটির কিছু লাইন এ রকমÑ
 
    আমার ক্ষুধার্ত চুল বাতাসে লাফাচ্ছে অবিরাম
    শায়েস্তা হয় না সে সহজে, বহুবার
    বহুবার আমি তাকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম
    পাড়াতে চেয়েছি।...
 
পশ্চিম পাকিস্তানের নগ্ন নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই দিয়ে, একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে যিনি বাংলার সুঠাম আবরণহীন দেহওয়ালা দামালদের মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্দীপনা প্রদান করেছেন, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিও কবিতায় এসেছেন সাবলীলভাবে। কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুর কথা এনেছেন এভাবে-
 
    সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
    রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ
    গতকাল আমাকে বলেছে,
    আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
 
’৭১-এ কবিরা রাষ্ট্র পেল। স্বদেশ পেল। সাহিত্য তার আপন গতিতে চলছে। কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। কবিতার শরীরে লেগেছে নানা তত্ত্ব। উত্তর-ঔপনেবিশক চিন্তা যখন প্রবহমান, তখন সমানতালে আধুনিক সাহিত্যের বিচ্ছিন্নতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জন্ম হলো উত্তর-আধুনিকতার প্রপঞ্চ। ঔপনিবেশিকতার অবসানের পরেও নব্য উপনিবেশবাদ নামের নতুন আগ্রাসনের কথা বলা হচ্ছে। আমরা রাষ্ট্র পেয়েছি, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। স্বাধীনতার পরেও আমরা আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোকে দৃঢ় করতে পারিনি। কবিরা কবিতা লিখছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতায় আসছে পরিবর্তন। এ পরিবর্তন চিন্তার, কাঠামো ও আঙ্গিকের। উত্তর-আধুনিক কবিতা চাইছে নিজের শিকড়ে ফিরতে। নব্বই দশকে উত্তর-আধুনিক চিন্তার সূত্রপাত। চট্টগ্রামের সবুজ হোটেল থেকে এ আন্দোলনের সূচনা। দীর্ঘ তিন দশক ধরে এ চেতনা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। মূলত আধুনিক কবিতার বিচ্ছিন্নতা ও বিদেশনির্ভরতা থেকে উত্তরণের জন্য এ তত্ত্বের জন্ম। উত্তর-আধুনিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য যেন আপন ঘরে ফিরল। বর্তমান সময়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতার প্রভাব অবলোকন করা যাচ্ছে। সাহিত্যের সব মাধ্যমে ফুটে উঠছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো কবিরা কবিতাকে অন্য এক প্রপঞ্চে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেবে।
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close