শুক্রবার,  ১৯ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৬, ১৯:২২:৪৭

‘পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে বাজার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন’

গোলাম রহমান, সভাপতি কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে কথা বলেছেন সাম্প্রতিক দেশকাল-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নূরুর রহমান
 
পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে প্রতিবারের মতো এবারও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, রোজায় আরও মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে। এর মূল কারণ কী?
আপনার সঙ্গে আমি একমত পোষণ করতে পারছি না। আমার পর্যবেক্ষণ কিছুটা ভিন্ন। গত দুই-তিন বছর পবিত্র রমজান মাসের সময় কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের তেমন ঊর্ধ্বগতি ঘটেনি। সব জিনিসপত্রের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। এর প্রধান কারণ সরকার সফলভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিল। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের একটা সমঝোতা লক্ষ করা গেছে। কিন্তু চলতি বছর রমজান মাস আসার অনেক আগে থেকেই কিছু জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা সরকারের চাপ মোকাবিলা করতে এবার তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছেন। তা ছাড়া মুক্তবাজার অর্থনীতিও মূল্যবৃদ্ধির একটা কারণ। দেশের উৎপাদন বাড়ছে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। ফলে মানুষের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা অনেক বেড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে।
 
মূল সমস্যাটা কোথায়, সরকার বারবার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে কেন?
আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতি বিশ্বাস করি। এই নীতি অনুসারে সরকার বাজারে হস্তক্ষেপ করবে না এবং বাজার ভোক্তাবান্ধব করতে হলে সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করার জন্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নব্বইয়ের দশক থেকেই আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতির চর্চা করছি। আমাদের এখানে বাজার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল ছিল বা একেবারেই ছিল না। সে কারণে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অনেকটা মনোপলি ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মাত্র কয়েকজন আমদানিকারকের হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বিশ^বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমলে সেই সুফল আমাদের দেশের ভোক্তারা পাচ্ছে না। এই আমদানিকারকেরা প্রতিযোগিতা না করে বাজারটাকে ভাগ করে নিয়েছে। প্রতিটা পণ্যের আমদানিকারকদের একটা করে জোট গড়ে উঠেছে। আর জোটগুলো একধরনের সিন্ডিকেটের জন্ম দিয়েছে। এসব সিন্ডিকেট এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার এখানে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করেনি। তাই দাম বাড়লে এসব জোটের নেতারা দাম কমানোর অনুরোধ করেন। এটা সমঝোতার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার একটা চেষ্টা। কিন্তু প্রয়োজন ছিল একটা নীতির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, সরকার তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
 
যদি তা-ই হয়, সরকার কেন ব্যবসায়ীদের জোট ভেঙে অবাধ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করছে না?
সরকার চাইছে দেশের অর্থনীতির উন্নতি হোক। দুই দশক ধরে মুক্তবাজার অর্থনীতির চর্চা করার অভিজ্ঞতা হলো মানুষ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির নেতিবাচক দিক হলো দেশের মানুষের আয়বৈষম্য অনেক বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার অনেকটাই জিম্মি বা অসহায় হয়ে পড়ে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ দরকার। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, ব্যবসায়ীরা এখন রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করছেন। আমাদের জাতীয় সংসদ শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। মুনাফা অর্জন ব্যবসার মূল কথা হলেও ব্যবসায়ীরা এখন অপ্রতিরোধ্যভাবে সব ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে অতি মুনাফার জন্য আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন।
 
টিসিবিকে শক্তিশালী করতে বাধা কোথায়? সরকার কেন টিসিবির মাধ্যমে ব্যাপক হারে পণ্যসামগ্রী জনগণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে না?
টিসিবিকে দিয়ে ব্যবসা করার কোনো নীতি সরকারের নেই। এ ছাড়া টিসিবির সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও আছে। কোনো জিনিসের যখন মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, সেই পণ্য আমদানি করার সিদ্ধন্ত গ্রহণে এবং আমদানি করতে করতে পণ্যের দাম কমে যায়। টিসিবিকে শক্তিশালী করতে হলে এটাকে সারা বছর ব্যবসা করার নীতিতে আসতে হবে। অথবা সরকার যদি ব্যবসা করতে না চায়, তাহলেও অন্তত লাভও নয়, লোকসানও নয় এমন নীতিতে আসতে হবে। আবার ব্যবসায়ীদের দিক থেকেও টিসিবিকে শক্তিশালী করার বিপক্ষে মত আছে। তারা বলেছে, সরকার ব্যবসা করবে কেন? ব্যবসা করবেন ব্যবসায়ীরা। তবে আমি মনে করি বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবি সরকারের একটা অস্ত্র।
 
সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা বরাবরের মতো এবারও বলছেন, দ্রব্যের দাম বাড়তে দেওয়া হবে না, কিন্তু দাম বাড়ছেই। এটাকে কি সরকারের ব্যর্থতা মনে করছেন?
সরকারের উচিত হবে কারা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অবৈধ মজুতদারি গড়ে তুলেছে বা দাম বাড়িয়েছে, তাদের খুঁজে বের করা এবং শাস্তি দেওয়া। যদি এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হয়, তাহলে অন্যরা এটা করতে সাহস পাবে না। আর যেসব জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, টিসিবির মাধ্যমে সেসব পণ্যের সুলভ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ক্রেতাদেরও কিছু করণীয় আছে। কোনো জিনিস বেশি না কিনে যা প্রয়োজন সেটুকুই কিনতে হবে, অতিরিক্ত কেনা যাবে না। আর যেসব পণ্যের দাম বাড়বে, সেগুলো আপাতত না কিনে সংযত হওয়া দরকার।
 
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশে বা ক্যাবের পক্ষ থেকে আপনারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন?
ক্যাব একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। ক্যাব ব্যবসা করে না, রাজনীতিও করে না। এটি প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করে। মজুতদারি, কালোবাজারি, ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে আমরা সব সময় সোচ্চার। গ্যাস, বিদ্যুৎ বা বাসের ভাড়া বাড়লে আমরা প্রতিবাদ করি। পাশাপাশি ভোক্তাসাধারণকে আমরা সচেতন করতে কাজ করি।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close