রোববার,  ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৬, ১৭:০৭:৪৭
সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ আলী

‘আমার বিবেক ভেতর থেকে সায় দেয়নি মানুষ হত্যা করার’

প্রখ্যাত মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকসাইড মোহাম্মদ আলীর এই ইন্টারভিউ ধারণ করে ভিডিওতে ১৯৮৯ সালে, যখন মোহাম্মদ আলী লড়তে শুরু করেছেন পারকিনসন নামের জটিল রোগের সঙ্গে। সে সময় তাঁর ক্যারিয়ারও ছিল প্রায় শেষের দিকে। এ ইন্টারভিউটি ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে লিখিত আকারে। মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে কথা বলেন স্যাম পোলার্ড ও জুডি রিচার্ডসন। এ সংখ্যায় তার শেষ কিস্তি প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন রাফসান গালিব।
 
১৯৬৬ সালে মিয়ামিতে প্রেস কনফারেন্সে আপনি বলেছিলেন, ‘ভিয়েতনামে যুদ্ধ যত দীর্ঘই হোক, আমাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকলে একই কথা বারবার বলব, আমি ভিয়েতনামিদের সঙ্গে কোনো ঝামেলায় নাই।’ কেন সে কথা বলেছিলেন?
কারণ, সে সময় আমি দেখলাম তাঁরা ভুল পথে আছে, যুদ্ধ করাটা ছিল অন্যায্য। এবং আমার বিবেক ভেতর থেকে সায় দেয়নি মানুষ হত্যা করার। এর জন্য আমি জেলে যেতে রাজি ছিলাম। এই ভুল যুদ্ধ আমেরিকাকে বিপদগ্রস্ত করে ফেলছিল। শুধু একমাত্র আমি নই, এক মিলিয়ন মানুষ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। এর জন্য অনেকেই  জেলে গিয়েছিল। যদিও এ কারণে আমিই বিখ্যাত হয়ে গেলাম শুধু, বেশি প্রচার পাওয়ার কারণে। আমি সঠিক ছিলাম। আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলাম। এখন তাঁরা স্বীকার করছে, সেটা আসলেই অন্যায্য ছিল।
 
কেমন অনুভব করলেন, যখন দেখলেন অন্য কৃষ্ণাঙ্গরা ভিয়েতনাম গেল যুদ্ধ করতে এবং পরবর্তী সময়ে আমেরিকায় আবার রেসিজম ফিরে এল?
খারাপ লাগছিল এবং দুঃখ অনুভব করছিলাম তাদের জন্য। তাদের বোঝাতে অনেক লড়াই করলাম। আশা করেছিলাম আমার মতো করে তারা উপলব্ধি করবে। তারা যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর স্বীকৃত হলো না এবং আমাদের স্বাধীন থাকতে দিল না। আমি জানতাম, তারা অচিরেই নিজেদের আবিষ্কার করতে পারবে। আসলে আমার খুব খারাপ লাগছিল তারা যুদ্ধে গিয়েছিল, অনেকেই মারা গেল, অনেকের অঙ্গহানি হলো। যখন তারা ফিরে এল, বুঝতে পারল যুদ্ধে যাওয়াটা তাদের জন্য ভুল ছিল। আমি তখন বলেছিলাম, ‘আমেরিকা যদি বিপদগ্রস্ত হয় এবং সত্যিকার অর্থেই কোনো যুদ্ধ আসে, যদি আমরা আক্রান্ত হই, তাহলে আমি ফ্রন্ট লাইনেই থাকব। কিন্তু সে যুদ্ধটা সঠিক ছিল না।
 
