মঙ্গলবার,  ১৭ জুলাই ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৬, ১৯:৪৫:২৮

পথের পাঁচালীর সত্যজিৎ

সুকান্ত পার্থিব
ইতালিয়ান পরিচালক ভিত্তোরি দ্য সিকার বানানো ‘দ্য বাই সাইকেল থিফ’ ছবিটি দেখে সিনেমা বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলেন এক সাহসী বাঙালি তরুণ। তিনি সিনেমার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের জীবনের অস্তিত্বকে। তাই, একসময় রবীন্দ্র সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরবর্তীতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়। সমস্ত আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সিনেমা বানাবেন বলে। অন্যদিকে মাথার ভিতর গেঁথে আছে প্রখ্যাত কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাসটি। পণ করলেন সিনেমা বানাবেন, এবং মাথার ভেতর গেঁথে থাকা ‘পথের পাঁচালি’ দিয়েই শুরু করবেন। পথের পাঁচালি -এর চিত্রনাট্য নিয়ে চললো দৌড় ঝাঁপ, স্ক্রিপ্ট নিতে মুখিয়ে ছিলেন আরো অনেকে। কিন্তু, বিভূতিভূষণের স্ত্রী সত্যজিৎকেই দিলেন পথের পাঁচালির সত্ত্ব। মুগ্ধ হয়ে সিনেমা বানাতে নেমে পড়লেন সত্যজিৎ।
 
নিও রিয়েলিজম, সিনেমা ভেরিতে আর ডাইরেক্ট সিনেমা আন্দোলনগুলো দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত সত্যজিতের সিনেমাগুলোও তাই নিও রিয়েলিজম ধাঁচের। বাস্তবতার নির্মম রূপ, পরিবারকেন্দ্রিক কাহিনী আর অপেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করেছেন সত্যজিৎ। সার্গেই আইজেনস্টাইনের অমর সৃষ্টি ‘ব্যাটলশীপ পটেমকিন’ সিনেমাটি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকবার দেখেছিলেন সত্যজিৎ, উদ্দেশ্য সিনেমাটির খুঁটিনাটি সকল বিষয় আয়ত্ত্ব করা।
 
চলচ্চিত্রের ভাষায় যথার্থ বাস্তবতার উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। এত বছর পরেও তা প্রতীয়মান হয়েছে বাস্তব শিল্পচিত্র হিসেবে। আধুনিক বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে টেকনোলজি বেশ বিপদেই ফেলে দেয় কখনও কখনও কোনও শিল্পমাধ্যমকে। যেমন ফিল্ম। কারিগরি-প্রযুক্তির সহযোগিতায় যত সম্ভাবনা বেড়েছে ফিল্মের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, একই সঙ্গে শিল্পনির্ভরতার জমিটাও যেন একটু একটু করে সরে গেছে। ছবির সঙ্গে ধ্বনি যুক্ত হয়ে যে দিন সবাক ছবির হাতেখড়ি হয়েছিল, অনেকেরই সে দিন ভয় ধরে গিয়েছিল, সবাক হয়ে ওঠার নামে শব্দের এমন বাড়াবাড়ি আমদানি হবে না তো যে, দৃশ্যগত বোধ কোণঠাসা হয়ে পড়বে শ্রাব্যতার চাপে। আসলে এর আগেই দর্শকের শিল্প-আস্বাদে আইজেনস্টাইন বা চ্যাপলিনের নির্বাক ছবির নান্দনিক অভিজ্ঞতা ঘটে গিয়েছে। সত্যজিৎ রায় খেয়াল করিয়ে দিয়েছেন, ‘ছবিকে উপেক্ষা করে যদি কেবল শব্দের উপর জোর দেওয়া হয়, তা হলে সিনেমার ভাষা দুর্বল হতে বাধ্য।’
 
