সোমবার,  ২৩ এপ্রিল ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৬, ১৫:৩২:৫১
পাঠ প্রতিক্রিয়া

শিশির ভট্টাচার্য্য'র ‘বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান’

সাবিদিন ইব্রাহিম
বই: বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান
লেখক: শিশির ভট্টাচার্য্য
প্রকাশক: আদর্শ
প্রকাশকাল: বইমেলা ২০১৬
মূল্য: ২০০
 
বাংলা ভাষা এবং এর ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক, বিভিন্ন আলোচনার সিনেমাটিক প্রকাশ ঘটেছে শিশির ভট্টাচার্য্যের ‘বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান’ বইটিতে। লেখকের অত্যন্ত সুন্দর গদ্যের কারণে পড়াটা অনেক আনন্দদায়ক মনে হবে। যেকোন ভাষার ব্যাকরণ, এর চরিত্র বা এর রীতি নীতি নিয়ে আলোচনা অনেকটা জটিল এবং আরও বড় সমস্যা হচ্ছে এটা ক্রমশ পরিবর্তনশীল। এটাকে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা, পাঠককে পড়তে বাধ্য বা আকৃষ্ট করা একটি অসাধারণ যোগ্যতা। শিশির ভট্টাচার্য্য এমন অনন্য যোগ্যতার দোষে দুষ্ট।
 
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটি আলোচিত আর্টিকেল ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ র আশে পাশে ঘিরেই এ বইটির বিভিন্ন আলোচ্চ্য বিষয় ঘুরাফেরা করেছে। বদরুদ্দীন উমর, আবুল কাসেম ফজলুল হক, আহমেদ রফিক, এসএম রেজাউল করিম, সৌরভ সিকদার, পবিত্র সরকার, শিবলী আজাদ, মুরতাহিন বিলাহ জাসিসহ বিভিন্ন লেখকদের ভাষা বিষয়ে বিভিন্ন তর্ক-বিতর্কগুলোও স্থান পেয়েছে। চলতি ভাষা ও মানভাষা, ভাষার মিশ্রণ, ভাষার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা নিয়ে বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক এবং সেখানে শিশির ভট্টাচার্য্যের নিজস্ব যুক্তি উপস্থাপন বিষয়গুরোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। 
 
কোন ভাষার ব্যবহারের পেছনে যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিষয়াদিও সম্পর্কৃত সেটারও একটা ভালো বুঝ আনয়নের জন্য এ বইটা খুব কাজে দেবে বলে মনে করি। ভাষাতত্ত্ব, ভাষা বিতর্ক কিংবা ভাষার ব্যকরণ যাদের কাছে সবসময় কঠিন বলে মনে হয়েছে তারা এই বইটি পড়লে বুঝতে পারবেন কিভাবে সে বিষয়গুলো অনেক আনন্দদায়ক।
 
ভাষা বিতর্কের কয়েকটি জটিল প্রশ্নের উত্তর রয়েছে এ বইটিতে যা সমালোচক, বোদ্ধাদের চিন্তার মশলা দেবে। প্রথমে একটা বিতর্ক দিয়ে শুরু করি-সেটা হলো শব্দদূষণ নিয়ে। বাংলার সাথে অন্য শব্দের মেশানোটাকে অনেকে অনেকভাবে দেখেন। কিন্তু কোনটা বেশি যুক্তিযুক্ত? এর উত্তর লেখক শিশির ভট্টাচার্য্য দিয়েছেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে। তার মতে- “যেকোন ভাষার সৃষ্টি ও ক্রমবিকাশ অনেকটা দই পাতার মতো। পুরনো দইয়ের সঙ্গে নিত্যনতুন দুধ মিশে যেমন দইয়ের কলেবর বাড়ে তেমনি ভাষাকেও প্রতিনিয়ত মৃত বা জীবিত কোনো ভাষা থেকে প্রাণরস সংগ্রহ করতে হয়। পৃথিবীর কোন জীবিত ভাষাই অন্য ভাষার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ছাড়া গড়ে ওঠে না।” (পৃষ্ঠা ৭১, বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান)
 
