রোববার,  ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৬, ১৪:৪৬:৫৬

ভর্তির জন্য ‘ভালো প্রতিষ্ঠান’ ৫ অগ্রাধিকার

কাজী ফারুক আহমেদ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় কার প্রাধান্য থাকবে তা নিয়ে বিভিন্নমুখী আলোচনা ও বিতর্ক অব্যাহত থাকা অবস্থায় এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের ভর্তি জটিলতা-বিড়ম্বনার বিষয়টি এখন শিক্ষাসংক্রান্ত আলোচনার বেশির ভাগ জুড়ে আছে। এর সঙ্গে অপরিহার্যভাবে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থী ও তার মা-বাবার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারলে কারও কারও বেলায় যা সম্প্রসারিত হবে হতাশায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা স্ফীতির সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার একান্ত ইচ্ছা, সেই সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিস্তৃতি স্বাধীনতা-পরবর্তী কয়েক দশক ধরে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু এর প্রতিবিধানে কার্যত কোনো উদ্যোগ দৃষ্টিগোচর নয়। এ গৌরচন্দিকা দিয়েই আমার আজকের লেখা।
 
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিসংখ্যানে জানা যায়, ঢাকার কলেজগুলোর মধ্যে ‘ভালো মানের’ কলেজ হিসেবে পরিচিত নটর ডেম কলেজে ২ হাজার ১৪, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৯৯০, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৬৫০, ঢাকা কলেজে ১ হাজার ১০০, হলিক্রস কলেজে ৪৯০, ঢাকা কমার্স কলেজে ৯০০, সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ৪৭৫, বদরুন্নেছা কলেজে ৮২০, ঢাকা সিটি কলেজে ১ হাজার ১৮০, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ৪৫৫ আসন আছে। এছাড়া লালমাটিয়া গার্লস কলেজে ৬১৫, মতিঝিল মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে ৪৩২, ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে ৩৭০, বিএএফ শাহীন কলেজে ৬০৬, তেজগাঁও কলেজে ৪০২, শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজে ১৯৯, রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫৬৫, অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৯৮, সরকারি গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ১৪০, নবকুমার ইন্সটিটিউশনে ১০০, এসওএস হারম্যান মেইনার স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১০৩, সরকারি বাঙলা কলেজে ৯৭২, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় ইউনিভার্সিটি কলেজে ২০৭, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০৯, সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩৪, নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজে ২১৪, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৬০, সিদ্ধেশ্বরী কলেজে ৬৭১, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে ৬৫১, শেরেবাংলা বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩০৯, সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে ১ হাজার ৪৮৫, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজে ৫১৪টি আসন রয়েছে। বলা বাহুল্য, এসব তথ্য ডিগ্রি কলেজ, ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে উন্নীত স্কুল-কাম-কলেজ হিসেবে পরিচিত ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। উল্লেখ্য, দেশে সরকারি-বেসরকারি ৯ হাজার ৮৫টি কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাদশে ভর্তিতে এবার ২১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ১৩ লাখ ১ হাজার ৯৯ জন। উত্তীর্ণ হয়েও আবেদন করেনি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৬ শিক্ষার্থী। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আবেদন না করলেও এসব শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাবে। আর শিক্ষামন্ত্রীর মতে কলেজে এ বছর ৭ লাখ আসন ফাঁকা থাকবে। এদিকে দেশের ৪৮টি কলেজে কোনো আবেদনই করেনি ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থী। আর ৬৯৪টি কলেজে আবেদন করেছে মাত্র ২০ জন বা তার কম শিক্ষার্থী। এ কলেজগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। এগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি বোর্ড সূত্রে। তারা শুধু সংখ্যাই প্রকাশ করেছে। আন্তঃবোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রকাশিত মেধাতালিকায় ভর্তি শেষ হওয়ার পর ২৮ জুন থেকে ভর্তি উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। যেখানেই আসন খালি থাকবে সেখানেই ভর্তি হতে পারবে শিক্ষার্থীরা। তিনি বলেন, ভর্তি নিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের হতাশা বা দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তবে কাক্সিক্ষত কলেজে ভর্তির প্রসঙ্গ ভিন্ন।
 
ভালো প্রতিষ্ঠান কতটুকু ভালো
এবার এসএসসিতে সব বোর্ড মিলে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬১ জন। এর মধ্যে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৬ হাজার ৭৬৯ জন। আর ঢাকা বোর্ডে সর্বাধিক জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৩৩ জন। রাজশাহী বোর্ডে পেয়েছে ১৭ হাজার ৫৯৪ জন। সবচেয়ে কম জিপিএ-৫ পেয়েছে বরিশাল বোর্ডে- মাত্র ৩ হাজার ১১৩ জন। সব বোর্ডের জিপিএ-৫প্রাপ্তরা সবাই নিজ বোর্ডের বাইরেও ভালো কলেজের জন্য আবেদন করেছে।
 
জিপিএ-৫নির্ভর পাঠদান ও ফলাফল অর্জন, নাকি জীবন-সংগ্রামে টিকে থাকার সক্ষমতা, উন্নত জীবিকা অর্জনের দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন পরিচালিত হয়, সে বিতর্কে না গিয়েও প্রশ্ন তোলা যায় : ভিকারুননিসা, আইডিয়াল, মনিপুরীপাড়া স্কুলের শাখা বৃদ্ধি করে কি তা অর্জন করা সম্ভব? আমরা যখন শিক্ষার মানের কথা বলি, অনেকেই ভুলে যাই, শিক্ষার মানের বেলায় পরীক্ষার ফলাফল বহুলাংশে প্রাসঙ্গিক নয়। সে বিবেচনায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, পাঠদানের পরিবেশ উন্নত করাটাই অগ্রাধিকার পেতে পারে। শিক্ষক ও শিক্ষা উন্নয়নের আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে আমি অন্তত তিন দশকের বেশি সময় ধরে বলে আসছি যে, শিক্ষাব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সক্ষম করে গড়ে তোলাটা জরুরি। এক্ষেত্রে কয়েকটি অগ্রাধিকার বিবেচনাযোগ্য : ১. এলাকাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবশ্যিক ভর্তি। ২. ইংরেজি, অংক, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের স্বল্পতা দূর করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষক বিনিময় ব্যবস্থা চালু। ৩. সব জেলা ও উপজেলা স্তরে শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ। ৪. প্রতি উপজেলা ও জেলা সদরে সরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানাগার স্থাপন করে সমন্বিত রুটিনে পালাক্রমে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ। ৫. শিক্ষক সংগঠনগুলোকে শুধু আর্থিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহ প্রদান এবং সরকারের শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে কাজ করার সুযোগ প্রদান। সরকারের পাশাপাশি তাদের উদ্যোগে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে ইংরজি, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলোয় প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য সরকার, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ সংস্থানসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান।
 
আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে একটা বড় দুর্বলতা হল, আমরা তৃণমূলের বাস্তবতা ও বিরাজিত সংকটের সমাধানে উদ্যোগী না হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক, অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতাবিবর্জিত, কল্পনানির্ভর, আলোচনা বেশি পছন্দ করি। ফলে সমস্যাকে সাদা চোখে না দেখে স্বল্পসংখ্যক চিন্তকের মনে লালিত স্বপ্নাভিলাষে বেশি গুরুত্ব দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো অগ্রাধিকার হিসেবে যথাযথ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সহায়ক হবে বলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি।
 
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ: জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য; চেয়ারম্যান, ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (আইএইচডি)
ihdbd@yahoo.com
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close