মঙ্গলবার,  ১৭ জুলাই ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৬, ২০:০৬:৫৩

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই: মোহাম্মদ জমির

মোহাম্মদ জমির, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার এবং বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্র বিষয় সম্পর্কিত কমিটির সেক্রেটারি। সাম্প্রতিক দেশকাল-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে চলমান বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেলিম সরোয়ার।
 
আপনি একজন কূটনীতিবিদ। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাট হলো। টাকা ফেরত পেতে কূটনেতিক উদ্যোগ নেওয়ার অবকাশ আছে কি?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘটনাটি ঘটেছে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। এরপর সম্প্রতি এটিএম বুথে জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ল। র‌্যাব কয়েকজন বিদেশিকে গ্রেপ্তারও করেছে। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক সব ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের প্রধানদের ডেকে একটি সভা করে এবং এটিএম জালিয়াতি প্রতিরোধে কতগুলো উপদেশ দেয়, আমি বলব এটা মার্চ মাসে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে তাদের ঘরে চোর ঢুকে যেসব চুরি করে নিয়ে গেল, সে ব্যাপারে তারা তখনো সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। ফিলিপাইনে ইনকোয়ারার পত্রিকায় ঘটনা প্রকাশ না পেলে এখানে হয়তো প্রচারই হতো না। ওয়ালস্ট্রিটের কয়েকটি পত্রিকাও রিপোর্ট করেছে। অথচ অর্থমন্ত্রীকে কিছুই জানানো হয়নি। ব্যাংকিং সেক্টরের সচিবকেও বলা হয়নি। গভর্নরের উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে তাদের জানানো।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিকভাবে, কূটনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং নিরাপত্তাজনিতভাবে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, সে ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে একটি হাই প্রোফাইল কমিটি গঠন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তারা সেটা করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত আমার জানামতে সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেনি। ইট ইজ নট অ্যাকসেপ্টেবল।
 
মালয়েশিয়া আমাদের শ্রমিকদের ফেরত পাঠাতে চায়, সমস্যাটা কোথায়, ওই দেশের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে আমাদের কোনো ঘাটতি রয়েছে?
গত কয়েক বছরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে আমাদের লোকজন বিদেশে যায় ভিজিটর্স ভিসা নিয়ে। তারপর ওভার স্টে করে ইলিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করে। পুরো গালফে এ রকম ১০ লাখ লোক আছে। তাদের কারণে, আজ ওমান ছাড়া ইউএই, কুয়েত, সাউথ অ্যারাবিয়া কোথাও ভিসা পাওয়া যাচ্ছে না। মালয়েশিয়ায়ও বিভিন্ন সময় মানব পাচারের মাধ্যমে কয়েক লাখ লোক গেছে। তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। মালয়েশিয়া বলছে, তারা লোক নেবে কিন্তু যারা ওভার স্টে করেছে, যাদের বৈধ ভিসা নেই, তাদের ফেরত পাঠাবে। তাদের অর্থনীতির অবস্থাও ভালো যাচ্ছে না। এ কারণে তারা আতঙ্কিত। তবে আমার মনে হয়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বিষয়টা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এতগুলো লোকের ভাগ্য যেহেতু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তাই আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওখানকার দূতাবাসকে অবশ্যই সক্রিয় আলোচনার মাধ্যমে এর সুরাহায় পদক্ষেপ নিতে হবে।
 
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমরা কি সব রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারছি?
এ ব্যাপারে সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ। ভারত এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। যেমন কংগ্রেস, বিজেপি কিংবা অন্যান্য দল নিজেরা যতই মারামারি করুক না কেন, কাশ্মীরের প্রশ্নে তারা সবাই এক। পাকিস্তানের ব্যাপারে তারা একই চিন্তাভাবনা করে। কিন্তু বাংলাদেশে আমাদের নিজেদের মধ্যে আস্থাহীনতা বিরাজ করছে। কারও ওপর কারও আস্থা নেই।
 
ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কৌশলগত ভারসাম্য থাকা উচিত, একটি ছাড়া অন্য দুটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সেই সম্পর্ক কি আছে?
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একদিকে, আর চীন অন্যদিকে। ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বেশি ঘনিষ্ঠ। ভারতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কিন্তু অটুট আছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ যতটুকু সম্পর্ক রাখতে চায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তেমনটাই চায়। কিন্তু আমাদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আক্ষেপ আছে। কারণ, তাদের বোঝানো হয়েছে, শেখ হাসিনা ইউনূস সাহেবের বিরুদ্ধে রয়েছেন। ইউনূস সাহেব কংগ্রেসনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় সাপোর্টার হচ্ছেন হিলারি ক্লিনটন ও বিল ক্লিনটন। তারা মনে করেন, ইউনূস সাহেবের ওপর বিনা কারণে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে। আমি বলব তাদের এ ধারণা ঠিক নয়।
এরপর আমেরিকা সিরিয়ার ব্যাপারে একটা কোয়ালিশন করার প্রস্তাব দিয়েছিল। বাংলাদেশ বলেছিল, যদি জাতিসংঘের মাধ্যমে কোয়ালিশন হয়, তবে আমরা থাকতে প্রস্তুত। সৌদি আরবের প্রস্তাবের ব্যাপারেও আমরা একই কথা বলেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তাদের আমরা পছন্দ করি। তাদের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। কিন্তু তারা আমাদের জিএসপি-সুবিধা থেকে বাদ দিল। ভিয়েতনামকে তারা ট্যাক্স ফ্রি অ্যাকসেস দিয়েছে। আর আমাদের ট্যাক্স দিতে হয়-এটা তো যথার্থ হতে পারে না। আমরা ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়নের সুবিধা দিয়েছি। তাহলে আর কী বাকি আছে। অ্যাকর্ড আর অ্যালায়েন্সের কারণে প্রায় এক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছেন। আমেরিকা তো তাদের খাওয়াচ্ছে না। ইয়েস, যদি কাল আমরা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিই, দেখবেন সব লাইনে চলে আসবে। আমি এটা সরাসরি বললাম।
বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ছে না, উন্নয়নের জন্য যা অন্তরায়, সরকার এ ব্যাপারে কতটা উদ্যোগী, তাও দৃশ্যমান নয়। কারণ ওই একটাই, অস্থিতিশীল পরিবেশ। আপনি বাস পোড়াবেন, রাস্তায় মানুষ মারবেন, মানুষ খুন করবেন, তাহলে বিদেশিদের আস্থা আসবে কোত্থেকে।
 
গত দুই বছরে পরিস্থিতি কিন্তু আগের চেয়ে স্থিতিশীল, যদিও অনিশ্চয়তা কাটেনি...
একটা কারণেই অনিশ্চয়তা। সবাই মিলে একসঙ্গে যদি বলত আমরা একসঙ্গে এগোব, তাহলেই তো হতো। এই যে দুজন বিদেশিকে হত্যা করা হলো, একজন পুরোহিতকে হত্যা করা হলো, এটা কিন্তু আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা নয়। ইট ইজ আ ফেইলর অব দ্য প্রসেস অব থিংকিং। এ ধরনের ঘটনাকে রাজনীতিকরণ করা উচিত নয়। হবিগঞ্জে চার শিশুকে হত্যা করে বালুচাপা দিয়ে রাখা হলো। এটা নিয়েও রাজনীতি করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার মাধ্যমে দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু দায়বদ্ধতা সৃষ্টির আগে আপনাকে স্বীকার করতে হবে- ১৫ আগস্টের ঘটনার জন্য আমরা মর্মাহত। আপনি লন্ডনে বসে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী একজন ছেলেহারা মাকে সান্ত¡না দিতে গেলেন, তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না, কথা বলতে দেওয়া হবে না। তিনি গাড়ি থেকে নেমে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেন, ভেতর থেকে দরজা আটকে রাখা হলো, এটা তো হতে পারে না।
 
রাজনীতির ভারসাম্য কমে যাচ্ছে। বিরোধীরা বলছেন, রাজনীতির স্পেস কমে যাচ্ছে, আপনি কি একমত?
দেখুন, বিদেশে থেকে রাজনীতি করা যায় না। দেশে এসে সম্মিলিত হয়ে সম্পৃক্ত হয়ে একত্রে কাজ করতে হবে। তবে আমি মনে করি, সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ দেওয়া দরকার। সবাইকে ফ্রিডম দিতে হবে। মুক্ত পরিবেশ দিতে হবে।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close