ভাষার একটা রূপ যে একটা মেয়াদ পরপর পরিবর্তিত রূপ নেয় তার কথা বলতে গিয়ে তিনি ভাষার চিরন্তন রূপটা বেশ নির্মোহ ভঙ্গিতে বলে ফেলেন- “যে প্রমিত ভাষার পবিত্রতা রক্ষার জন্য আজ এত হা-হুতাশ সে ভাষাও একদিন মরবে। চর্যাপদের যুগের ভাষার মৃত্যু হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষার মৃত্যু হয়েছে, আজকের বাংলা ভাষারও মৃত্যু হবে। কোনো মানবভাষার কোনো একটি রূপ পাঁচশো বা খুব বেশি হলে হাজার বছরের বেশি বোধগম্য থাকে না। এর মানে হচ্ছে, যেকোন জীবিত ভাষার আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ এক হাজার বছর। সংস্কৃত বা ল্যাটিনের মতো কিছু ভাষা অবশ্য তাদের লিখিত রূপে মমি হয়ে বহু হাজার বছর বেঁচে থাকে।” (পৃষ্ঠা ৭২-৭৩, বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান)
 
কোনো এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় ঢুকলে যে ক্ষতি হয় না এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করে লেখক বলেন- ‘কোনো ভাষায় অন্য ভাষার শব্দ ঢুকলে কোনো ক্ষতি হয় না, কারণ শব্দ ঢোকে সেই ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বের নিয়ম মেনে। ভাষামিশ্রণ উদ্বেগজনক কোনো সঙ্কট হলে, ইংরেজি বহু আগেই ফরাসি শব্দের বন্যার তোড়ে হারিয়ে যেতো। ইংরেজি ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব ইংরেজির ইংরেজিত্ব বজায় রেখেছে, আবার ফরাসি শব্দ দিয়ে তাকে সমৃদ্ধও করেছে। বাংলার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হওয়ার কারণ নেই।’ (পৃষ্ঠা ৭৫, বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান)
 
লেখক বইটির ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান’ শিরোনামের লেখাটিতে বাংলা ভাষার দুটি প্রধান সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে বাংলা ভাষার প্রকৃত সমস্যা দুটি। প্রথম সমস্যাটি হচ্ছে সর্বস্তরে এই ভাষার প্রয়োগ নেই। বিচারবিভাগ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রশাসনে এর প্রয়োগ নেই। এরকম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাঠামোতে ভাষার সঠিক ব্যবহার না করে সাধারণ মানুষকে ভাষা ব্যবহারে জোর জবরদস্তি করা হাস্যকর। আর বাংলা ভাষার দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে এ ভাষাটির অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠাহীনতা।
 
বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যার পেশাদারি সমাধান বাতলে দিতে গিয়ে লেখকের পরামর্শ হচ্ছে- ‘বাঙালিরা যদি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চায় তবে তাদের একটি ভাষানীতি ঠিক করতে হবে এবং একটি ভাষা আইন প্রণয়ন করতে হবে।’ (পৃ ৮০)
 
ভাষা যে একটি অর্থকড়ি পণ্য এবং এর বাজারমূল্য অনেক চড়া তার উদাহরণ দিতে গিয়ে ইংরেজি ভাষা কিভাবে টোফেল ও আইএলটিএস পরীক্ষার ফি থেকেই বিপুল পরিমাণ ডলার/পাউন্ড কামাচ্ছে প্রতিমাসে তার উদাহরণ দিয়েছেন। বাংলা ভাষা ইংরেজির মতো চড়া দামে বিক্রি না হলেও এর সম্ভাবনা যে একেবারেই নেই সেটা উড়িয়ে দেননি লেখক। কিন্তু বাঙালিদের নিজেদেরকেই তার পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে, এটা প্রতিযোগী অন্যজন এসে ঠিক করে দেবে না অবশ্যই! এক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ টেনে এনে লেখক দেখান কিভাবে মাইক্রোসফটকে চেক বা শ্লোভাক ভাষায় তাদের উইন্ডোজ প্রোগ্রামকে অনুবাদ করে প্রবেশ করতে হয়। অথচ বাংলা ভাষায় এ পণ্যটির বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা অর্থনৈতিকভাবে ইংরেজির কাছে পরাজিত হয়েছে। অথচ আমরা খুব বুক ফুলিয়ে প্রতিনিয়ত বলে আসি বাংলা ভাষা বিশ্বের পঞ্চম বা ষষ্ঠ বহুল ব্যবহৃত ভাষা। বিশ্বের এই প্রথমসারির বহুল ব্যবহৃত ভাষা সব জিনিসকে নিজের ভাষায় নিয়ে আসতে পারে না কেন? এ ব্যাপারে আমাদের দক্ষ পরিকল্পনা ও দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে এটা সুস্পষ্ট। ফরাসি বা চীন ভাষায় দেখা যায় ‘কম্পিউটার‘ বা ‘মোবাইল’ এমন পণ্য এবং নাম বাজারে প্রবেশের সাথে সাথে আলাদা ফরাসি শব্দ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এবং সে শব্দগুলো পত্রিকা ও লেখকদের বরাতে সাধারণের নিত্য ব্যবহৃত শব্দ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল। বাংলাদেশেও যে এটা করা যেতো এমনটাই লেখকের অভিমত।
 
