মঙ্গলবার,  ১৬ অক্টোবর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৬, ১১:৫৪:৩০

ঈদের উচ্ছাস নেই এমপিও শিক্ষকদের ঘরে

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী
ঈদ-উল-ফেতর অত্যাসন্ন। বিশ্ব মুসলিমের সবচেয়ে আনন্দ ও মাধুর্যমন্ডিত দিন। সারা দুনিয়ার মুসলমান পুরো এক মাসের কঠোর সিয়াম সাধনার পর আনন্দ ও পূণ্যময় এ দিনটির জন্য আগে থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান থাকেন। এটি তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। ঈদ-উল-আজহা মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ ঈদ আনন্দের দিন। হজ্জ ও কোরবানীর কারণে এ ঈদের মাহাত্ম্য বেশী। কিন্তু রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদ-উল-ফেতর আসে বলে এর ভিন্ন আরেক মাত্রা ও আয়োজন। তাই তো আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কন্ঠের এ গানটি প্রতি বছর কোটি কন্ঠে এদিন গাওয়া হয়-
'রমজানের ঐ রোজার শেষে
এলো খুশীর ঈদ'।
সারা বছরে দু'টো মাত্র ঈদ। এ দু'দিনে পুরো বছরের দুঃখ, বেদনা ও হতাশাকে ছাড়িয়ে সকলে আনন্দে মেতে ওঠে। বহু মাত্রিক আনন্দে জীবনকে প্রাণবন্ত করে নিজের মাঝে হারিয়ে যায় সবাই। সে আনন্দ লিখে কিংবা বুঝিয়ে বলার নয়। বিশ্বের যে কোন মুসলমান মাত্রই জানেন, ঈদে কতো আনন্দ! সে আনন্দ কেবলি অনুভবের ও উপলব্ধির। সে এক সার্বজনীন আনন্দ। পারস্পরিক সকল ভেদাভেদ ভুলে একে অন্যকে আপন করে নেবার সে এক শাশ্বত আয়োজন।
 
আজকাল সবকিছুতে বৈষয়িকতার নিরেট প্রভাব। একটা সময় ছিল, যখন টাকা পয়সা ছিল একান্তই গৌণ। কিন্তু, আজকাল বিপরীত অবস্থা। টাকা কড়ি না হলে কিছুতেই কিছু হয় না। তাই এখন সবকিছু লৌকিক। এ জন্য ঈদ আনন্দ ও আজকাল টাকা পয়সা নির্ভর। যার টাকা আছে তার ঈদ আর যার টাকাকড়ি নেই তার আবার ঈদ কিসের?
 
ঈদের দিন সেই সাত সকালে ওঠে গোসল করা, শীতকাল হলে খড়ের ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে আগুন পোহানো, দল বেঁধে ঈদের জামাতে যাওয়া ইত্যাদি ছিল আনন্দ উচ্ছাসের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আজকাল?
 
নতুন জামা কাপড়, ভাল খাবার দাবার, দূরে অজানা কোথাও পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়ানো, আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো, আলোক সজ্জা ইত্যাদি ঈদ আনন্দের সার্বজনীন রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাতে খরচ পড়ে অনেক টাকা।
 
এমপিও শিক্ষকগণ এবার সর্বশেষ মে মাসের বেতন পেয়েছেন। জুলাই মাসে ঈদ। ঈদের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। এখনো তাঁদের জুন মাসের বেতনের কোন খবর নেই। এদিকে ঈদ বোনাসের ও কোন পাত্তা নেই। নাম মাত্র যে বোনাসটি তাঁরা পান, তা ও ঈদের এক সপ্তাহ পর না হলে তাঁরা পাবেন না। তাহলে কী দিয়ে ঈদ করবেন তাঁরা?
 
সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন কিংবা নিজের জন্য এবারের ঈদে অনেক এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী কোন নতুন জামা কাপড় কিনতে পারেন নাই। অবুঝ সন্তান কিংবা ছোট ভাইবোনদের নতুন জামার আব্দার রক্ষা করতে না পারার বেদনাটুকু বুকে চেপে অনেকে এবারের ঈদ পালন করবেন। সে ঈদ কতটুকু আনন্দের হবে? ঈদে স্ত্রী-সন্তানের পছন্দের কোন জায়গায় তাদের নিয়ে বেড়াতে যেতে না পারার কষ্টটা একমাত্র ভোক্তভোগী ছাড়া বুঝার সাধ্যি কার? ঈদ উৎসবে গরীব-দুঃখীদের মাঝে টাকা পয়সা বিলিয়ে দেবার ধর্মীয় রেওয়াজ। ইচ্ছে থাকলে ও তা করতে পারছেন না অনেকে। ভাল খাবার দাবারের আয়োজন কিংবা বন্ধু বান্ধবদের দাওয়াত করার ইচ্ছেটুকু ও অনেকের মনে পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 
আমাদের দেশ অনেক এগিয়েছে। শুধু কপাল ফেরছে না এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের। 'ঈদ মোবারক' ও 'ঈদের শুভেচ্ছা' সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে হাটবাজার ও শহরের অলিগলি ছেয়ে গেছে। কোথাও কোথাও গ্রাম্য বাজার এবংরাস্তাঘাটের মোড়ে ও শোভা পায় এ জাতীয় ব্যানার ও ফ্যাস্টুন। এ আরেক সাম্প্রতিক ঈদ সংস্কৃতি। মোবাইলে, ফেইসবুকে কেবল ঈদের অগ্রীম শুভেচ্ছা বার্তা। আগের দিনের সে ঈদ কার্ড আজকাল আর খুব একটা চোখে পড়ে না।
 
ইতিমধ্যে ঘরে ঘরে ঈদ আনন্দ বইতে শুরু করেছে। গ্রামীণ হাটবাজারে পর্যন্ত গভীর রাত অবধি নানা শ্রেণি পেশার মানুষের কেনাকাটা চলছে। ঈদ উচ্ছাসে ভেসে যাচ্ছে পুরো দেশ। কেবল সে উচ্ছাস নেই এ দেশের কয়েক লক্ষ এমপিও শিক্ষক-শিক্ষক কর্মচারী ও তাদের পরিবার পরিজনদের মধ্যে। আর্থিক টানাপোড়নে এ সকল পরিবারে ঈদ বরাবর হারিয়ে ফেলে তার সার্বজনীন স্বকীয়তা। এ লজ্জা কার? মানুষ ও জাতি গড়ার কারিগরগণ আর কতো হেয় হবেন সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের কাছে? ঈদে আনন্দের চেয়ে ব্যথায় জর্জরিত হবার দিন কবে শেষ হবে?
 
এবারের ঈদই যেন এমপিও শিক্ষকদের দুর্গতির শেষ ঈদ হয়। আর যেন কোনো ঈদে তাঁরা বেদনার শিকার না হন। ঈদের কষ্টসহ অন্য সকল বৈষম্যের হাত থেকে বাঁচাতে তাঁদের চাকুরী জাতীয়করণের বিকল্প কোন পথ নেই।এ মাত্র একটা কাজে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে এটিই করা অপরিহার্য।
 
লেখক : অধ্যক্ষ , চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।
alimuzammil45@gmail.com
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close