শুক্রবার,  ১৯ অক্টোবর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৬, ১৯:৪৩:৫৮

নজরুল নিঃস্ব হয়ে পরাধীন ভারতের অগ্নিসন্তানে পরিণত হন

ড. তাহা ইয়াসিন
কলকাতায় ফিরে নজরুল থাকবেন কোথায়? কলকাতা শহরে না আছে কোনো আত্মীয়স্বজন, না আছে নিজের বাড়ি। সেনাবাহিনীতে গিয়ে কলকাতায় যাঁদের সঙ্গে চিঠিপত্র লেনদেন হতো, তাঁরাই সেদিন পর্যন্ত তাঁর ঠিকানা। তাঁদের একজন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। থাকেন মেসে। আরেকজনকে চেনেন, তিনি কমরেড মুজফফর আহমদ। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হওয়ায় তিনি ব্রিটিশের চক্ষুশূল ছিলেন। এ কারণে প্রায়ই তাঁকে জেলে যেতে হতো। তাঁরও যে একেবারে ভালো বাড়ি-ঘর ছিল, তা নয়। তিনি থাকেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার অফিসে। কিন্তু নজরুল এখন অনেক শক্তপোক্ত মনের সৈনিক। গোটা কলকাতা তার থাকার স্থান। জায়গা একটা হবেই। কলকাতা থেকে মোজাম্মেল হকও নজরুলকে চিঠি লিখে সাহিত্য সমিতির অফিসে ওঠার আমন্ত্রণ জানান। করাচির সেনাবাহিনী যখন ভেঙে দেওয়া হয়, সে সময় নজরুল মোজাম্মেল হককে এক পত্রে লেখেন, ‘আমাদের সেনানিবাস ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমি বাঁধনহারা, আমার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কোথায় যাব কিছুই ঠিক করতে পারছি না।’ জবাবে মোজাম্মেল হক লেখেন, ‘আপনি করাচি হইতে সোজা কলিকাতার ৩২ নং কলেজ স্ট্রীটস্থ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে আসিয়া উপস্থিত হন। সেখানে আমার একটি বিশ্রামের কামরা আছে। সেখানে আপনাকে থাকিতে দিব।’
 
মার্চ মাসে করাচির সেনাবাহিনী যখন ভেঙে দেওয়া হয়, তখন নজরুল কলকাতায় ফিরে এসেও ওঠেন শৈলজানন্দের মেসে। শৈলজানন্দের মেসে তার থাকার ব্যবস্থা না হলে শৈলজানন্দ নজরুলকে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটের মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে মুজফফর আহমদের কাছে পৌঁছে দিয়ে যান। মুজফফর আহমদের এখানে এলে, সৈনিকজীবন কাটিয়ে নজরুল এসেছেন, সে জন্য সবার আগ্রহ ছিল তাঁর এই কোলবালিশের ন্যায় ব্যাগে কী কী আছে, তা দেখার জন্য। বোঁচকা খোলা হলে তাতে পাওয়া যায় লেপ, তোষক, পোশাক-পরিচ্ছদ। অর্থাৎ সৈনিকের পোশাকে। এ ছাড়া ছিল শেরওয়ানি, ট্রাউজার্স ও কালো উঁচু টুপি। একটি দুরবিন (বাইনোকুলার)। কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপির বই। আরও ছিল ইরানের কবি হাফিজের একটা বই। প্রথম রাতেই মুজফফর আহমদের অনুরোধে বসে গানের আসর। নজরুল গান একটি হিন্দুস্তানি গান, বিরহের গানÑ‘পিয়া বিনা মোর হিয়া না মানে বদরী ছায়ীরে।’ নজরুলের গানের আসর খুব জমেছিল। কারণ তাঁর গানে ছিল অপূর্ব দরদ ও প্রাণময়তা। সাহিত্য সমিতির অফিসেই আস্তানা গাড়লেন নজরুল। মুজফফর আহমদ আর আফজাল-উল হক দুজনের আন্তরিক সৌহার্দ নজরুলকে সাহিত্য সাধনায় স্থিরতা দেয়। সাহিত্য সমিতির অফিসে নজরুলের জীবনযাত্রা সম্পর্কে মোজাম্মেল হক তাঁর স্মৃতিচারণায় জানান, ‘নজরুল ইসলামের ছাদফাটা হাসি, রাতদিন হারমোনিয়াম বাজানো এবং গান ও নাচাকুদা শুরু হইয়া গেল। সে কী ভাষণ ব্যাপার যেন প্রতিদিন ভূমিকম্প হইতে লাগল।’
 