একটা জিনিস নিশ্চিত কোন ভাষা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে না পারলে শুধু সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আর সাহিত্যের প্রভাব দিয়ে বেশিদিন টিকতে পারবে না। আমরা যদি আমাদের প্রতিবেশি দেশ ইনডিয়ার দিকে খেয়াল করি দেখবো কিভাবে হিন্দি সিনেমা, গানের মাধ্যমে হিন্দি শুধু সাংস্কৃতিক আদান-প্রাদনই করছে না বরং পুরো বিশ্ব থেকেই ব্যাপক টাকাকড়ি কামাচ্ছে। এই বিশ্বায়নের যুগে যেকোন ভাষাই তার সক্ষমতার মাধ্যমে সেই মর্যাদা অর্জন করতে পারে। এটা অবশ্য কেউ কাউকে দেয় না, অর্জন করে নিতে হয়।
 
বাংলা ভাষাকে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে কি করতে হবে সেটা বলতে গিয়ে শিশির ভট্টাচার্য্য বলেন- ‘বাংলা ভাষাকে যারা অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চান তারা আপাতত নিচের চারদফা কর্মসূচি নিয়ে এগোতে পারেন। কানাডার কুইবেক প্রদেশের পার্লামেন্টে ১৯৭৪ পাস হওয়া ফরাসি ভাষা আইন ১০১-এর আলোকে এই চার দফা রচিত হয়েছে।
১. যে কোনো পণ্য বা সেবার বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে;
২. সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মাধ্যম হবে শুধুই প্রমিত বাংলা। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ইংরেজি (এবং সম্ভব হলে আরবি, চীনা, জার্মান, ফরাসি ইত্যাদি ভষা) শেখানোর ব্যবস্থা থাকবে (এর ফলে বিদেশমুখী জনগণের ভাষাপ্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে);
৩. ১৯৮৭ সালের বাংলা প্রচলন আইন কার্যকর করতে হবে। যাবতীয় অফিস ও আদালতের কাজের ভাষা হবে বাধ্যতামূলকভাবে প্রমিত বাংলা। কোনো অফিস বা আদালতে বাংলা ভাষায় সেবা পাওয়ার অধিকার যে কেউ দাবি করতে পারবে;
৪. অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনের দাবির সপক্ষে জনমত গঠন করতে হবে।
উপরের চার দফা কর্মসূচী ঠিকঠাকমতো বাস্তবায়িত করতে পারলেই বাংলাভাষার অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যাবে। ‘ (পৃষ্ঠা ৮৩-৮৪, বাংলা ভাষা প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান)
 
ভাষাদূষণ নিয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সেলিনা হোসেন বা অন্য পণ্ডিতদের অহেতুক ভয়কে নাকচ করে দিয়ে লেখকের যুক্তিযুক্ত এবং ভাষাতাত্ত্বিকসুলভ জবাবটা হচ্ছে এমন- ‘ভাষাদূষণের ধারণা মূলত একটি কুসংস্কার। শব্দমিশ্রণ ভাষার দূষণ নয়, বরং সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। একাধিক ভঙ্গিতে বাংলা বলা ও কোনো দূষণ হতে পারে না, কারণ ভাষার উচ্চারণ-বৈচিত্র্য থাকাটাই স্বাভাবিক।...সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা কোনো প্রকারে অসুখে ভুগছে না। বাংলা ভাষার স্বাস্থ্য আপাতত চমৎকার!’ (পৃষ্ঠা ৮৯)
 
সাবিদিন ইব্রাহিম
লেখক ও অনুবাদক
sdibrahim385@gmail.com
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close