বৃহস্পতিবার,  ২৩ নভেম্বর ২০১৭  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৬, ১৯:০৮:১০

ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

আলতাফ পারভেজ

সমাজতন্ত্রের সোভিয়েত মডেলের পতন ঘটেছে প্রায় ২৬ বছর। সেই 'পতন' থেকে অনেকে অনেক কিছু শিখেছেন; কেউ কেউ কৌশল পাল্টিয়েছেন, অনেকে হতবিহ্বল হয়ে সমাজ রূপান্তরের ওপরই আস্থা হারিয়েছেন, অনেকে আদি অকৃত্রিক পথেই আছেন। এরূপ সকল ঘরাণার মানুষদের কাছেই ভেনিজুয়েলার গত এক দশকের পরিস্থিতি বিশেষ নজর কেড়েছে। সমাজতন্ত্রের দুঃসময়ে শ্যাভেজ বিশ্বজুড়েই বেশ সমাজতান্ত্রিক কুহক তৈরি করেছিলেন। কিন্তু দেশটি এখন বেশ বিপদের মুখেই বলতে হয়।

খাবার‬ ও ‪পণ্যের‬ ‪আকাল‬

নীচের ছবিটি দেখুন। ভেনিজুয়েলা আর কলাম্বিয়া সীমান্ত। ১১ মাস পর গত রোববার এই সীমান্ত খুলে দেয়া হলে ভেনিজুয়েলার হাজার হাজার নাগরিক কলম্বিয়ার সীমান্ত শহর cucuta-তে ঢুকে পড়েন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য। ১২ ঘণ্টার জন্য গেইট খোলা হয়েছিল, আর তাতে ৩৫ হাজার মানুষ কলম্বিয়ার সীমান্ত শহরের দোকানপাট খালি করে ফেলে।

ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

সকলেরই জানা, বিশ্বের সব চেয়ে বেশি তেল মজুদ আছে ভেনিজুয়েলায়। কিন্তু তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় দেশটি দিশেহারা। জরুরি খাদ্যপণ্যের তীব্র সংকট যাচ্ছে। মিলছে না ওষুধও। খাদ্য দাঙ্গা দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। (ছবি থেকে খাদ্য পরিস্থিতি অাচ করা যাবে কিছুটা)

ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

মুদ্রাস্ফীতি‬ বেড়ে যাচ্ছে অকল্পনীয়‬ স্তরে

শ্যাভেজ ও মাদুরো তেলের অর্থে অনেক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করেছিলেন গরীবদের জন্য। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের দিকে নজর দেন তারা। ন্যায্যমূল্যের অনেক দোকানও খোলা হয়। তাতে ভোটের অংক পাল্টে যায় দেশটিতে। অন্যান্য দেশের জন্যও তা দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীরা একে 'শ্যভেজ মডেল' হিসেবেও অভিহিত করতে শুরু করেন। যে আবেগের মৃদু ঢেউ লাগে বাংলাদেশেও।

হুগো শ্যভেজের আমলে আমাদের দেশেও ভেনিজুয়েলাকে নিয়ে বামপন্থী কাগজগুলোতে বড় বড় হেডলাইন দেখেছি। নিকোলাস মাদুরোর আমলেও তা বহাল আছে। শ্যাভেজ ও মাদুরো বাস্তবে কি করছেন এবং তাদের আর্থিক নীতি-কৌশল কী ধরনের ফল বয়ে আনতে যাচ্ছে তার দূরদর্শী নৈব্যক্তিক পর্যালোচনা খুব একটা চোখে পড়েনি।

তারপরও কিছুদিন সব ঠিকঠাক মতোই চলছিল। তেলের উচ্চমূল্যের সময় শ্যাভেজ মডেলের সমাজতান্ত্রিক ইমেজ গা খায়নি। কিন্তু এখন তেলের দর পড়ে গেছে অনেক এবং পতন অব্যাহত আছে। এ অবস্থায় দরিদ্রমুখী প্রকল্পগুলোতে অর্থ যোগাতে কাগজের মুদ্রার মুদ্রণ বাড়ানো হয়। তাতে মূদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। গত বছরের চেয়ে এবছর যা ১৮০% বেশি! ছবিতে দেখুন, দেশটির মুদ্রার মান কীভাবে পড়ছে।

