বৃহস্পতিবার,  ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৬, ১৮:২৮:১০

কাটাকুটি খেলায় জিতবে কে?

সুমাইয়া হাবীবা
এবার সমাপনী পরীক্ষা হচ্ছেই। যদিও কিছুদিন আগেই গণশিক্ষা মন্ত্রী জানিয়েছিলেন এ বছর থেকেই আর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী হবে না। প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম এ খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে। অনলাইনেও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হলো এ খবরে দ্বিমত পোষণকারী কাউকে আমি পাইনি। গত পনেরো বছরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক নিরীক্ষা চলেছে। শুরুটা গ্রেডিং সিস্টেম দিয়ে। নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত- এরপর আরেক সিদ্ধান্ত, ওটার পর নতুন সিদ্ধান্ত এবং এরপরে আরেক সিদ্ধান্ত এভাবেই চলেছে এতগুলো বছর। সিদ্ধান্তের কাটাকুটি খেলায় সর্বশেষ যোগ হলো সমাপনী বাতিলের পর পুনরায় বহালের সিদ্ধান্ত।
 
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রাথমিকপর্যায়ে বোর্ড পরীক্ষার নজির নেই। বাংলাদেশে বিগত ছয় বছর তা হয়েছে। পার্শবর্তী দেশ ভারতসহ অন্যান্য দেশের স্কুলপর্যায় হিসেব করা হয় দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। এরপর তাদের চূড়ান্ত বোর্ড পরীক্ষা। যার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তাদের ভবিষ্যৎ ও উচ্চতর পড়াশোনার পথ প্রশস্ত হয়। মাঝে দশম শ্রেণীর পর মাধ্যমিক পরীক্ষা হয় কিন্তু সেটিকেও বোর্ড পরীক্ষা বলা হয়ে থাকলেও মূলত এইচএসসি বা ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার ফলাফলকেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এবং প্রতিটি দেশেই একাদশ-দ্বাদশের ছাত্রছাত্রীদেরও স্কুলছাত্র হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
 
এ বিবেচনার অর্থ তাদের প্রতি স্কুলের বাচ্চাদের মতোই কোমল হওয়া। এবং পশ্চিমারা এ বিষয়ে আরো এগিয়ে। তারা তাদের শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ছাত্রদেরও মানসিক অবস্থা মানসিক সুস্থতা বিবেচনায় রাখে। তারা বিশ্বাস করে সুস্থ ও আয়েশি মানসিকতা নিয়ে পড়াশোনা ভালো হয়। এবং পরে ছাত্রদের কাছ থেকে পরিপূর্ণ অবদান পাওয়ার উপায় হলো তার মস্তিষ্ককে চাপমুক্ত রাখা। সে তুলনায় আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে শিশু শ্রেণীর বাচ্চাদের পর্যন্ত চাপমুক্ত থাকার সুযোগ নেই। পত্রিকার রিপোর্টে এসছে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে বাচ্চাদের পরীক্ষাই প্রায় অর্ধেক বছর! এ ৩৬৫ দিনের মধ্যে শুক্রবার হয় ৫২ দিন। তারপর আছে সরকারি ছুটির দিন। স্কুলের বার্ষিক মিলাদ ও ক্রীড়া সপ্তাহসহ নিজস্ব অনুষ্ঠানাদি। বাচ্চাদের নিজস্ব পারিবারিক ও ধর্মীয় উৎসব। এবং অসুস্থতা। মেডিক্যাল সায়েন্স বলে একজন মানুষ বছরে অন্তত তিন চার দিন ঠাণ্ডা-জ্বরজনিত অসুস্থতায় ভুগে থাকে। এতে মানুষের শরীরের টক্সিনগুলো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় বের হয়ে যায়। অর্থাৎ, এটি প্রায় সবার সাথেই ঘটে থাকে। এবং তখন স্কুল কামাই হবেই। প্রশ্ন হলো একজন বাচ্চার হাতে থাকে আর কতদিন! কতটা দিন সে পায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য! আর কতটা দিন সে পায় কিছু আত্মস্থ করার জন্য বা বোঝার জন্য। যা সে শিখছে, নিজের ভেতর তা ধারণ করার জন্য।
 
জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খালিকুজ্জামান এক সেমিনারে বলেছিলেন, সমাপনীর মতো বোর্ড পরীক্ষা বাচ্চাদের সর্বনাশ করছে। সেমিনারে আরো অনেক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ উপস্থিত ছিলেন। তারা কেউই তার এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেননি। বরং অনেকেই সমর্থন করেছিলেন। এ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা সবাই বাংলাদেশেরই নাগরিক। এবং বাংলাদেশ থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছেন। তারা শৈশবে কোনোরূপ সমাপনী পরীক্ষা না দিয়েই আজ নিজ নিজ অবস্থানে আসীন হতে পেরেছেন। এবং শিক্ষাবিদও হয়েছেন।
অনেকে ধারণা করেন যে, যুগের পরিবর্তন ঘটেছে। এবং কালের পরিক্রমায় পৃথিবী আধুনিক হয়েছে ও এগিয়েছে। তাই টিকে থাকার জন্যই বাচ্চাদের পড়াশোনার চাপ বাড়াতে হয়েছে। তাই সমাপনীর প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেন। বাস্তবতা হচ্ছে বিজ্ঞান এগিয়েছে যতটা তার চেয়ে ঢের বেশি এগিয়েছে প্রযুক্তি। এটাও অবশ্যই বিজ্ঞানেরই শাখা তবে প্রকৃত স্বতন্ত্র বিজ্ঞান বলতে যা বুঝায় তার অগ্রগতি সামান্যই হয়েছে। এখন পর্যন্ত মানুষ কয়েক শতক আগের আবিষ্কারেই থেমে আছে। সেগুলোই বিবর্তিত হয়েছে, আধুনিক হয়েছে, নতুন আঙ্গিকে নবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু মৌলিক আবিষ্কারের দিক থেকে এ প্রজন্মের ঝুলি শূন্যই বলতে গেলে।
এর সবচেয়ে বড় কারণ, এ প্রজন্মের মস্তিষ্ক স্থির নয়। স্থির মস্তিষ্ক আবিষ্কারের জন্য আবশ্যক। গভীর ধ্যান-চিন্তা-ভাবনার অবকাশেই ব্যক্তি আবিষ্কারের চিন্তায় নিমগ্ন হতে পারে। নিউটন, আইনস্টাইন, কুরি দম্পতি, মেন্ডেল আরো প্রমুখ বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্ব যাদের কথাই বলি না কেন প্রত্যেকের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাদের চিন্তা-ভাবনার গবেষণার অবকাশ কতটা ছিল। একইভাবে দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, লেখক, আলেম-উলামা, ভাস্কর, শিল্পী ও চিত্রকর প্রতিটি অমর ব্যক্তিত্ব পর্যালোচনা করলে একই ফল পাওয়া যাবে। প্রত্যেকের শৈশব কেটেছে অস্থিরতাবিহীন সুস্থভাবে। সে সুস্থতা, অবসর ও স্থিরতা আমরা এ প্রজন্মকে দিতে পারছি না।
 
ইতিহাসে দেখা যায়, যে জাতির প্রজন্মকাল অস্থিরতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম হয়েছে সে যুগে সেই জাতিতে কোনো মনীষীর দেখা মেলেনি। জাতি ছিল হানাহানিতে লিপ্ত। সমাজ সংসার ছিল বিক্ষিপ্ত। আজ যেসব দেশকে আমরা উন্নতির শিখরে দেখতে পাচ্ছি, তাদের এ উন্নতির পেছনেও তাদের স্থিরচিত্রবিশিষ্ট পূর্বপুরুষের অবদানই মুখ্য। আমরা উন্নত বিশ্বকে ধারন করতে গিয়ে নিজেদের স্বকীয়তাকে উগরে দিচ্ছি কি না?
 
আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি চেনে। ইট-পাথরের আধুনিক ডিজিটাল ক্লাসরুম চেনে। চেনে না বেলগাছ, সজনে গাছ; চেনে না বুলবুলি, বাবুই, জানে না এক্কাদোক্কা ও সাতচারা খেলতে। আইফেল টাওয়ার ও অপেরা হাউজ কোথায় অবস্থিত তা মুখস্থ থাকলেও জানে না খাল আর বিলের পার্থক্য। ব্যাঙ রাজকুমারের রঙ্গিন মলাটের রূপকথার বই পড়লেও সত্যিকার ব্যাঙ দেখে না। বিকেলে মাঠে হুটোপাটি করতে জানে না। শালুকের স্বাদ কেমন জানে না। চার দেয়ালের বদ্ধ ঘরে এমনিতেই শৈশব মারা পড়ছে প্রতিনিয়ত।
 
একের পর এক পরীক্ষার নামে বাকিটুকুও মেরে ফেলছি আমরা। প্রতিটি স্কুল যার যার স্কুলের রেটিং বাড়াতে বাড়তি বইয়ের বোঝা, কোচিংয়ের বোঝা, পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। পবিত্র রমজানেও স্কুলগুলো খোলা থেকেছে। ইতিহাসের দীর্ঘতম রোজাও কিশোর-কিশোরীদের প্রতি মানবিক করতে পারেনি আমাদের। যেহেতু স্কুলগুলো খোলা ছিল তাই সংশ্লিষ্ট কোচিংগুলোও খোলা ছিল। বোর্ড পরীক্ষার্থীদের তো আরো করুণ অবস্থা। কোনো কোনো স্কুল ২৪ রমজান পর্যন্তই খোলা ছিল। এবং সাথে অবশ্যই কোচিংও।
 
