মঙ্গলবার,  ১৬ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৬, ০৯:৪৩:৩৭

‘পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে বলীখেলার ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে’

বলীখেলা চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্য। বৈশাখ মাসে এখানকার শহর ও গ্রামে বলীখেলা হয়। দিদারুল আলম, চট্টগ্রামে একনামে পরিচিত ‘দিদার বলী’ হিসেবে। ১৬ বছর ধরে বিভিন্ন বলীখেলায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী তিনি। পেশায় ব্যবসায়ী দিদার বলীর জন্ম কক্সবাজার জেলার রামুর মিঠাছড়ি ইউনিয়নে। ১৬ বছর বয়স থেকে বলীধরা খেলে আসছেন। ‘জব্বারের বলীখেলা’র ১০৭তম আসর উপলক্ষে তাঁর সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই খেলা নিয়ে কথা বলেছেন সাম্প্রতিক দেশকাল-এর রাফসান গালিব ও মোহাম্মদ কাইছার
 
বলীখেলাটা প্রথম কীভাবে এখানে শুরু হয়?
ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, দেখে এসেছি, এটা আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। বৈশাখ মাস এলেই এখানে মানুষ এটা খেলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে ‘জব্বারের বলীখেলা’ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে লালদিঘীর ময়দানে এটা চালু হয় এবং এটা এখনো হয়ে আসছে। এবার ১০৭তম আসর বসেছে এখানে।
 
আপনি দীর্ঘদিন ধরে এ খেলায় চ্যাম্পিয়ন হন। কবে থেকে বলীখেলার প্রতি আপনার আগ্রহ সৃষ্টি হলো?
আমার এলাকা রামুতে প্রতি গ্রামে বৈশাখের দিনে একাধিক মেলা-বলীখেলা হতো। স্কুলে যেতে-আসতে আমরা এসব দেখতাম। তখন বলীখেলার প্রতি মানুষের আকর্ষণ ও ভালোবাসা দেখে আমারও ইচ্ছা হতো- আমিও খেলব। ছোটবেলায় যেসব খেলা হতো সেগুলো দেখতে দেখতে এ খেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গিয়েছি। তখন থেকেই চিন্তা করতাম কীভাবে খেলব, কৌশলগুলো আয়ত্ত করব, শক্তিকে ধরে রাখব। সাধনা করতে করতে ২০০১ থেকে আজ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন পর্যায়ে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী আছি। একবারও হারিনি। ১৬ বছরের বলীজীবনে একবারও কোথাও হারিনি। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে যেখানেই বলী ধরেছি, সেখানেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।
(তবে জব্বারের বলীখেলায় ১৩ বার অপ্রতিদ্বন্দ্বী থেকে এবার শামসু বলীর কাছে শিরোপা হারিয়েছেন তিনি, খেলার আগের দিনই দিদার বলীর সঙ্গে এ কথোকপথন হয়।)
 
শহরের এক জব্বারের বলীখেলা ছাড়া বাকি সব বলীখেলা হয় দক্ষিণ চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের অন্য অঞ্চলে এটা দেখা যায় না। কেন?
হ্যাঁ, এটা ঠিক বলেছেন। বৈশাখ মাসে দেশের অন্যান্য জায়গায় শুধু মেলা হয়। কিন্তু খেলাটা হয় না। আমাদের দক্ষিণ চট্টগ্রামে মেলার সঙ্গে বলীখেলাটা থাকেই। আরাকান রাজ্যেও এটা এখনো জনপ্রিয় খেলা। মুরব্বিদের মুখে শুনেছি, একসময় তো ওখান থেকে অনেক নামকরা বলী আমাদের এখানে খেলতে আসতেন, এখান থেকেও বলীরা বর্মায় খেলতে যেতেন।
 
চট্টগ্রাম জেলার নির্দিষ্ট কোন কোন জায়গায় বলী খেলা হয়, জানতে চাইছি-
শহর ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, পটিয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার, মহেশখালী, টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় বৈশাখী মেলার সঙ্গে এ খেলাটা প্রচলিত। কক্সবাজার জেলায় তো এ মাসে প্রায় দুই শর মতো খেলা হয়। বিভিন্ন ইউনিয়নে হয়। এসব জায়গায় বলীপাড়া আছে যেমন টেকনাফের হোয়াইক্যং, ট্যাংখালি, রামুর মিঠাছড়ি, উমখালী, জোয়ারে নালা ইত্যাদি। মহেশখালীতেও আছে অনেক বলীপাড়া। প্রায় ৩০০-এর মতো বলী আছেন এসব এলাকায়।
 
পূর্ববর্তী নামকরা বলীদের সম্পর্কে জানতে চাইছি। যাঁরা একসময় এ বলীখেলায় সুনাম কুড়িয়েছেন।
আজ থেকে ১৬ বছর আগে যখন আমি প্রথম বলী খেলতে নামি, তখন রামুতে নিয়মিত খেলতেন আমার মামা শ্রদ্ধেয় জহুরুল আলম বলী, রহীম বলী, জাকের বলী, নুরুল হক বলী, কাদের হুসন বলী। টেকনাফে ছিলেন সৈয়দ বলীর ছেলে আলম বলী, সিদ্দিক বলী, নুর মোহাম্মদ বলীর ছেলে আবুল কালাম বলী। টেকনাফের এঁরা আবার বংশপরম্পরায় বলী খেলেন। যদিও এখন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
 
