সোমবার,  ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৬, ১৪:৩২:১৩
বিবি রাসেল এক ফ্যাশন-ভাবুক

‘স্বপ্ন দেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ’

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই ফ্যাশন ডিজাইনার ও মডেল ১৯৭৬ সালে লন্ডন স্কুল অব ফ্যাশন থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছিলেন। তখন থেকে ফ্যাশন ডিজাইনের খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি বিশ্বের নামকরা সব ব্র্যান্ডের মডেল হিসেবে ধাপে ধাপে পরিণত হন সুপার মডেলে। ঝলমলে ক্যারিয়ার ও বিশ্বময় ফ্যাশনে তাঁর ব্যাপক সুনাম ও চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন দেশের অবহেলিত তাঁতশিল্পকে। বিবি রাসেলের ফ্যাশন ও কাজের ধরন আন্তর্জাতিকভাবে এতটাই সমাদৃত যে তাঁকে নিয়ে সিলেকন সিনার্জী নামে এটি প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি হয়েছে। ২০১১ সালে ইতালিয় বায়োগ্রাফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে ছবিটি অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ডও পায়। সাম্প্রতিক দেশকাল-এর সঙ্গে গত সপ্তাহে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয় তাঁর। তারই কিছু চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সুলতান মাহমুদ সোহাগ
 
শুরু করতে চাই ‘বিবি রাসেল’ নাম নিয়ে। এই নামের সঙ্গে কি কোনো ঘটনা জড়িয়ে আছে?
বিবি আমার ডাকনাম। ভালো নাম ছিল মাসুমা। কিন্তু আমার সবকিছু যেমন পাসপোর্ট, সার্টিফিকেট ডাকনামেই করা। এটা বাবার দেওয়া নাম। ছোটবেলায় নামটা আমার ভালো লাগত না। কিন্তু বাইরে পড়তে আসার পর দেখলাম বিবি নামটা সবাই খুব সহজে বলতে পারছে। তখন থেকে এ নাম আমার কাছেও পছন্দের হয়ে ওঠে। আর রাসেল হচ্ছে আমার বিবাহিত নাম।
 
একজন উদ্যোক্তা, একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং একজন সাবেক মডেল। তিন পরিচয়ের মধ্যে কোনটিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
ফ্যাশন ডিজাইনার। যেটা এখন করছি। ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে আমার পড়াশোনা। এটা আমার জীবন। নিজের ইচ্ছাতেই এ পেশায় এসেছি। আমার সাফল্যের পেছনে দেশের মানুষের অবদান সব চেয়ে বেশি।
 
বাংলাদেশ ও প্রাচ্যের ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে অনেক দিন ধরে কাজ করছেন। লোকজ ফ্যাশনকে আধুনিকায়ন করেছেন। মুসলিম পরিবারের সদস্য হয়েও ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহ জন্মাল কীভাবে?
আমরা তিন বোন। মা আমাদের পোশাক বানাতেন। মা যা বানিয়ে দিতেন আমার দুই বোন খুশি হতেন। তবে আমি ঘ্যান ঘ্যান করতাম। বাবা আমাকে দশ বছর বয়সে সেলাই মেশিন কিনে দেন। তখন থেকে আমার কাপড় আমিই বানাতাম। মুসলিম পরিবারের কথা বলতে গেলে মা আমাদের নামাজ পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু তার মানে এটা না যে আমি ফ্যাশনে পড়ব, তাতে বাধা দিয়েছেন।
আমার জন্ম চট্টগ্রামে, মায়ের বাড়ি ঢাকা, আর বাবার বাড়ি রংপুরে। আমি সারা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছি। আমাদের ঢাকার বাড়িতে অনেক গ্রামের মানুষ আসত। আমি তাদের লুঙ্গি-গামছা পরে ঘুরে বেড়াতাম, তখন জিজ্ঞাসা করতাম, এগুলো কে করেছে? তারা বলত, গ্রামের মানুষ বানিয়েছে। আমি তাদের সঙ্গে মিশতাম। তাদের কাছ থেকে শিখতাম। আমি স্বপ্ন দেখতাম। স্বপ্ন দেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যত বড় হয়েছি আমার স্বপ্ন ততই পরিষ্কার হয়েছে। সবকিছুর মূলে রয়েছে আমার বাবা মা।
 