সিনেমা যে শিল্পের একটি শক্তিশালী মাধ্যম, এই কথা কখনো ভুলেননি নির্মাতা সত্যজিৎ। তাই বলে তিনি শুধু সিনেমার ভিতর দিয়ে প্রস্তর কঠিন শিল্পচর্চাই করেননি। প্রেম, বিরহ, যাতনা, সমকালীন রাজনীতি, সমাজের অবক্ষয়, অবদমন এই সবকিছুই তার চলচ্চিত্রে বিষয়বস্তু হয়েছে; তবে তা গতানুগতিক ধারাকে উপেক্ষা করে, পুরো সত্যজিৎ স্টাইলে। সত্যিকারের বাংলা সিনেমার যাত্রা তাঁর হাত ধরেই এগিয়েছে। প্রাণহীন বাংলা সিনেমা শিল্পকে দূর আকাশ হতে ধরে এনে তার ভিতর জীবন দিয়েছেন তিনি। তার সিনেমায় প্রতিটি চরিত্র সত্যিকার জীবনের কথা বলে, জীবন্ত গল্প আর অপরূপ দৃশ্যের সমাহার বাংলা সিনেমায় শুধু নয়, বিশ্ব সিনেমায়ও বিরল! সত্যজিৎ রায়ের ভয়টা যে অমূলক ছিল না, এত বছর পরও সেটা দৃশ্যমান। নিঃশব্দের শিল্পক্ষমতা ভুলে শব্দের চড়া ব্যবহারে মেতে ওঠেন ফিল্মমেকাররা, জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে দর্শকের কাছে ফিল্মের আকর্ষণীয় মেজাজ তৈরির খেলায়। আসলে কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, চিত্র, ভাস্কর্য, সংগীত, নৃত্য, অভিনয়- এইসব অতীতের শিল্পরূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। তুলনায় ফিল্মের সঙ্গে পরিচয় নতুন। তা ছাড়া আধুনিকতার সংজ্ঞা, তা সে পশ্চিমা অভিঘাতেই হোক বা দেশি অভিঘাতে, তাকেও আমরা ওই সব পূর্বের শিল্পের প্রকরণে সাজিয়ে নিতে পেরেছি ঢেলে। কিন্তু ফিল্মের মতো অপরিচিত, আপাদমস্তক যন্ত্রনির্ভর মাধ্যমটির ক্ষেত্রে তা বোধহয় আমরা পেরে উঠিনি। আমাদের শিল্পভাবনার আধুনিকতায় ফিল্মের প্রকরণ অনাত্মীয় রয়ে গেছে শুরু থেকেই। তাই বাংলা সিনেমায় সত্যজিতের আগমনের আগে পর্যন্ত সত্যিকারের শিল্পসম্মত ফিল্ম করা তা দূরের কথা, সে ধরনের ফিল্ম যে কী, তা বুঝে নেওয়াও তখন ছিল প্রায় অসম্ভব।
 
সত্যজিৎ নিজে সিনেমার শিল্পরূপটি চিনে নেওয়ার চেষ্টায় ব্রত ছিলেন নিরন্তর, ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫) নির্মাণের আগে থেকেই তাঁর বাংলা-ইংরেজি লেখালেখিতে সেই প্রমাণ মেলে। সেখানেও স্পষ্ট করেছেন সত্যজিৎ, ‘সাহিত্য নাটক চিত্রকলা সংগীত ইত্যাদির প্রভাব সত্ত্বেও চলচ্চিত্রশিল্প নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। ‘পথের পাঁচালী’-তে চলচ্চিত্রের শিল্পিত স্বভাবটি প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত থাকতে চাননি তিনি, লেখালেখির ভিতর দিয়ে অবিরত চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন সে স্বভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে, তার স্বরূপ শিক্ষিত বাঙালির মনে বুনে দিতে। ফলত তাঁকে অপ্রিয় প্রশ্নও তুলতে হয়েছে, যেমন বাংলা ছবিতে যথেচ্ছ গানের ব্যবহার নিয়ে: ‘যেকোনও পরিচালকের যে-কোনও ছবিতেই যদি গান এসে পড়ে, তা হলে সেটাকে একটা উন্মাদনার পর্যায়ে ফেলা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না।’ বেঁচে থাকলে তাঁকে এই অপ্রিয় প্রশ্ন আবার তুলতে হত, কারণ নতুন শতকে নতুন প্রজন্মের পরিচালকেরা এখনও ফাঁক পেলেই গান ঢুকিয়ে দেন তাঁদের ছবির মধ্যে।
 
আসলে ‘পথের পাঁচালী’ সত্ত্বেও যন্ত্রকে নিঃশেষে ব্যবহার করে কীভাবে পৌঁছনো যায় শিল্পের বিমূর্তে, সে অভ্যাস তেমন রপ্ত হয়নি যে আজও! যন্ত্রনির্ভরতার সঙ্গে আত্মীয়তা আমাদের হয়তো টেকনিক রপ্ত করতে শিখিয়েছে ফিল্মের, কিন্তু ফর্ম আত্তীকরণের উপায় বদলেছে কি? আঙ্গিক তৈরি হয় শিল্পীর শিল্পভাবনার নিজস্ব চাপে, মননসঞ্জাত বীক্ষায়, কেবল মাত্র ফিল্ম তোলার কায়দাকানুনের ওপর নির্ভর করে নয়। এই আঙ্গিক নির্মাণের কথা সত্যজিৎ তুলে ধরেছেন সেই সব রচনায়, যেগুলি ষাটের দশকের দ্বিতীয় পর্বে রচিত ছিল তাঁর। যেমন ১৯৬৭-তে ‘ভারতকোষ ৩য় খণ্ড’-এ প্রকাশিত ‘চিত্রনাট্য’ রচনাটি, যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘চলচ্চিত্রের রস মূলত তাহার চিত্রভাষায় নিহিত। সংগীতের মতোই চলচ্চিত্রের রস অন্য কোনও ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।’ আর এই চিত্রভাষার উপলব্ধির প্রধান অন্তরায় আমরাই, ‘আমাদের বাঙালিদের, শিল্প গ্রহণের মনটা বোধহয় মূলত সাহিত্যিক মন। অর্থাৎ সাংগীতিক মন নয়, বা চিত্রগত মন নয়।’ মনে হয়েছে তাঁর। এই প্রবন্ধেই আঙ্গিক নিয়ে নির্দিষ্ট করেছেন তাঁর মত, ‘সাহিত্যের ওপর ফিল্মের এই নির্ভরতাকে প্রায় অস্বীকার করেই ফিল্মের সাংগীতিক কাঠামোর জন্ম।’
 
