রোববার,  ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৬, ২১:২৩:০০

মুসলিম সাহিত্য সমিতির অবদান

ড. তাহা ইয়াসিন
নজরুলের সাহিত্যজীবনের সূচনায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে থাকাবস্থায় নজরুলের অনেক বন্ধুবান্ধব হয়। এই বন্ধুদের অনেকেই নজরুলের শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর মিত্র হিসেবে ছিলেন। এ ছাড়া দেশপ্রেমের যে আবেগ-উচ্ছ্বাস নিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন, তারও একটা পরিণত ও সুশৃঙ্খল ভিত্তি রচিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির আখড়ায় ও মুজফফর আহমদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে। নজরুল সমিতির অফিসে এসে আস্তানা গাড়ার ফলে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়, এ সম্পর্কে মুজফফর আহমদের স্মৃতিচারণা : ‘নজরুল ইসলাম আসার পর হতে অনেক কবি ও সাহিত্যিকের আনাগোনার ফলে সাহিত্য সমিতির অফিস আগেরকার চেয়ে বেশি জমজমাট হয়ে উঠেছিল। যাঁরা আগে কখনো আসতেন না, তাঁরাও তখন আসা-যাওয়া করতে লাগলেন।’
 
সাহিত্য সমিতির অফিসে থেকে নজরুল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখতেন। এখানে থাকা অবস্থায় তাঁর মোসলেম ভারত পত্রিকায় বাঁধন-হারা পত্রোপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। ওই একই পত্রিকায় কোরবানী, বাদল বরিষণে, বোধন, মোহররম, শাত্-ইল্-আরব, বিরহ-বিধুরা প্রভৃতি কবিতা, কয়েকটি গান, গজল ও গল্প ছাপা হয়। সাহিত্য সমিতিতে নজরুল যে আশ্রয় পেয়েছিলেন সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সেদিন যদি সাহিত্য সমিতি আমাকে আশ্রয় না দিত, তবে হয়তো কোথায় ভেসে যেতাম, তা আমি জানি না। এই ভালোবাসার বন্ধনেই আমি প্রথম নীড় বেঁধেছিলাম, এ আশ্রয় না পেলে আমার কবি হওয়া সম্ভব হতো কি না, আমার জানা নেই।’
 
মোসলেম ভারত পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আফজল-উল হক। এ পত্রিকার জন্য একজন বড়মাপের লেখক খুঁজছিলেন আফজল-উল হক। নজরুলকে পেয়ে তিনি লেখা দেওয়ার অনুরোধ করলে নজরুল ধারাবাহিকভাবে লিখতে থাকেন।
 
অতীত আরবের শৌর্যবীর্যকে নজরুল শ্রদ্ধা করেছিলেন, কিন্তু সেই আরবের দুরবস্থায় তিনি কষ্ট পান। তাই অতীতের গৌরবকে স্মরণ করে লেখেন ‘শাত্-ইল্-আরব’ কবিতাটি প্রথম দুচরণÑ‘শাত্-ইল্-আরব! শাত্-ইল্-আরব। পূত যুগে যুগে তোমার তীর।/ শহীদের লোহু, দিলীয়ের খুন ঢেলেছে যেথায় আরব বীর।’ এই কবিতাটি পত্রিকায় পড়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নজরুলকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। তারপর কলকাতার সে সময়কার সাহিত্যিক আড্ডা গজেন ঘোষের আড্ডায় দুজনের দেখা হয়। গজেন ঘোষের আড্ডা সে সময় সাহিত্যিকদের তর্ক-বিতর্কের স্থান হিসেবে সুপরিচিত ছিল। সেখানে দেখা হওয়ার পর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নজরুলকে ¯েœহবন্ধনে জড়িয়ে ধরেন। নজরুলও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। ওই একই পত্রিকায় প্রকাশিত ‘খেয়া-পারের তরণী’ কবিতাটি পড়ে মোহিতলাল মজুমদার নজরুলের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মোহিতলাল মজুমদারই প্রথম ব্যক্তি, যিনি নজরুলের ‘খেয়া পারের তরণী’ কবিতাটির প্রশংসা লিখিতভাবে মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তিনি নজরুলের প্রশংসা করলেও পরবর্তী সময়ে নজরুলের মিত্র থাকেননি। শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। দেশে তখন স্বাধীনতার উত্তাল আন্দোলন। ব্রিটিশের শাসনশৃঙ্খল থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায় সারা দেশে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সে সময় রাজনীতিতে ‘কংগ্রেস’ নামক রাজনৈতিক দলের নেতা মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মত্তলানা আবুল কালাম আজাদ, চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষচন্দ্র বসুসহ আরও অনেকে। অন্যদিকে বিপ্লববাদীরা বোমা মেরে গুলি করে ইংরেজকে দেশছাড়া করার জন্য মরিয়া। দেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের এই ডামাডোলের বর্ণনা দিয়ে মুজফফর আহমদ লিখেছেন, ‘তাপের ওপর চড়ালে জল যেমন টগবগ করে ফোটে, দেশের বিক্ষুব্ধ মানুষও সেই রকম টগবগ করে ফুটছিল।’
 
