মঙ্গলবার,  ১৬ অক্টোবর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৬, ১৩:২৪:৫১

‘সে জন সোনা চেনে না’

জয়া ফারহানা
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একশ্রেণির আমলা চাকরিতে নিয়োগ নোটিসের আড়ালে নিয়োগ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ এখন আমলাদের শোষণের একটি মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এবং আমরা ভুক্তভোগীরা তা মেনে নিতে এক রকম বাধ্য হয়েছি। আমলাদের মধ্যে যা থাকা উচিত ছিল তা নেই। এমন আফসোসের তালিকা তৈরি করলে সেই তালিকা হবে দীর্ঘ। আবার একশো তেইশ ভাগ বর্ধিত বেতন নিয়ে তারা জনগণের জন্য কী কী কাজ করছে এমন তালিকা তৈরি করলে তা হয়ে যায় খুব-ই ছোট। অতএব আমলাতান্ত্রিকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে চাপা দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
 
এই দীর্ঘশ্বাসের পেছনে অনেক কারণ। প্রথমত গত চার দশকের বেশি সময়ের আমলাতন্ত্র যে কোনো নির্বাচিত অথবা অনির্বাচিত অথবা আধা নির্বাচিত সরকারকে দিয়ে জনগণের বিপক্ষে যে কাজগুলো করিয়ে নেয় তার জন্য কখনও আমলাদের শাস্তি ভোগ করতে হয় না। ন্যায্যত অথবা অন্যায্যত যেভাবেই হোক রাজনীতিকদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, কম বেশি কারাভোগ করতে হয়, কারাগারের ভালোমন্দ ‘মেহমানদারিও’ ভোগ করতে হয়। কিন্তু গত চার দশকের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কোনো আমলা বা আমলাশ্রেণি গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কারাভোগ করেছেন এমন নজির নেই। দীর্ঘশ্বাসের আরো কারণ আছে, মূল সংবিধানে আমলাদের এতো ক্ষমতা ছিল না। রাষ্ট্র রীতিমতো আইন সংশোধন করে আমলা ও প্রশাসকদের হাতে সীমাহীন ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।
 
আমলাদের এই ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে বাংলাদেশের আদি সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদের ওপর ছুরি চালিয়ে। মূল সংবিধানে আমলাতন্ত্র সম্পর্কে লেখা ছিল ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানব সত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কমবেশি সবসমাই স্থানীয় প্রশাসন থেকেছে আমলাদের অধীনস্থ হয়ে। অথচ সংবিধান পরিষ্কারভাবে স্থানীয় সরকার বলতে সত্যিকার রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন জনগণের স্থানীয় সরকারই বোঝাতে চেয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী আমলাতন্ত্র রচিত হয়নি। এখন সীমাহীন ক্ষমতা হাতে পেয়ে একশ্রেণির আমলা পরিণত হয়েছেন জনগণের রক্তচোষা জোঁকে। এই উপমা শতভাগ সত্য হয়ে ওঠে অন্তত চাকরিতে নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে।
 
চাকরিদাতা আমলারা অতি পরাক্রমশালী। তারা এতো প্রবল যে চাকরিদানের ক্ষেত্রে শতভাগ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে তারা নিজেদের মর্জিমাফিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে শোনা যায় যে, তারা রাজনৈতিক নেতা এমনকি মন্ত্রীদেরও খুব একটা তোয়াক্কা করেন না। কেন না চাকরির আড়ালে রয়েছে ঘোরতর বাণিজ্য।
 