কেসিয়াস ক্লে থেকে মোহাম্মদ আলী- এ নাম পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল আপনার কাছে?
তোমার নাম স্যাম পোলার্ড, যেটা শ্বেতাঙ্গ ও ইউরোপিয়ান নাম। ২০০ বছর আগে মি. ক্লের অধীনে কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল ক্লে প্রপার্টি। একইভাবে মি. জোনসের অধীনে জোনস প্রপার্টি। আমাদের সঙ্গে এই ক্লে, জোনস নামগুলো হচ্ছে তাদের অধীনে দাসদের চিহ্নায়িত করার জন্য তাদের সম্পত্তি হিসেবে। কিন্তু এখন তো তুমি ফ্রি, তোমার তো ক্লে কিংবা জোনস নাম ধারণ করার দরকার নেই। এখানে মোহাম্মদ আলী নামে বেশি কেউ নেই, যারা পৃথিবীতে অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব। সুগার রে ভালো, ফ্লয়েড পিটারসনও ভালো। কিন্তু এটা ছিল মোহাম্মদ আলী। পুরো আফ্রিকা, ইথিওপিয়া, সিরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, সৌদি আরব জুড়ে এ নামের অস্বিত্ব ছিল। যখন পৃথিবী ভ্রমণে বের হলাম, তখন অনেককে পেলাম মোহাম্মদ আলী নামে। যখন আমি মোহাম্মদ আলী নামে লড়তে, নামের রিংয়ের কোনায় ফ্লয়েড পেটারসনকে বললাম এ কোনায় আমি  মোহাম্মদ আলী। তখন সারা দুনিয়ায় মানুষ তাদের পরিচিত এ নামের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার মানে, আমেরিকাতেও একজন মোহাম্মদ আলী আছে, যে লড়াই করছে! আমার বাবার নাম ছিল কেসিয়াস ক্লে। তাঁর বাবার নামও ছিল কেসিয়াস। আমার দাদার দাদা, যিনি মূলত দাস ছিলেন, কেনিটাকি থেকে আসা মূল কেসিয়াস ক্লের অধীনে। কিন্তু এখন আমরা দাস নই। এটি আসলে কেনটাকি থেকে শুরু হওয়া পুরোনো এক নাম অনুসারে অনেক মানুষের নাম। এখনো কিছু আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের নাম ধারণ করে। আমি সত্যকে ভালোবাসি। তুমি গির্জা, মসজিদ কিংবা সিনাগগে যাও। সেটা আমার বিষয় নয়। সিরিয়া, আফ্রিকা যেখানেই যাও, জিজ্ঞাসা করা হলে তুমি যদি তোমার নাম বলো জর্জ ওয়াশিংটন, তখন তারা বলবে তুমি নিগ্রো। এ বিষয়ে কেউ তোমার সঙ্গে আপস করবে না। কারণ তুমি কালো এবং তোমার নাম ইউরোপিয়ান। তার মানে এটা তোমার নাম নয়। আমরা যখন আমেরিকার দাস হলাম, তারা তখন আমাদের নামটি নিয়ে নিল। এরপরও আমাদের কিছু মানুষ এখনো মানসিকতায় দাস থেকে গেছে। কেন তোমার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্য নিজেদের মতো করে নাম পছন্দ করবে না। আমার মেয়ে রাশিদা, সুইলেন মেরি নয়। একজনের নাম জামিলাহ আর একজন লাইলা, অন্যজন হানা। আরেকজন মিয়া কালিয়াহ। এ ধরনের সুন্দর নামই আমাদের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। যার কারণে আমি আমার নাম পরিবর্তন করেছি।
 
আপনি কোন ধরনের রোল মডেল ও পরিকল্পনা তরুণ কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য উপস্থাপন করলেন?
প্রথমত, আমি নিজেকে নিয়ে ভাবতাম না। ভাবতাম আমার মানুষের কথা, শেতাঙ্গ মানুষের কথা, সব মানুষের কথা। ‘আই এম দ্য গ্রেটেস্ট, আই এম প্রিটি’Ñএ কথা বলতাম কারণ তারা আমাকে টিভিতে দেখত। একটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু কিংবা মানুষ এটা ভাবতে পছন্দ করত আমরা আমাদের সেরাকে পেয়ে গেছি। দেখো, নিজেকে সে কীভাবে চালিত করছে। কারণ, তারা যখন দোকানে যেত, দেখত, হোয়াইট উওল সিগারেট, হোয়াইট সোয়ান সোপ। যিশু সাদা, দেবতারা সাদা। এমনকি সিনেমাতে নায়ক যে ঘোড়াতে চড়ে, সেটাও সাদা। বেশির ভাগ সময় নায়ক নিজেও সাদা। এমন অবস্থায় আমি বললাম, আমিই সর্বকালের সাদা। একজন কালো মানুষ এ কথা বলছে। এভাবে তারা যদি সবাই বলে, তাহলে আমিই এর জনক। কারণ, এই আইডিয়াটা আমিই প্রমোট করি বক্সিংয়ের মাধ্যমে। যখন ছোট ছিলাম, কিছু বলতে পারতাম না। এখন ভালো লাগছে, আমার পক্ষে অনেক মানুষ এসব কথা বলার জন্য এবং আমি এখনো সর্বকালের সেরা।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close