শুক্রবার,  ১৯ অক্টোবর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৬, ১৯:২৯:৫৭

গ্রাহকের অজান্তেই পুনঃনিবন্ধন হয়েছে লাখ লাখ সিম

সাম্প্রতিক দেশকাল প্রতিবেদক
আঙুলের ছাপ কারচুপি করে গ্রাহকের অজান্তে সিম পুনঃনিবন্ধনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। এ প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ সিম পুনঃনিবন্ধন করা হয়েছে।
 
জানা গেছে, কতিপয় মোবাইল ফোন অপারেটর ও তাদের নিয়োজিত ব্র্যান্ড প্রমোটররা এ অসাধু কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে। পুনঃনিবন্ধন করা এসব সিম এখন পাড়া-মহল্লায় মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এসব সিমকার্ড ক্রয় করতে কোনো ধরনের কাগজপত্র ও আঙুলের ছাপ লাগছে না। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, হুমকি-ধমকি, হয়রানি, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, জঙ্গি তৎপরতাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় এসব সিম ব্যবহার করছে একটি অপরাধী চক্র।
 
অভিযোগ আছে, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে চলমান পুনঃনিবন্ধন কার্যক্রম চলার সময় মোবাইল অপারেটরদের নিয়োজিত ব্র্যান্ড প্রমোটররা সাধারণ ও নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে তাদের অজান্তে একাধিকবার আঙুলের ছাপ নিয়ে রেখেছে। পরবর্তীকালে তাদের দেয়া ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ফটোকপি এবং হাতের ছাপ ব্যবহার করে এক বা একাধিক সিম পুনঃনিবন্ধন করে নিয়েছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের একজন আইটি কর্মকর্তা বলেন, লাখ লাখ গ্রাহক আছেন যারা জানেনও না তাদের নামে একাধিক ফোন রয়েছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অজান্তে রি-রেজিস্ট্রেশন করা এসব ফোন দিয়ে যদি কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে তাহলে নিরীহ ওই গ্রাহকই ফেঁসে যাবেন। আর পার পেয়ে যাবে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
 
খোদ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে গ্রাহকের অজান্তে করা এরকম ভয়াবহ সিম পুনঃনিবন্ধন জালিয়াতির অসংখ্য তথ্য। ইতিমধ্যে বিটিআরসি গোপনে তদন্ত করে বেশ কিছু তথ্য উদঘাটনও করেছে। শিগগিরই তারা এসব অবৈধ সিম উদঘাটনে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করবে বলেও জানিয়েছে। খুচরা সিম বিক্রেতা ও বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য দিতে মুঠোফোন অপারেটরদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, সিম পুনঃনিবন্ধনের পর রাজধানী থেকে প্রি-অ্যাকটিভেট সিম আটকের পর সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
 
বিটিআরসির মহাপরিচালক (তরঙ্গ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমদাদুল বারী বলেন, অনেক সময় গ্রাহক খেয়াল করেননি যে রিটেইলার আঙুলের ছাপ মিলছে না বলে বারবার তার কাছ থেকে আঙুলের ছাপ নিয়েছে। এভাবে যতবার দিয়েছে ততবার হয়তো রিটেইলার আলাদা আলাদা নম্বরে ওই গ্রাহকের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে। এভাবে জালিয়াতি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এমদাদুল বারী জানান, শিগগিরই এসব অবৈধ সিমের তথ্য উদঘাটন হয়ে যাবে। যদি কোনো গ্রাহক এখন তার নামে কটি সিম রেজিস্ট্রেশন করা আছে, সে বিষয়ে জানতে চান তাহলে জানতে পারবেন। আর গ্রাহক যদি মনে করেন তার নামে বেশি সিম রেজিস্ট্রি করা আছে তাহলে তার এনআইডি নিয়ে কাস্টমার কেয়ারে এলে তিনি সেটার সমাধান করতে পারবেন।
 
ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলের উপপুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, অন্যের পরিচয় ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে এরকম হাজার হাজার মোবাইল নম্বর নিবন্ধন করে বিক্রি করা হচ্ছে। এরকম কয়েকশ’ সিমও তারা উদ্ধার করেছেন। একটি মোবাইল অপারেটরের নাম জানিয়ে তিনি বলেন, এ কোম্পানির কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে একজন গ্রাহকের তথ্য চুরি করে তার অজান্তে অন্য সিম নিবন্ধন করছে। এরপর নিজেদের বিতরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সেগুলো খুচরো পর্যায়ে বিক্রি করছে। যার পরিচয় ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার এ বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই। হয়তো তার জানারও সুযোগ নেই।
 
মঙ্গলবার ঢাকার তেজগাঁও এলাকা থেকে এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় অন্যের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে নিবন্ধন করা অনেক মোবাইল সিম উদ্ধার করেছে বলেও জানান তিনি।
 
বুধবার সকালে পুলিশের ঢাকার তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার জানান, আমরা তদন্তে দেখতে পেয়েছি, একটি কোম্পানির কর্মী বা বিক্রেতারা যখন সিম নিবন্ধনের জন্য ডিভাইসে আঙুলের ছাপ নেন, তখন তার সিমটি নিবন্ধনের পাশাপাশি, নানা কৌশলে তারা আরও কয়েকবার আঙুলের ছাপ নিয়ে অন্য আরও কয়েকটি মোবাইল সিম নিবন্ধন করে নেন। পরে এসব সিম নিজেদের বিতরণ কর্মীদের মাধ্যমে ‘প্রি-অ্যাকটিভেটেড’ বলে বেশি দামে বিক্রি করে। যদিও এরকম প্রি-অ্যাকটিভেটেড সিম বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ওই কোম্পানিটির তিনজন কর্মকর্তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
 
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি এলাকায় ১৫৭টি সিম জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। বিটিআরসির ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমদাদ-উল বারী বলেন, এ ধরনের সিম ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে বিকাশের দু’জন এজেন্ট ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, গ্রাহকের অসাবধানতার সুযোগে পিনকোড জেনে নিয়ে পরবর্তী সময় গ্রাহকের সিম প্রতিস্থাপন করেছে। এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কাস্টমারদেরও তিনি সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন।
 
নানা অসাধু উপায়ে নেয়া আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে যেসব সিম সচল রাখা হয়েছে (প্রি-অ্যাকটিভেট সিম) সেসব সিম ও রিম বন্ধ করতে বিশেষ অভিযান চালানো শুরু করেছে বিটিআরসি। তাদের সঙ্গে ? র‌্যাব ও পুলিশকে অভিযান চালানোর জন্য অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।
 
চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা মন্ত্রিসভা কমিটির পঞ্চম সভায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হুমকি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অবৈধ অর্থ লেনদেন ও অপরাধ সংগঠন মোকাবেলায় জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে যাচাই করে সিম-রিম নিবন্ধন চার মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ ডিসেম্বর থেকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন শুরু করা হয়। ৩১ মে পর্যন্ত নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ১১ কোটি ৬০ লাখ সংযোগ জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যাচাই করে পুনর্নিবন্ধন করা হয়েছে।
 
বিটিআরসির হিসাবে গত এপ্রিল শেষে গ্রাহকের হাতে থাকা মোবাইল সিমের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ২০ লাখের মতো। আর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুন পর্যন্ত মোট ১১ কোটি ৬০ লাখের মতো সিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হয়েছে।  
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close