দশকের পর দশক ধরে সফলভাবে বাণিজ্য চালিয়ে অর্থ বিত্ত, ক্ষমতা প্রতিপত্তিতে ফুলে ফেঁপে ওঠা আমলারা যে কোনো দুর্বল সরকারকে তো বটেই কখনও কখনও অতি পরাক্রমশালী সরকারকেও ‘পুতুল সরকার’ বানিয়ে রাখতে পারে। সেই যে কবে শুরু হয়েছিল রক্তপাতহীন আমলা অভ্যুত্থান তার সুফল আমলারা ভোগ করছেন দশকের পর দশক ধরে। কেউ কি আছেন, যিনি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন ক্যাডার সার্ভিস ব্যতীত সরকারি চাকরিতে ঘুষ ছাড়া কেউ নিয়োগ পেয়েছেন? চাকরি প্রদানের বিবিধ বিধিবিধান এখন এক রকম সাজানো চিত্রনাট্য। বিধির জায়গায় বিধি থাকে। বাস্তবে নিরবধি নিয়োগ বাণিজ্য চলে।
 
চাকরির সার্কুলারে যেসব শর্তাবলি থাকে তা শতভাগ পূরণ করার পরও প্রাথমিক যাচাই বাছাইয়ে বাতিল হয়ে যায় নেটওয়ার্কবিহীন আবেদনপ্রার্থীর আবেদনপত্র। আবার মূল ক্ষমতাবান চাকরিদাতা বা বোর্ডের সঙ্গে টাকা পয়সার ব্যাপারে চূড়ান্ত কথাবার্তা হয়ে আছে এমন প্রার্থীর কাগজপত্রে যথেষ্ট ফাঁক ফোকর থাকা সত্ত্বেও তার চাকরি হয়ে যাচ্ছে।
 
এরকম অভিযোগ আছে অনেক। চলে ইন্টারভিউ নামের চোখ ধোলাই বা হাটুরে তামাশা। এই হাটুরে তামাশায় দেশের লক্ষ লক্ষ নিরীহ তরুণ-তরুণী অংশ নেয় এবং নিয়োগ নাটকে বৈধ রূপদানের পাপেট হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এই অগণিত ‘পাপেট’ চাকরি প্রার্থী অংশ না নিলে তো নিয়োগদানের এই ‘সার্কাস শো’ বৈধতা পায় না। এ এক রকম অলিখিত শর্তই হয়তো যে, চাকরি পাবে সেই অযোগ্য প্রার্থী যার খুঁটি বাঁধা আছে বড় নায়ে অথবা যার সঙ্গতি আছে বিস্তর ঘুষ বাণিজ্যে অংশ নেয়ার। সন্দেহ নেই, ঘুষ বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারীরা পরবর্তীকালে কর্মজীবনে এসে ঘুষ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা ও ‘ঐতিহ্য’ সমুন্নত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করবেন এবং সম্ভবত অনাদিকাল ধরে এই ধারা চলতে থাকবে।
 
চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দেশ আরো অনেক মেধাবী, প্রজ্ঞাবান, যোগ্য আমলা পেতো। লাভবান হতো দেশ। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়ার পর সম্প্রতি জার্মানি বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ, শাহাজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী ও কার্গো স্ক্যানিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ করেছে চূড়ান্ত অসন্তোষ। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া দেশগুলোকে আমরা শতমুখে গালিগালাজ করে তুলোধুনা করতে পারি,তাদের দোষারোপ করে নিজেদের পক্ষে বিশাল সাফাই গাইতে পারি কিন্তু তাতে কি বিমান বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দুর্নীতির বিশাল বাণিজ্য চক্রকে উত্খাত করা যাবে! না তাতে দেশের স্বার্থ রক্ষা পাবে?
 
কোনো দেশের লোকসংগীত সেই দেশের জনগণের মনস্তত্ত্বের নির্দেশক। আমাদেশের দেশের বহুল জনপ্রিয় একটি লোক সংগীত ‘...খাঁটি সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা, সে জন সোনা চেনে না...’। লোক সংগীতে এই ইঙ্গিত পরিষ্কার নির্দেশনা দেয় এই জনপদের মানুষ খাঁটি সোনা চেনে না। দশকের পর দশক ধরে আমলাতন্ত্রের চাকরি বাণিজ্য মারফত খাঁটি সোনা প্রার্থীর পরিবর্তে ইমিটেশন প্রার্থী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ অসত্য নয়।
 
লেখক : কথাসাহিত্যিক
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close