সোমবার,  ২৩ এপ্রিল ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৬, ১৪:৫৪:৫৩

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বোনাস ও ঈদ আনন্দ কফিনে

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী

দেশে শিক্ষার বেহাল দশা আজ। শিক্ষার স্তর পুনর্বিন্যাসে স্পষ্ট হ-য-ব-র-ল দৃশ্যমান। পিইসি আছে, পিইসি নেই! সকালে এক কথা তো বিকেলে আরেক। মাননীয় মন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার কথায় বেমিল। কী হবে আমাদের দেশ ও জাতির?

যা হবার তাই হবে এবং হচ্ছেও। তাতে কারো কিছু যায় আসে না। আসলে মাথা না থাকলে মাথা ব্যথার প্রশ্ন থাকবে কেন?

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষক জাতির কারিগর। সে অনেক পুরনো কথা। কিন্তু, শিক্ষা ও শিক্ষকের সম্পর্ক নিয়ে কারো কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। জাতি বাঁচাতে শিক্ষার প্রয়োজন আর শিক্ষা বাঁচাতে শিক্ষক অপরিহার্য। কিন্তু, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক যেনো শিক্ষায় এক অবাঞ্চিত উৎপাত! তা না হলে এ দেশে শিক্ষকদের এতো অবজ্ঞা ও অবহেলা কেন?

কোনো জাতিকে মেরে ফেলতে চাইলে আগে তার শিক্ষাকে ধ্বংস করতে হবে। আর শিক্ষাকে ধ্বংস করতে শিক্ষককে মেরে ফেলা ছাড়া উপায় নেই। শিক্ষককে হাতে কতোইবা মারা যায়? তবে, জায়গায় জায়গায় ইদানিং শিক্ষক নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলেছে। তদুপরি ভাতে মারা আর কী!

দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতি আমাদের হীন মনোভাব কী কখনো দূর হবে না? যতো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এদের প্রতি! অথচ এরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন এ দেশের শিক্ষা ও শিক্ষার গতিধারা। জাতীয় যে কোন কাজে তাদের ডাক পড়ে সবার আগে। সমাজ ব্যবস্থাপনা ও সমাজকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে তারাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সারা দেশের মাত্র চারশ'-সাড়ে চারশ' সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক গোটা দেশের শিক্ষকদের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ মাত্র। কেবল তাদের দিয়ে কী হবে? দেশের ৯৭% শিক্ষকদের সাথে সতীনের ছেলের মতো আচরণ করে শিক্ষার মানোন্নয়ন কতখানি সম্ভব? এরা অনাহারে, অর্ধাহারে থেকে এমনকি ঈদ-পুজায় আনন্দ থেকে বঞ্চিত থেকেও আমাদের শিক্ষাকে যতটুকু সম্ভব বাঁচিয়ে রেখেছেন।

তারপরও তাদের প্রতি আমরা বড্ড বেশী বেরসিক। তাদের নিয়ে আমাদের তামাশা আর তাচ্ছিল্যের এতটুকু কমতি নেই। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তাদের নতুন স্কেলটা আমরা দিয়েছি বটে, কিন্তু স্কেল দেবার জ্বালা আর আমাদের হীনমন্যতা আজো কাটিয়ে ওঠতে পারছি না।

আমরা তাদের বৈশাখী ভাতা থেকে বঞ্চিত রেখে তৃপ্তির ডেকুর তুলছি। তাদের তো এ ভাতা থেকে বাদ দেবার কোন যুক্তি কিংবা সুযোগ নেই। ঠিকই একদিন সেটি তাদের দিতে হবে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আবার জানি কোন খেলা শুরু করতে হয়? সামনে জুলাই মাসের বেতন হবে। তাই, মাথায় এখন সেটি। আসলে কেন জানি, আমাদের এমপিও শিক্ষকরা খুব নিরীহ প্রকৃতির এবং বড় বেশী ভদ্র টাইপের। তাই, তাদের নিয়ে খেলতে মজা!

ঈদ বোনাস শতভাগ দেবার তাদের দাবি নিঃসন্দেহে যুক্তিসঙ্গত। তারা ভেবেছিলেন, এবার তারা পূর্ণাঙ্গ বোনাস পাবেন। তারা বহুভাবে পূর্ণাঙ্গ বোনাস পাবার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, তাদের কর্তৃপক্ষ যেন চোখেও দেখে না, কানেও শোনে না। তাই 'যেই লাউ, সেই কদু'। আগের মতো সিকি আনা বোনাস। হায় রে মানবতা!

এদিকে বোনাস ঈদের পরে পাওয়া আর না পাওয়ার মধ্যে তো কোনো তফাত নেই। তাদের জন্য নতুন স্কেলে ঈদ বোনাস দেবার সিদ্ধান্তটি ইচ্ছে করেই একান্ত অন্তিম সময়ে নেয়া হলো। কিন্তু, জানি না সারা দেশের কোথাও কোন এমপিও প্রতিষ্ঠান ঈদের বন্ধের আগের দিন পর্যন্ত বোনাস বিল ব্যাংকে জমা দিতে পেরেছে কি না? বোনাস হাতে পাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ঈদ। ব্যাংক খুলবে দ্বিতীয় সপ্তাহে। বোনাস বিল ব্যাংকে যাবে তখন। ততোদিনে ঈদ অনেক পুরনো হয়ে যাবে। তখন কী হবে এ বোনাস দিয়ে?

এমপিও শিক্ষকদের সাথে এভাবে 'ইয়ার্কি' না করলে কী চলে না? আমাদের জাতিকে মেরে ফেলার কোনো এজেন্ডা কেউ বাস্তবায়ন করছে কী না, কে জানে? না হলে শিক্ষকদের প্রতি এ অবিচার কেন?

দেশে শিক্ষা ও শিক্ষকদের বড়ই দুর্দিন যাচ্ছে। শিক্ষকদের না বাঁচাতে পারলে আমাদের শিক্ষা কিছুতেই বাঁচবে না। তাই আসুন, আমাদের শিক্ষা বাঁচানোর জন্য শিক্ষকদের বাঁচানোর কাজটা আগে করি।

মাঝে ক'বছর দু'একদিন হলেও ঈদের আগে এমপিও শিক্ষকরা বোনাসটা (সিকি বোনাস!) হাতে পেয়েছেন। শুরুতে অবশ্য এবারের ন্যায় ঈদের পরে পেতেন। আসলে যারা ছাড় দেয়, এমপিও শিক্ষকদের কিছু দিতে এদের বড় গা জ্বালা করে। এরা চায় না এমপিও শিক্ষকরা খেয়ে পরে ভাল ভাবে বাঁচুন।

এমপিও শিক্ষকদের এবারের ঈদ বোনাস ও ঈদ আনন্দকে কফিনে পুরে দেয়া হলো। যারা এসব করছে, তাদের হাতে হয়তো একদিন আমাদের জাতিরই কবর রচিত হবে। এরা একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের প্রেতাত্মা কী-না, কে জানে?

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।

এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close