লন্ডন স্কুল অব ফ্যাশনে পড়াশোনা করেছেন। বিভিন্ন দেশে প্রায় ২০ বছর ধরে মডেলিং করেছেন। আলো-ঝলমলে সেই ক্যারিয়ার ছেড়ে বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত কেন নেন?
নিজের ইচ্ছাতেই এসেছি। আমার স্বপ্ন এটাই ছিল। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বপ্নও বড় হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি কোনো কিছু করতে হলে নিজেকে সেভাবে তৈরি করতে হয়। আমি এটাই শিখেছি ওখান  থেকে। আমি ভাবিনি মডেলিং করব। আমি দেখতে মোটেও ভালো না। কিন্তু ওই সব দেশ আমাকে মডেল বানিয়েছে। মডেলিং আমাকে পরিণত করেছে। মডেলিং না করলে ফ্যাশন সম্পর্কে এতকিছু হয়তো জানতে পারতাম না। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারতাম না। মডেলিংয়ের মাধ্যমেই মিডিয়া আমাকে বিবি বানিয়েছেন। আর আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে গ্রামের মানুষ। আমার একটা স্লোগান আছে, ‘উন্নয়নের জন্যই ফ্যাশন’।
 
দেশে আসার পর এ চলার পথ কেমন ছিল?
১৯৯৪ সালে দেশে আসি। দেশে আসার পর প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছি। অনেক মানুষের সঙ্গে মিশে বড় এনজিওগুলো কীভাবে কাজ করছে, সেগুলো দেখতাম, জানতাম। তখন আমার প্রধান কাজ ছিল অন্যরা কীভাবে কাজ করে, তা দেখা। বাচ্চা কোলে শুধু সংসার করতে আসিনি। দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে এসেছি।
 
পশ্চিমা ফ্যাশন বাদ দিয়ে কাজের ধরন হিসেবে তাঁত বোনা কাপড়টাই কেন বেছে নিলেন?
তাঁত দিয়ে কিন্তু আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি। এক টুকরো মসলিন দিয়ে। পৃথিবীর আর কোনো দেশ এটা পারবে না। আমাদের তাঁতিরা মন দিয়ে কাজ করেন। তাঁরা অনেক ভালো করবেন। খেয়াল করে দেখবেন, প্রত্যেক মানুষই তাঁতের শাড়ি ব্যবহার করে। সুতরাং, এই সময় কিন্তু আমাদের। তাই তাঁদের নিয়ে কাজ করা উচিত।
 
গামছা ও লুঙ্গি দেশের বাইরে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছেন আপনি। মোটামুটি সফলও হয়েছেন। এখন র‌্যাম্প শোতে ইয়াং মডেলরা গামছা বা লুঙ্গি পরে মডেলিং করেন। তাঁদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা দেখেছেন নিশ্চিয়ই?
অবশ্যই। আমাদের তরুণদের কাছে গামছা অনেক জনপ্রিয়। বিভিন্ন উৎসবে তাঁরা গলায় গামছা পেঁচিয়ে ঘুরে বেড়ান। সব ধরনের মানুষ কিন্তু গামছা ব্যবহার করে। কোনো একটি শিল্পকে বাঁচাতে হলে তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ তাঁরাই বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরেন।
 
কতজন তাঁতি এখন আপনার সঙ্গে কাজ করছেন? তাঁদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগটা হয় কীভাবে?
আমি মনে করি সমগ্র বাংলাদেশ আমার। আমি সারা দেশ চষে  বেড়িয়েছি। সবার সঙ্গে মিশেছি। কোনো তাঁতিই আমার গোলাম নন। আমি নিজে তাঁদের সঙ্গে কাজ করছি। কাজ দিলেই তাঁরা কাজে বসেন। তাঁদের কাজ দেওয়া মানে একটা পরিবারকে কাজ দেওয়া। আমি তাঁতিদের বাঁচাতে চাই।
 
১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁতশিল্পকে কতটুকু আধুনিকায়ন করতে পেরেছেন বলে আপনি মনে করেন?
খেয়াল করে দেখবেন, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন উৎসবে সাধারণ মানুষ কিন্তু দেশীয় পোশাকই পরছে। একটা শ্রেণীর মানুষ পরছে না। আমি বিশ্বাস করি, ডিজাইনাররা আরও একটু যতœ নিয়ে গবেষণা করে যদি নিত্যনতুন কাপড় বানাতে পারেন, তাহলে তারাও পরবে একসময়। তবে আরও একটু সময় লাগবে। আর গবেষণা আমাদেরই করতে হবে। তা ছাড়া আমার মা থেকে আমি কিন্তু আলাদা পোশাক পরি। আবার আমার থেকে আমার মেয়ে আলাদা পোশাক পরবে। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশে গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। আমি মনে করি, ফ্যাশন কোনো শ্রেণীর জন্য নয়। ফ্যাশন সবার জন্য। এই ভাবনা থেকে এগোতে হবে।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close