মঙ্গলবার,  ১৯ জুন ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০১৬, ১৫:১৬:২৭

‘সামগ্রিক বিবেচনায় ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি’

ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ‘সুজন’ জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে। সেই আলোকে সাম্প্রতিক দেশকাল সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে। এখানে তাঁর বক্তব্যের চুম্বক অংশ প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নূরুর রহমান।
 
ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম পর্বের নির্বাচন শেষে সরকারের দাবি আর বিএনপির অভিযোগ শুনেছি আমরা। আপনাদের পর্যবেক্ষণে কেমন হলো নির্বাচন?
কয়েকটি স্থানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনের কোনো পরিবেশ ছিল না এবং কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়নি। পাঁচটি মানদ- বিবেচনা করলে আমরা বুঝতে পারব নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে কি না। নির্বাচনে যে ভোটার তালিকা করা হয়েছে, সেটা সঠিক হয়েছে কি না? যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হতে পেরেছেন কি না? নির্বাচনে ভোটারদের সামনে পর্যাপ্ত বিকল্প ছিল কি না? যাঁরা ভোট দিতে পেরেছেন, তাঁরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন কি না? এবং পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ^াসযোগ্য ছিল কি না? এসব বিষয় যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে আমরা দেখব, ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। নারীরা ব্যাপকভাবে ভোট দিতে আসেননি। যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হতে পারেননি। অনেক স্থানেই বিরোধী দলের প্রার্থী ছিল না। ফলে এটা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্র্ণ নির্বাচন ছিল না। নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও সন্তোষজনক ছিল না। এসব কিছু বিবেচনায় বলা চলে বিশ্বাসযোগ্য, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়নি।
 
এ নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ শোনা গেছে। অভিযোগ সত্যি হলে এরূপ বাণিজ্যের সম্ভাব্য কারণ কী?
এটা সত্য যে, এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগ কিন্তু গোপনে রাখঢাক করে আকার-ইঙ্গিতে বা ফিসফিস করে তোলা হয়নি। সরবে, সুস্পষ্টভাবে, নামধাম উল্লেখ করে উচ্চারিত হয়েছে। যেহেতু দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে এবার নির্বাচন হয়েছে, কাজেই দলের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য মনোনয়ন-বাণিজ্য করতে হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের তৃণমূল পর্যায় মনোনয়ন-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটল। আমাদের দেশে অতীতেও এটা ছিল। কিন্তু তা ছিল মূলত সংসদ নির্বাচনে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এবার ইউপি নির্বাচনে এই ব্যবসার পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নতুন একদল ‘ব্যবসায়ী’র সৃষ্টি হয়েছে। আশঙ্কা হলো, ভবিষ্যতে এই চর্চা সংক্রামক ব্যাধির মতো রাজনীতির সব স্তরে আরও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
 
ইতিমধ্যে নির্বাচনে সংঘর্ষে নিহত ৩৪ জন, গুলিবিদ্ধ ১৭ জন, আহত শতাধিক এবং কারচুপির অভিযোগে ৮৯ জন প্রার্থী ভোট বর্জন করেছে। সামগ্রিক বিচারে এটা কি বিচ্ছন্ন ঘটনা? নাকি এটাই ছিল সাধারণ চিত্র?
এবারের ইউপি নির্বাচনের আরেকটি অনাকাক্সিক্ষত দিক হলো পেশিশক্তির প্রয়োগ ও সহিংসতার প্রত্যাবর্তন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সব কটি নির্বাচনেই সহিংসতা একটি বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার ইউপি নির্বাচনে এটা বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রথম পর্বের নির্বাচনে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এটা চলতে থাকলে আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি চরম হুমকির মুখে পড়বে।
 
দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আপনি কি সঠিক মনে করেন?
দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের পক্ষে দুটি যুক্তি দেখানো হয়। এক, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত হবে। দুই, এর মাধ্যমে প্রার্থীদের মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা তাঁদের আরও দায়ীত্বশীল হতে সাহায্য করবে। তবে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হওয়ার যৌক্তিকতা আমরা দেখি না। দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের শিকড় তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এই যুক্তি অসার।
 
বিশ্বের অনেক দেশেই দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন হয়। তাহলে আমাদের দেশে কেন এর সুফল পাওয়া যাবে না?
সেসব দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক নয়। আমরা তো একটা সুষ্ঠু নির্বাচনই করতে পারি না। টিআইবির জরিপেও দেখা গেছে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের এক আখড়া। তাই দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের আগে দলের সংস্কার দরকার।
 
এই নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হবে। এই সরকার স্থানীয় উন্নয়নে কী ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?
দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র বা উন্নয়নের বিশেষ ভূমিকা রাখবে না। এমন নির্বাচন স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংস্কারের ক্ষেত্রে কোনো অবদান রাখবে না। এ ছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে দ্বন্দ্ব, হানাহানির ব্যাপক বিস্তার ঘটবে। তাই আমাদের রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্যদের দলভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয়টি আরও গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close