রাজনীতির প্রতি নজরুলের ছিল সজাগ দৃষ্টি। তাই তাঁর চিন্তা, রাজনীতির মাধ্যমেই ব্রিটিশকে তাড়াতে হবে। ভারতবর্ষের এ রকম রাজনৈতিক অবস্থায় মুজফফর আহমদ নজরুলকে একদিন বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আপনার কর্তব্য কী বলে আপনি মনে করেন? শুধু সাহিত্য করবেন, নাকি রাজনীতি করবেন? নজরুল পরিষ্কার ভাষায় জানান, ‘রাজনীতি যদি না করব তো যুদ্ধে গিয়েছিলাম কেন।’
 
ঘুমন্ত ভারতবাসীকে স্বাধীনতার চেতনায় জাগিয়ে তোলার জন্য নজরুল রাজনৈতিক সাহিত্য রচনা করতে লাগলেন। তিনি স্থির সিদ্ধান্ত নেন কবিতা, গান, প্রবন্ধ যা কিছুই লিখবেন, তা রাজনীতির পরিপূরক হিসেবেই। দেশবাসীকে জাগানোর জন্যই এসব করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। মুজফফর আহমদসহ দুজন মিলে ঠিক করলেন একটি পত্রিকা বের করবেন। তখন রাজনৈতিক চেতনা উদ্দীপনের ক্ষেত্রে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের সান্ধ্যদৈনিক সন্ধ্যা বিপ্লবী আন্দোলনের মুখপত্ররূপে কাজ করেছিল। অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে সাপ্তাহিক যুগান্তর,  বিপিনচন্দ্র পালের ইংরেজি সাপ্তাহিক নিউজ ইন্ডিয়া সংবাদপত্র হিসেবে জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
 
এ ছাড়া কৃষ্ণকুমার মিত্রের মঞ্জীবনী বাংলার প্রগতিশীল বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে। ব্রিটিশ শাসক ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও ব্রহ্মবান্ধবকে রাজদ্রোহের অভিযুক্ত করে। ব্রহ্মবান্ধব বিদেশি শাসকের সামনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে অস্বীকৃত হন এবং কারাগারের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের (১৯০৫-১৯১১) পরিপ্রেক্ষিতে স্বদেশি ও স্বশস্ত্র সংগ্রাম পরাধীন জাতিকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।
 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) শেষে ভারতে ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধের সময় দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধশেষে ভারতে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এটি ছিল তাদের একটা কৌশল। ভারতের জনগণের ওপর তারা উল্টো আরও নানা রকম নীতি চাপিয়ে দেয়। ফলে দেশবাসীর মনে প্রচ- অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে। মানুষ জীবন দিয়ে হলেও ব্রিটিশকে তাড়ানোর অর্থাৎ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য শপথ গ্রহণ করে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন অস্থিতিশীলতার চূড়ান্তে উপনীত। এ রকম অবস্থায় মুজফফর আহমদ ও নজরুল একটা পত্রিকা বের করার জন্য মনস্থির করেন।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close