কেন্দ্রীভূত‬ ‪ক্ষমতার‬ ‪বিপদ‬

যে দেশে ৯৫ ভাগ রপ্তানি আয় এবং সরকারি খরচের ৫০ ভাগ তেল বেচে আসে- সেখানে তেলের মূল্য পড়ে গেলে সংকট হবে এটা অস্বাভাবিক নয়। ২০১৩ সালে ৮০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল তারা। ২০১৬ সালে সমপরিমাণ তেল বেচে আয় হযেছে ২০-২৫ বিলিয়ন ডলার। মাদুরো সরকার তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না।

ইতিমধ্যে বিদ্যুতের রেশনিং শুরু হয়েছে। ইমারজেন্সিও জারি আছে। ইমারজেন্সি প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আরও বাড়তি ক্ষমতা দিয়েছে। যা কার্যত দেশটির জন্য এখন আর সুসংবাদ নয়। কারণ বহু ক্ষমতা ইতোমধ্যে তার হাতে কেন্দ্রীভূত।

কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার আরাম সমাজতান্ত্রিক ট্র্যাডিশন। কিন্তু শ্যাভেজ ও মাদুরো তাকে ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সৃজনশীল কিছু করতে পারেননি। অনুগতদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলয়ে চারপাশে জড়ো করতে যেয়ে পেশাদারিত্বের কদর কমে গেছে। ফলে সমস্যার জট পাকছে কেবল। সংকটের সময়কার জন্য কোন ব্যাক-আপ প্লান ছিল না। নেই কোন ক্রাইসিস ফান্ডও।

অর্থনৈতিক‬ ‪সৃজনশীলতার‬ ‪সংকট‬

মূল সংকট তৈরি হয়েছে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যকরণে ব্যর্থতা এবং বেসরকারি খাতকে বিকশিত হতে না দেয়ায়। বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করতে না দেয়ায় অনেক পণ্যের উৎপাদনই কমে গেছে। ফলে ন্যাযমূল্যের দোকানগুলো খালি। (ছবিতে দেখুন) লাইন দিয়েও সেখানে পণ্য মিলছে না। পণ্য যা মিলছে..কালোবাজারে...অনেকগুণ বেশি দামে।

ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

শ্যাভেজের মতোই মাদুরো পরিস্থিতির মাঝে 'পশ্চিমা ষড়যন্ত্র' দেখছেন। কথাটা কম-বেশি মিথ্যাও নয়। প্রতিনিয়ত যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের মুখে ছিল ভেনিজুয়ালার এই নেতৃত্ব।

কিন্তু পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় তারা কী করছেন বা আদৌ কিছু করতে পেরেছেন কি না তা খুবই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে এখন। পশ্চিমাদের উপর সব দোষ চাপানোর রাজনীতির আবেদন তাই বেশ পড়ে গেছে। দেশের পার্লামেন্টটি এখন বিরোধী দলের দখলে।

মিত্ররাও‬ ‪শংকিত‬

চীন দেশটিকে বড় অংকে ঋণ দিয়ে গেলেও সামনে সেটা বহাল থাকবে কি না...বলা মুশকিল। কারণ ভেনিজুয়েলা ঋণ শোধ করতে পারবে কি না তার কোন নিশ্চয়তা নেই এখন আর।

শুরু থেকে শ্যাভেজ ও মাদুরোর আদর্শিক উদ্দীপনা ছিলেন ফিদেল এবং রাউল কাস্ট্রো। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ বেছে নেয়ায় ভেনিজুয়েলা এখন অনেকটা নিঃসঙ্গ। যদিও বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে তার স্ট্রাগল আশাবাদী করেছিল অনেককে।

সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রধান শিক্ষা বোধহয় এই যে, বৈপ্লবিকতাকে সৃজনশীলতার সঙ্গে বাস্তব কাজে অনুবাদ করতে না পারলে তার পরিণতি করুণ হয়ে উঠতে পারে।

এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close