পথের পাঁচালী সবদিক থেকেই খুবই উন্নতমানের চলচ্চিত্র। বিশেষ করে ছবির আঙ্গিক। তা না ছিল প্রথাগত হলিউড না ছিল ইটালিয়ান নিও রিয়ালিস্ট ঘরানা। একেবারেই অতুলনীয়। প্রবলভাবে বাঙালিরাও। ছবির বিষয় নিয়ে লক্ষ কোটি লেখা আছে। কিন্তু এই আঙ্গিক নির্মাণের কাজটা যে বেশ জটিল, স্বীকার করেছেন সত্যজিৎ। গানের সংগীতে তাও তাল আছে, একটা স্পষ্ট গাণিতিক চেহারা আছে, ফিল্মের সংগীতে তো মাপার বা গোনার কোনও উপায়ই নেই। ‘কিন্তু এই জটিলতাসহ সাংগীতিক কাঠামোর সামগ্রিকতা যদি শিল্পীর অনুভবে না আসে, তা হলে ফিল্ম করা যায় না। আর সেই অনুভবকে উপলব্ধি করতে না পারলে ভাল ফিল্ম বোঝাও যায় না।’ অমোঘ মন্তব্য তাঁর। তাঁর মতে ‘‘চলচ্চিত্র শিল্পের পথিকৃতেরা অনেকেই ছিলেন সংগীতরসিক। গ্রিফিথ বেটোফেনের সংগীত থেকে প্রেরণালাভ করেছিলেন এ কথা তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। ‘বার্থ অব এ নেশন’ বা ‘ইনটলারেন্স’ ছবির দৃশ্যগঠনে এই সংগীতশৈলীর কাঠামো লক্ষ করার মতো।’’
 
মুশকিল হল ‘পথের পাঁচালী’-এর অভিজ্ঞতা যাঁদের হতবাক করেছিল, নিছক নতুনত্ব পেরিয়ে তাঁরা সে ছবির প্রাথমিক বাস্তবতার তলায় লুকোনো সত্যজিতের এই প্রখর অন্বেষাকে চিনে উঠতে পারেননি। পারলে বোধহয় এতকাল ধরে তাঁকে কেবলমাত্র ফিল্মের গল্প-বলায় সাবালক চরিত্র এনে দিয়েছিলেন— এই জাতীয় ক্লিশে বিশেষণে আটকে রাখতেন না। এই সংগ্রহটি সত্যজিৎ সম্পর্কিত ওই অস্বস্তিকর সরলীকৃত ধারণা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে, এমনকী তাঁর ফিল্মগুলিকেও নতুন চোখে ফিরে দেখতে সাহায্য করবে আগামীতে।
 
‘পথের পাঁচালি’ মুক্তির পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের। ছুটে চলেন, তবে ধীরে। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ দেশে-বিদেশে সিনেমাবোদ্ধাদের আলোড়িত করে। বহু নামিদামি পরিচালক এক নবীন সিনেমা মেকারের ছবি দেখে মুগ্ধতার কথা জানায়। অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে মনোনীত হয় তাঁর ‘পথের পাঁচালি’। পাত্তা না দেয়া এক সিনেমা পাগল তরুণের দিকে দৃষ্টি পড়ে তাদের। যে তরুণ নির্মাতা একটি স্বপ্ন পূরণের জন্য বিত্তবানদের ধারে ধারে ঘুরেছে, ‘পথের পাঁচালি’ মুক্তির পর দেখা গেলো তার পিছনে ছুটছে ভারতের সবচেয়ে খানদানি প্রযোজক সংস্থাও। সিনেমা নির্মাণের জন্য পরবর্তীতে আর অর্থ কষ্টে পড়তে হয়নি এই মহান নির্মাতার। এই জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎকে জানতে হলে তাঁর ভিতরের চিত্রকরটিকেও চিনতে হবে, আর সে জন্যই প্রাণের উৎসর্গ খুঁজতে হবে তার চলচ্চিত্রে।
 
লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।  
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close