মঙ্গলবার,  ১১ ডিসেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৬, ১৫:৪৬:২৮
তনুর বাবার সাক্ষাৎকার

‘মায়ের আমার কত যে স্বপ্ন ছিল’

গত ২০ মার্চ রাত ১০টার দিকে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুর রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। এই ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে সারা দেশ। ১ এপ্রিল রাতে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর সঙ্গে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেছেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেলিম সরোয়ার।
 
ঘটনার দিন প্রথমে তিনি হন্যে হয়ে মেয়েকে খুঁজছিলেন। ঘটনাস্থল তখন অন্ধকার। কিছুটা দূরে দু-দুটো চারতলা বিল্ডিং, ক্যান্টনমেন্টের স্টাফ কোয়ার্টার। সেখানে একটা টিউবলাইট জ্বলছিল আর নিভছিল। দূর থেকে তিনি দেখতে পান তিনজন লোক তাড়াহুড়ো করে বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে থাকা একজন ‘মাস্টার’ও তাদের দেখেছেন বলে জানান তিনি। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে তনুর বাবা ‘ওরা কারা’ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, ‘ওরা এ এলাকারই’। এ কারণে তিনি আর ওই লোকদের দিকে যাননি।
 
এই ‘মাস্টার’ এবং ‘দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি’ কি আপনার পূর্বপরিচিত?
মাস্টারের নাম জামান সিকদার। তিনি ক্যান্টনমেন্ট বয়েজ স্কুলের শিক্ষক। তিনি আমার পরিচিত। কিন্তু ‘দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি’কে চিনি না। তবে তিনি বলেছিলেন, তিনিও নাকি এখানকার। এরপর তো মেয়ের লাশ পেলাম। পরে ওই লোকটির আর খোঁজ নিইনি।
 
‘এখানকার’ বলতে কী বোঝানো হয়?
‘এখানকার’ বলতে এই ক্যান্টনমেন্টকে বোঝানো হয়।        
 
আপনি তিনজন লোককে যেতে দেখেছেন, এ কথা এতদিন বলেননি কেন? এমনিতেই, নাকি কোনো চাপ ছিল, তাদের চিনতে পেরেছেন?
২১ তারিখ (মার্চ) মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে দাফন করে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় ফিরে আসি। কোনো চাপ ছিল না। এখানে তো বাইরের লোক ঢুকতে পারে না। তাই এতদিন কাউকে বলতে পারিনি। আর আবছা আলো থাকায় ওই লোকগুলোকে চেনা যায়নি। দূর থেকে তাদের পোশাকও পরিষ্কার দেখা যায়নি। তবে তারা ছিল বেশ লম্বা-চওড়া।
 
পুলিশ কিংবা তদন্তকারীরা কি ‘মাস্টার’কে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করেছেন?
শুনেছি তাকেও জিজ্ঞাসা করেছে, তবে পুলিশ কী জানতে চেয়েছে, আর মাস্টার কী বলেছেন, তা আমি জানি না। সিআইডি আমার কাছে জানতে চেয়েছে, কী অবস্থায় লাশ পেয়েছি- এসব প্রশ্ন করেছে।
 
তনুকে আপনি কী অবস্থায় পেয়েছিলেন?
টিউশনি শেষে বাসায় ফিরে না আসায় আমার ছেলেরা ওর খোঁজে বের হয়। আমিও বের হই। তখন মাস্টারও ছিলেন আমার সঙ্গে। পূর্ব দিকে পাহাড়, আর উল্টো দিকটা ঢালু। ওই জায়গাটায় একটা গাছ আছে। গাছের কাছে পৌঁছে মাস্টারকে বললাম, মেয়েটাকে তো পাচ্ছি না। মাস্টার একটু সামনে গিয়ে কালভার্টের কাছে টর্চের আলো ফেলে বলেন, দেখেন তো এটা কী? আমি বললাম, ওটা তো তনুর স্যান্ডেল। তারপর আমি তনুর ৭২ (০১...৭২) নম্বরে ফোন দিই। তখন দেখতে পাই, পাশের জঙ্গলের ভেতরে ফোনের আলো জ্বলে উঠছে। সেখানে গিয়ে দেখি মেয়েটা মাটিতে পড়ে আছে। তখন আমার ছেলের নাম ধরে ঢাকতে থাকি, আর চিৎকার করে জড়িয়ে ধরে বলি, মা মা, তোমার কী হয়েছে? সে কোনো কথা বলছিল না। তখন তার নাকেমুখে আর শরীরে রক্ত। পাশেই ওড়না,  জামাকাপড়, ছেঁড়া চুল পড়ে আছে। তার দুইটা মোবাইল ফোন ছিল, এর একটা ছিল টাচ ফোন। দেখলাম টাচ ফোন আর পার্সটা পাশেই পড়ে আছে। তনুর সঙ্গে একটি সাংবাদিক কার্ড ছিল, সেই কার্ডটা পাওয়া যায়নি। তারপর তো লোকজন ছুটে আসে। পরের দিন সেখানে গিয়ে দেখি কাটা চুলও পড়ে আছে।
 