নজরুল কলকাতায় ফিরে এসে পেলেন এই মিত্রদের। বিশেষ করে কমিউনিস্ট নেতা মুজফফর আহমদ নজরুলকে আত্মার আত্মীয় করে নিলেন। সে সময় সাহিত্য সমিতির অদূরে থাকতেন কাজী আবদুল ওদুদ। তিনি নজরুলকে প্রীতিভাজনে আবদ্ধ করেন। তিনি নজরুলের সে সময়ের শারীরীক-মানসিক অবস্থা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘কলকাতায় যখন নজরুল এলেন, তাঁর বয়স বিশ বছর। গড়নে নাতিদীর্ঘ কিন্তু সুঠাম, ললিতশ্যাম, চোখ দুটি কিছু বেশি চঞ্চল ও উজ্জ্বল ¯েœহ-মমতা-কাড়ার অপূর্ব জাদু তাতে, কণ্ঠে অশ্রান্ত গান, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের যৌবনের প্রেমের গান আর কারণে অকারণে প্রাণখোলা উচ্চ হাসি। সবাই জানেন নজরুল জনপ্রিয় হয়েছিলেন অতি অল্পদিনে, তার মূলে ছিল তাঁর এই প্রাণপ্রাচুর্য ভরা মোহন নবীনতা।’
 
সাহিত্য সমিতির অফিসে কদিন থেকে নজরুল ১৯২০ সালের এপ্রিল মাসে মাকে দেখার জন্য চলে যান মায়ামমতায় জড়ানো প্রিয় জন্মস্থান চুরুলিয়া। এখানে কয়েক দিন থাকেন। এই সময় তাঁর মায়ের সঙ্গে মান-অভিমান হয়। হয়তো দারিদ্র্যের কারণেই। কিন্তু নজরুল গবেষক আজহারউদ্দীন খান এই মান-অভিমান সম্পর্কে বলেন, ‘পিতৃব্য অর্থাৎ নজরুলের চাচা বজলে করিমের সঙ্গে তাঁর মায়ের দ্বিতীয়বার বিয়ে হওয়াই ছিল এর কারণ।’ নজরুল চুরুলিয়ায় এরপর সুস্থ থাকাবস্থায় আর কোনোদিন যাননি। সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসার পরই নজরুল জীবনকে বুঝতে শিখলেন কারণ এর আগের জীবন ছিল ছন্নছাড়া অনিশ্চয়তায় ভরা। আট বছর বয়সে হারিয়েছেন বাবা ফকির আহমদকে আর যৌবনে যখন একটু জীবনের আলোর ঝলকানি দেখতে পান, তখন হারান মাকে। মায়ের সঙ্গে এই চিরবিচ্ছেদ নজরুলকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছিল। এ জন্য পরবর্তী জীবনে তিনি অনেককে মা ডেকেছিলেন। সেটা এই মা হারানোর বেদনা থেকেই। সাহিত্যজীবনে প্রবেশ করেন শূন্য হাতে, শূন্য হৃদয়ে। একই রকম শূন্য হৃদয়ে সাহিত্যজগতে রাশিয়ার বিখ্যাত সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কিকেও প্রবেশ করতে দেখা যায়। তাঁরও পিতা ম্যাক্সিম সাভাতিয়োভিচ পেশকও মারা যান গোর্কির বয়স যখন চার-পাঁচ বছর। গোর্কিকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর মা ভারভারা ভাসিলিরেভনা কাশিরিনা গিয়ে ওঠেন নানার বাড়িতে। সেখানে থাকাবস্থায় গোর্কির বয়স যখন ১০-১১ বছর, তখন তাঁর মা তাঁকে ছেড়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এতে গোর্কির জীবনে নেমে এসেছিল দুঃখের অমানিশা। মাতাল নানা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে গোটা রাশিয়া পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ান গোর্কি। হোটেলবয় থেকে শুরু করে জাহাজের বাসন মাজার কাজও তিনি করেন। জীবনকে দুঃখের অকুল সাগর সাঁতরে পার করে নিয়ে যান বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিকদের কাতারে। নজরুলও সবাইকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পরাধীন ভারতের অগ্নিসন্তানে পরিণত হন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শাসন-শোষণের ভিত কাঁপিয়ে দিয়ে নজরুল বাঙালির মাথা উঁচু করে দেন এবং বিদ্রোহী কবির শিরোপায় ভূষিত হন।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close