শুক্রবার,  ১৯ জানুয়ারি ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৬, ১২:১৯:২১

শিক্ষার বৈষম্য কবে দূর হবে?

জয়নাল আবদিন

গত ১২ মে মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার পাতায় আর টেলিভিশনের পর্দায় শহরের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের আনন্দ-উল্লাস আর 'ভি' চিহ্ন দেখে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত। আমাদের এসব মেধাবী সন্তান আগামীতে দেশ ও জাতির কাণ্ডারি হবেন। এমন প্রত্যাশা আমরা সবাই করি। এবার মোট পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও গত বছরের থেকে ঊর্ধ্বমুখী।

কিন্তু দুঃখ হচ্ছে, এমনতর আনন্দ-উচ্ছ্বাস, ভালো ফলাফলের সুনাম-সুখ্যাতি প্রতি বছরই নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, আর তা শহরেই সীমাবদ্ধ। গ্রামবাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর সন্তানদের এ আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছুঁতে পারছে না। তারা হাজারও চেষ্টা করে এ আনন্দের দেখা পাচ্ছে না। দেশের শিক্ষা যে বিকিকিনির পণ্য হয়ে গেছে, সেই দামি পণ্য কেনার সামর্থ্য গ্রামবাংলার মানুষের নেই।

এবার এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মফস্বলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে। এ বছর মোটেই পাস না করা ৫৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সব ক'টিই অজপাড়াগাঁয়ের, এর মধ্য ৩৭টি মাদ্রাসা এবং বাকিগুলো মাধ্যমিক স্কুল। মফস্বলের লেখাপড়ার খরচ বহন করতে না পারার কারণে ছেলেমেয়েদের বেশির ভাগই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। শিশুশ্রমিক আর গৃহকর্মী নতুবা কিশোরী পোশাক শ্রমিকের কাজে বাধ্য হয়।

এমনিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুটি চেহারা। ধনী মানুষের সন্তান-সন্ততির জন্য প্রাইভেট স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, মেধা আর শিক্ষা উপকরণের সবই তাদের জন্য সহজলভ্য। কোচিং, গৃহশিক্ষক, দামি পোশাক-পরিচ্ছদ, পুষ্টিকর খাওয়ার ভাগ্যলক্ষ্মী দুই হাত উজাড় করে তাদের দিয়েছে। এত সব অবারিত সুযোগ-সুবিধা সবই শহরে; গ্রামে এসবের কিছুই নেই। গ্রামে গরিব মানুষের বসবাস, শিক্ষার এসব দামি দামি উপকরণ কেনার সামর্থ্য তাদের কোথায়।

তবে শহরেও একশ্রেণির মানুষের সন্তানরা শিক্ষাবঞ্চিত হয়, তা না হলে ৮-১০ বছর বয়সের ছেলেদের টেম্পোচালক, হেলপার, হোটেল-রেস্টুরেন্টে বয়-বেয়ারা হিসেবে দেখি কীভাবে? গ্রামত্যাগী কিছু শ্রমিক শ্রেণির শহুরে মানুষ আর স্বল্প আয়ের মানুষরা কোনোরকমে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। সেটা বিদ্যা বিকিকিনির বাজারে খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। আমাদের সোনার বাংলা বিদ্যা ক্রয়-বিক্রয়ের যে ওপেন হাটবাজার চালু করেছে, সেখান থেকে বিদ্যা কিনতে ওই মানুষগুলোর সামর্থ্য নেই। বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে, রিকশা চালিয়ে, কুলি-মজুরের কাজ করে, বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া হয়তো চালিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু পাঁচটা কোচিং, চারটা গৃহশিক্ষক রেখে ছেলেমেয়েদের পড়ানোর কপাল তাদের নেই।

শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার যা সংবিধান স্বীকৃত। মৌলিক অধিকার মানেই তো সেই অধিকার দেশের সব নাগরিক একই ধরনের সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ভোগ করতে পারবেন। অর্থবিত্ত থাকলে আপনি মৌলিক অধিকার কিনে ইচ্ছেমতো ভোগ করতে পারবেন। রাষ্ট্র সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না। মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা থেকে আমাদের দেশ অনেক আগেই সরে এসেছে। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বহু রকমের বৈষম্যের শিকার। যার ফলে আমাদের জাতীয় মানস গঠন অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছে এবং উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সংবাদপত্রের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে মফস্বলের শিক্ষা পিছিয়ে পড়ার যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে সে কারণগুলো তো বহু পুরনো। গ্রাম অঞ্চলের বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই গ্রামের মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টায় তাদের শ্রম, ঘাম আর অর্থে প্রতিষ্ঠিত। সরকার পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, এমপিওভুক্তিসহ অবকাঠামগত কিছু উন্নয়ন করলেও শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের যে ধরনের মনোযোগ থাকে, গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি তেমন মনোযোগ দেখা যায় না।

এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, 'মাউশির' সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে সরকারি স্কুলে ১ হাজার ৭০৩ সহকারি শিক্ষকের পদ শূন্য। শূন্য থাকা পদগুলোর প্রায় সবই মফস্বলের বিদ্যালয়গুলোর। ১২ জুন একটি দৈনিকের খবরে প্রকাশিত হয়েছে, শরীয়তপুর জেলার ২৮ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই। প্রেষণে আসা দু-একজন শিক্ষক আর স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক দিয়ে চলছে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। বিপরীতে ঢাকার বিদ্যালয়গুলোতে কোনো পদ শূন্য নেই। মফস্বলের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রায় ৯৭ ভাগই বেসরকারি, মাত্র ৩ ভাগ সরকারি।

মফস্বলের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো যে কত রকমের সমস্যায় জর্জরিত তা সরকার হয় উপলব্ধি করে না অথবা দেখেও না দেখার ভান করে। শিক্ষক সংকট, যোগ্য শিক্ষকের অভাব, স্কুল ঘরের চাল নেই, বসার টেবিল নেই, ভাঙা বেড়া, ঝুঁকিপূর্ণ ছাদ আর খোলা আকাশের নিচে পাঠদান চলে। এসব চিত্র মফস্বল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় আমরা হরহামেশাই দেখতে পাই।

আমরা কথার ফুলঝুরিতে শুধু শহর-গ্রামের ব্যবধান ঘোচাই, বাস্তবের চিত্র 'কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন'। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সরকারের সদিচ্ছা না থাকায় বছরের পর বছর শিক্ষক সংকট কাটে না। বিজ্ঞানের শিক্ষক মানবিকের ক্লাস নিচ্ছেন, গণিতের শিক্ষক বিজ্ঞানের ছাত্রকে পড়াচ্ছেন। আইটি শিক্ষকের অনুমোদন হয় না, দেন-দরবারের পর অনুমোদন হলেও এমপিও হয় না বছরের পর বছর। এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষকদের আন্দোলন, প্রেস ক্লাবের সামনে আইটি শিক্ষকদের আমরণ অনশন, এসব কী? মফস্বলের শিক্ষকদের আর্থিক দুরবস্থার বর্ণনা করতে গেলে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। মফস্বলের একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক যে বেতন-ভাতা পান, তাতে কি এ প্রতিযোগিতার বাজারে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভদ্রভাবে জীবনযাপন সম্ভব?

শহরের শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা সে তুলনায় অঢেল। সরকারি বেতনের সব অংশ ছাড়াও স্কুল থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি বেতনের সুযোগ রয়েছে তাদের। কোচিংয়ে পড়ানো, বাসায় পড়ানো সব মিলিয়ে লাখ টাকার ওপর আয়-রোজগার। মফস্বলের একজন শিক্ষক বিদ্যালয় থেকে ১ থেকে ২ হাজার টাকার বেশি বেতন পান না। অনেক স্কুল তো নিজস্ব তহবিল থেকে কোনো বেতনই দিতে পারে না। কোচিং, টিউশনি এসবের সুযোগ একেবারেই সীমিত। অর্থাভাবে গ্রামের অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের গৃহশিক্ষক দিতে পারে না, কোচিং করাতে পারেন না। বেশির ভাগ অভিভাবকের পক্ষে তো জামা-কাপড় আর শিক্ষার আনুষঙ্গিক খরচ মিটিয়ে সন্তানকে স্কুল-কলেজে পাঠানোই কষ্টের হয়ে যায়। সরকার শিক্ষার উন্নয়নে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেসবের সিংহভাগই শহরকেন্দ্রিক।

ওপরে যা উল্লেখ করা হল, তা শুধু শহর আর গ্রামে শিক্ষার অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিত্তবান আর গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদের অর্থনৈতিক কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাভোগের ছিটেফোঁটা তুলনামূলক চিত্র মাত্র। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মারাত্মক সংকট হচ্ছে, বহু মতবাদে বিভাজিত শিক্ষার অবাধ প্রসার।

প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই আমাদের ছেলেমেয়েদের ভিন্ন ভিন্ন ভাবধারার চেতনাকে আত্মস্থ করে অগ্রসর হতে হচ্ছে। সরকার পরিচালিত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্মীয় বা মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা, সরকার নিয়ন্ত্রিত বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা, বেসরকারি বা ব্যক্তিবিশেষের উদ্যোগে সাধারণ শিক্ষা, বিশেষায়িত ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা- এভাবে শিক্ষা বহুধাবিভক্ত হয়ে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব বৈষম্য, সংকট আর জগাখিচুড়ি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে আমাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

লেখক: আইনজীবী।

এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close