তনুর সেই মোবাইল ফোন এখন কোথায়, আপনার কাছে?
না, আমার কাছ থেকে ফোন দুইটা পুলিশে নিয়ে গেছে। ক্যান্টনমেন্ট ফাঁড়ির এসআই সাইফুল বলতে পারবেন ফোন কোথায় আছে।
 
যে জায়গায় লাশ পেলেন, সেটা কি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে, নাকি বাইরে?
না, বাইরে না। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে।
 
আপনার বাসা থেকে ওই জায়গার দূরত্ব কত হতে পারে?
কত, এক হাজার গজ হবে।
 
আপনি কি সন্দেহ করেন যে বাইরে থেকে কেউ এসে ঘটনা ঘটিয়েছে?
আমি যেহেতু কাউকে দেখিনি, তাই কাকে সন্দেহ করব। আমি কাউকেই সন্দেহ করিনি। আর বাইরে থেকে এসেছে কি না, তাও জানি না। ওই জায়গা দিয়ে বাইরে যাওয়া বা ভেতরে ঢোকার কোনো রাস্তা নেই। তা ছাড়া এখানে তো সব সময় সিকিউরিটি (গার্ড) থাকে।
 
ওই দিন কি সিকিউরিটি গার্ড ছিলেন?
আমি দেখিনি। ছিল কি না জানি না। তবে থাকার তো কথা।
 
বলা হচ্ছে, ক্যামেরা দেখে হয়তো অপরাধীদের চিহ্নিত করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গটা আসছে কেন? আসলে কি ওখানে এমন কোনো ব্যবস্থা আছে?
এ বিষয়টা আমি ঠিক জানি না। তনু যে পথে বাসায় ফিরত, সেখানে সেনাকল্যাণ সংস্থার অফিস ও সৈনিক ক্লাব রয়েছে। সেখানে ক্যামেরা আছে কি না তা আমি জানি না।
 
রাতে সেনাকল্যাণ সংস্থার অফিস খোলা থাকে কি?
সেনাকল্যাণ বন্ধ থাকে। কিন্তু সৈনিক ক্লাব রাতেও খোলা থাকে। ওই সময়ও খোলা ছিল। সৈনিকেরা ওখানে সব সময় যাতায়াত করেন।
 
আপনার পরিবার এবং আপনি এখন কোথায় আছেন?
আমরা ক্যান্টমেন্টের ভেতরে আমার বাসায় আছি।
 
তনু কি কখনো আপনাদের বলেছে যে তাকে কেউ কখনো ডিস্টার্ব করেছে?
আমি ওকে জিজ্ঞাস করতাম, মা, তুমি তো গানে যাও, নাটকে যাও, অভিনয় করো, তোমাকে কেউ কি ডিস্টার্ব করে? ও বলত, ‘না বাবা।’ কখনো কেউ তো এ রকম করেনি। না করলে কার কথা বলব।
 
মেয়ে তো আপনার অনেক আদরের- ওর কথা নিশ্চই সারাক্ষণ মনে পড়ছে আপনার?
হ্যাঁ, ও বলত-‘বাবা, দেখবেন আমি এমন কিছু হব আপনার যাতে সুনাম হয়। যাতে আপনাকে সবাই বলে, তনুর বাবা।’
 
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তনুর বাবা বলেন, ‘কুমিল্লার ডিসি সাহেব ১০ হাজার টাকা, আর মুরাদনগরের ইউএনও ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন, আমি প্রথমে নিতে চাইনি, টাকা দিয়ে কী হবে। তাঁরা বলেছেন, “নেবা না ক্যান, সরকার দিছে নেও।” তারপর নিয়েছি।’
 
ইয়ার হোসেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে চাকরির সুবাদে ৩০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে এখানেই বসবাস করে আসছেন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে তাঁর। তনু সবার ছোট। বড় ছেলে নাজমুল হোসেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, মেজো ছেলে আনোয়ার হোসেন এইচএসসি পাসের পর বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। ইয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ‘ছেলেমেয়ে তিনজনই ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেছে। সবার ছোট হওয়ায় তনু ছিল সবার আদরের। ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল লিডার গোছের। গান, নাটক, লেখালেখি- সবকিছুতে সে ছিল। একবার আমাকে সে বলল, ‘বাবা, ভাইয়াকে (নাজমুল) বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বলো, সবাই বলবে তনুর ভাই বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার।’ কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘মায়ের আমার কত যে স্বপ্ন ছিল। সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মেয়েকে নিয়ে আমারও অনেক স্বপ্ন ছিল। সবকিছুই শেষ হয়ে গেল। এখন আমার আর বলার কী আছে। আল্লাহ তো সব দেখেছেন। মানুষ হয়ে আমি মিথ্যা বলতে পারি, কিন্তু আল্লাহ তো সবকিছুর মালিক, তিনি সব দেখেছেন। মেয়েটাকে হারিয়ে আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে, এটা তো সত্য। আমি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও দেশবাসীর কাছে বিচার চাই। যারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে, তাদের উপযুক্ত বিচার চাই।’
 
*মুঠোফোনে নেওয়া ইয়ার হোসেনের সাক্ষাৎকারের অডিও রেকর্ড দেশকালের কাছে সংরক্ষিত আছে।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close