একজন বলীর খাদ্যাভ্যাস কী রকম হয়? এ নিয়ে মানুষের অনেক কৌতূহল-
অবশ্যই আমাদের রুটিনমাফিক চলতে হয়। তা না হলে এই দেহশক্তি ধরে রাখা সম্ভব না। সকাল-দুপুর-রাতে তিনবেলা খাওয়াদাওয়া হয়। তবে ভাতের সঙ্গে থাকে দেশি মুরগি, দেশি কবুতর, শিং মাছ, মাগুর মাছ, কই মাছ; ডিম, কলা, দুধ এগুলো তো থাকেই। তবে সবকিছু দেশীয় ও ভেজালমুক্ত খাবার খেতে চেষ্টা করি। আর বিভিন্ন শারীরিক ব্যায়াম করতে হয় আমাদের। বিশেষ করে যোগব্যায়াম।
 
বলীখেলায় অনেক ধরনের কৌশল আপনারা অনুসরণ করেন, একেক কৌশলের আবার একেক নাম আছে। এবার সে রকম কিছু কৌশলের কথা বলেন-
কৌশল বলতে আঞ্চলিক ভাষায় আমরা ‘প্যাঁচ’ বলি। যেমন মাইট্যা প্যাঁচ, আড়াই প্যাঁচ, টাইক্যা প্যাঁচ, লাইল্যা প্যাঁচ-এ রকম আরও অনেক ধরনের প্যাঁচ আছে। এর মধ্যে লাইট্যা প্যাঁচ হচ্ছে এক কাঁধের ওপর হাত উঠিয়ে কান দিয়ে ঘুরিয়ে প্রতিপক্ষকে এমন টান দেবেন সে ৫-১০ ফুট দূরে গিয়ে পড়বে চিত হয়ে। আর আড়াই প্যাঁচ হচ্ছে হাতের সঙ্গে প্রতিপক্ষের হাত আর পায়ের সঙ্গে পা প্যাঁচিয়ে যখন টান দেবেন, সে তখন মাটিতে পড়ে যাবে।
 
বলীখেলা শেখার জন্য পেশাদার প্রশিক্ষক আছেন কি না?
বলী ধরা শিখতে আগে খেলাটা দেখতে হবে। এরপর কৌশল শেখার জন্য কারও কাছে যেতে হবে। প্রাক্তন বলীদের অনেকে শিষ্য বানায়, অনেকেই তাঁদের কাছে শিখতে যায়। আমিও এ রকম শিখেছি আমার মামা জহরুল আলম বলী, রহিম বলী, জাকের বলীর কাছে। একসময়কার বিখ্যাত খেলোয়াড় বোগা (বোবা) বলী কিছু তরুণদের শেখান। এ রকম টেকনাফ, মহেশখালীতে অনেকে আছেন। সিদ্দিক বলীও শেখান। তবে তরুণদের মধ্যে এ খেলার প্রতি আগের তুলনায় আগ্রহ কমে গেছে।
 
বলী খেলোয়াড়দের কোনো সংগঠন আছে কি না? আপনারা কি কুস্তি ফেডারেশনের সদস্য?
না, আমাদের কোনো সংগঠন নেই। থাকলে ভালো হতো, তাহলে এ খেলা সংরক্ষণের জন্য আমরা বিভিন্ন দাবি তুলে ধরতে পারতাম সরকারের কাছে। একজন মাত্র বলী মরমসিং ত্রিপুরা যিনি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, তিনিই শুধু জাতীয় ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত। ঢাকাতে গিয়ে আমি নিজে চেষ্টা করেছি একবার ২০০৭ সালে, তখন আমি এ খেলায় সাত বছরের চ্যাম্পিয়ন, কিন্তু ফেডারেশন আমাকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের আসলে কোনো মনোযোগ নেই।
 
বলী ধরা খেলে কেমন সম্মান অনুভব করেন, কেমন পুরস্কার বা সম্মানী পান?
বলী ধরা খেলছি শুধু মানুষের সম্মান, ভালোবাসা ও বিনোদনের জন্য। আগের মতো সম্মান নেই বলে এখন আর বলীরা আসছেন না এ খেলায়। একটা সময় বলীখেলায় পুরস্কার হিসেবে দেয়াল ঘড়ি, রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার, বাইসাইকেল, টেলিভিশন দেওয়া হতো, এখন টাকাপয়সা ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে জব্বারের বলীখেলায় বলী ধরছি আমরা। গ্রামীণফোনের কাছে নিশ্চয় অনেক টাকা স্পন্সর পায় তারা, আমাদের কেন্দ্র করেই এ মেলা হয়ে আসছে, কিন্তু আমাদের সম্মানী দেয় সেই আগের মতো, অথচ এখানে কোটি টাকার ব্যবসা হয়।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close