উন্নত বিশ্বে যাদের সাথে প্রতিযোগিতার কথা আমরা বলছি গ্রীষ্ম প্রধান দেশ না হয়েও দীর্ঘ গ্রীষ্মকালীন ছুটি তারা এ সময় ভোগ করছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পর্যন্ত ছুটির আমেজ উপভোগ করছে। গ্রীষ্ম প্রধান দেশ হয়েও গ্রীষ্মের তাপদাহপূর্ণ রমজানে ছুটি না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। সচেতন মহল আশা করে সরকারিভাবে এসবের সুষ্ঠু সুরাহা হবে। অথচ দেখা যাচ্ছে সরকারিভাবেও বরং আরো ভয়ঙ্কর বোর্ড পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে স্কুলগুলোকে পূর্ণদ্যোমে শিশুদের মানসিক চাপ বাড়াতে সহায়তা করছে।
 
বেসরকারি গবেষণায় দেখা গেছে বর্তমানে তরুণদের মাঝে যে অপরাধ প্রবণতার বাড়তে দেখা যাচ্ছে তার পেছনে মূল কারণ পারিবারিক শিক্ষার অভাব ও শিষ্টাচারের অভাব। দেখা গেছে এরা প্রত্যেকেই দিনের বেশির ভাগ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাটায়। বাইরের লোকজনের সাথে যতটুকু সময় কাটায় সেটাও ব্যস্ততাকেন্দ্রিক সর্ম্পক। অর্থাৎ স্কুল-কোচিং ইত্যাদি। বেসরকারি একটি শিশু সংগঠনের জরিপ অনুযায়ী, সমাপনী পরীক্ষার কারণে শুধু ঢাকাতেই ২০০৯ সালে কোচিং সেন্টার বেড়েছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি। ২০০৭ সালেও যা অনেক কম ছিল।
 
পরীক্ষার ভয়ে স্বল্প মেধার শিশুদের মানসিক রোগ পর্যন্ত দেখা দিচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে পড়াশোনাই ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। আর ভয়ঙ্কর ও খারাপ দিকটি হলো শিশুরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। গ্রামাঞ্চলে তো বটেই শহরেও নকল শিখেছে শিশুরা। আগে দেখা যেত এসএসসিতে বারবার ফেল করা বয়সে কয়েকগুণ বড় শিক্ষার্থীই এমন কাণ্ড করত। এবং তাদেরকে এ জন্য শিক্ষকেরা নিয়মিত শিক্ষার্থী থেকে অনেকটা আলাদাই রাখার চেষ্টা করতেন। যাতে তারা না শিখে যায়। অথচ বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণীর নিয়মিত শিক্ষার্থীরাই তা করছে। কারণ তাদের পাস করতে হবে! সার্টিফিকেট পেতে হবে!
 
জাতিগতভাবে উন্নত হওয়ার, এগিয়ে যাওয়ার প্রধান শর্ত জাতিগতভাবে সমৃদ্ধ হওয়া। আর জাতিগতভাবে সমৃদ্ধ হতে গেলে সর্বাগ্রে জাতিকে সুষ্ঠুভাবে সুস্থভাবে সৎভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। তবেই প্রত্যেকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী দেশের কল্যাণে মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারবে। যদি দেশকেই না চেনে, দেশের সংস্কৃতিই না চেনে, দেশের সম্পদ ও দেশের প্রকৃতিই না চেনে তবে ব্যক্তি নিজেকেই চিনবে না। বৃহত্তর থেকে ক্ষুদ্রতর প্রতিটি বিষয়ই আমাদের সংস্কৃতি। বাড়ির সামনে উঠান থাকা, সে উঠানে আতাগাছ আমগাছ থাকাও আমাদের বাংলাদেশী সংস্কৃতি। বিকেলে মাঠে খেলতে যাওয়াও আমাদের বাংলাদেশী সংস্কৃতি। উন্নয়ন হতে হবে সংস্কৃতিকে ধারন করে।
 
তাই পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কারে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গবেষণা পরিষদসহ যা যা প্রয়োজনীয় তা গঠন করে বর্তমানের এই কাটাকুটি খেলার অবসান ঘটানো উচিত। শিশুদের শৈশব-কৈশোর যেন বয়সের আগেই হারিয়ে না যায় সে রকম একটি ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। প্রধান লক্ষ্য হতে হবে শিশুদের মস্তিষ্ক চাপ ও দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখা এবং আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রাখা। সময়ের সাথে উন্নতি হওয়ার মানে মানুষের অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া নয়। মানুষকে স্বস্তির জীবন প্রদানই জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন। প্রযুক্তিগত উন্নয়নকেও যদি সবকিছুর উন্নয়নের চাবিকাঠি ধরা হয় তবুও তার সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রমাগত জনজীবনকে যান্ত্রিক করে ফেলার মধ্যে কোনো প্রকৃত উন্নয়ন নেই। জাতির জনকল্যাণ নেই।
 
লেখক: সমাজ ও মানব উন্নয়ন কর্মী।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close