মঙ্গলবার,  ১৯ জুন ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৬, ১২:০৮:২৭

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন: শাস্তির বিধানে সমতা আনুন

সমীর রঞ্জন নাথ
জীবনের সর্বক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার কথা যখন বলা হয়, শিক্ষার মতো ব্যাপক ও গভীর বিষয় এর বাইরে থাকতে পারে না। শিক্ষা ক্ষেত্রেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন শিক্ষাসংক্রান্ত আইন। শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারিভাবে যা ঘটছে, তা অবশ্যই কোনো না কোনো আইনি কাঠামোর মধ্যেই হচ্ছে। সম্প্রতি সরকার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি সামগ্রিক শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো সংবাদ। আইনটি প্রণয়নের আগে এর খসড়া নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও তাদের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে জনমত আহ্বান করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন এর ওপর কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে, অচিরেই এটি আইন মন্ত্রণালয় হয়ে মন্ত্রিপরিষদে যাবে_ সেখান থেকে জাতীয় সংসদে। জাতীয় সংসদের অনুমোদনের পরই তা আইনে পরিণত হবে।
 
যে কোনো আইনের মতোই শিক্ষা আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনসাধারণের শিক্ষার সার্বিক চাহিদা পূরণ করা। শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তারা যেন সুশিক্ষিত হতে পারে, কর্মদক্ষ নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করা। জনশিক্ষা বিষয়ে রাষ্ট্রের যে আকাঙ্ক্ষা তার বাস্তবায়নে সহায়কের ভূমিকা রাখা। সুনাগরিক হওয়ার পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করা। আর সর্বোপরি উপর্যুক্ত বিষয়ে কেউ যেন রাষ্ট্র বা ব্যক্তিবিশেষের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়াতে পারে তার সুরক্ষা দেওয়া। আইনে আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হওয়ার পর, জনসাধারণের স্বার্থের নিরিখে সুরক্ষার বিষয়টিই যে কোনো আইনের কাছ থেকে প্রাপ্তির দিক। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন নিয়ে জনমনোযোগ আজ সেদিকেই।
 
কোনো আইনই একেবারে হাওয়া থেকে তৈরি হয় না, হওয়ার কথাও নয়। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের শুরুতে এ ধরনের একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজন কেন হলো, তা বয়ান করা হয়েছে। যে কোনো আইনেই এটি থাকে। এর মূল বিষয় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণ-সংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হলো নিরক্ষরতা দূরীকরণ, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং একই পদ্ধতির সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে দেশের বর্তমান অবস্থা হলো, বিগত দুই-আড়াই দশকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাস্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে কিন্তু কোনো স্তরেই শিক্ষার মান আশানুরূপ বাড়েনি। শিক্ষার্থীরা তাদের শ্রেণি অনুযায়ী যোগ্যতা ও দক্ষতা লাভ না করেই ওপরের শ্রেণিতে উঠছে। সমস্যার দিক হলো নিম্নমানের শিক্ষালাভ করে আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেখাতে পারছে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এর প্রধান কারণ হলো, মানসম্মত শিক্ষার জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, শিক্ষার সকল স্তরে নানা ধরনের অসমতা ও বৈষম্যের উপস্থিতি। বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষা মানুষে মানুষে মিলনের পরিবর্তে ব্যবধান তৈরিতে সহায়তা করছে। মানসম্মত শিক্ষার আয়োজন ও বৈষম্য নিরসন তাই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধানতম জনআকাঙ্ক্ষা। খসড়া আইনের মুখবন্ধে প্রথমটির উল্লেখ থাকলেও দ্বিতীয়টি নেই। উভয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে তার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ধারা-উপধারা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
 
সকল স্তরের শিক্ষার মান নিয়ে একাধিক গবেষণা এরই মধ্যে রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য-উপাত্ত যা আছে, তা থেকে বৈষম্য ও অসমতার গভীরতা সম্পর্কে জানাও কঠিন কাজ নয়। এসব বিবেচনায় নিয়ে কত সময়ের মধ্যে শিক্ষার কোন স্তরে কী ধরনের মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করা হবে কিংবা কতটুকু অসমতা দূর করা হবে, তার একটা বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা শিক্ষা আইনে থাকা দরকার। এই অর্জনে কার কী ভূমিকা থাকবে এবং এ ভূমিকা পালন না করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি-না বা অপরাধীকে কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তাও আইনে লিপিবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই, সুসংবদ্ধ বিদ্যালয় ব্যবস্থা, সৃজনশীল শিক্ষকমণ্ডলী, প্রাণচঞ্চল শ্রেণিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থী মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা। খসড়া আইনে কোন কাজটি কে করবে তা বলা আছে, কিন্তু তিনি বা তারা অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি-না অথবা এর জন্য কোনো ধরনের শাস্তি পেতে হবে কি-না সবক্ষেত্রে তার উল্লেখ নেই।
 
আমাদের দেশে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবইয়ের দুর্বল মান নিয়ে শিক্ষাবিদরা প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন। তারা এগুলোকে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। আইনগত কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আজ পর্যন্ত এ জন্য কাউকে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। দুর্বল মানের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবইয়ের কারণে প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, সার্বিকভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। যে শিক্ষা আইনটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে যদি এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া না হয়, তবে আইনের সুফল থেকে তারা বঞ্চিত হবে। অথবা বলা যায়, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ উপেক্ষা করে আইনটি প্রণীত হতে যাচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষাসংক্রান্ত উপর্যুক্ত প্রতিটি বিষয়েই একই কথা প্রযোজ্য। শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনোভাবেই মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়।
 
আইনের ভাষা ও নীতির ভাষা সাধারণত একই রকম হয় না, কিন্তু খসড়া শিক্ষা আইনে অনেক ক্ষেত্রেই নীতি প্রণয়নের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণত নীতির ভাষা হয় নমনীয়, কিছুটা বিস্তৃত আর আইনের ভাষা সুনির্দিষ্ট। খসড়া শিক্ষা আইনের বেশিরভাগ বাক্যই ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় গঠিত। এতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। বিধানগুলো বর্তমান অনুজ্ঞায় হওয়া উচিত এবং আইন পাসের দিন থেকেই কার্যকর হওয়া বাঞ্ছনীয়। আইনটি যথাসম্ভব স্বকীয় হওয়া উচিত; নতুন বিধি প্রণয়নের মুখাপেক্ষী নয়। যদি করতেই হয় তবে আইনেই সরকারকে বিধি প্রণয়নের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত।
 
আইনের খসড়ায় কোনো ধারা বা উপধারা পালন না করলে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে আবার কোনোটির ক্ষেত্রে নয়। এটি হতে পারে না। আইনের যে ধারা পালন না করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না বা শাস্তির বিধান থাকবে না, তা আইনের বিষয় হতে পারে না। আইন বলতে তা অবশ্য পালনীয়ই বোঝায়। ধারা বা উপধারাটি যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তাক না কেন, তা পালনে অপারগ হলে তাকে অবশ্যই আইনের মুখোমুখি করা বাঞ্ছনীয়। শাস্তির বিধান ধারাভেদে বিভিন্ন হতেই পারে। খসড়া শিক্ষা আইনের ২২ নম্বর ধারার সাত নম্বর উপধারাটি দেশি মাধ্যমের ইংরেজি ভার্সন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতন ও ফি সংক্রান্ত আর আট নম্বর ধারাটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের বেতন ও ফি সংক্রান্ত। আইনে প্রথম উপধারা লঙ্ঘন করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে নয়। এটি বৈষম্যমূলক।
 
শিশুর বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও মানসম্মত শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইনের ছয় নম্বর ধারাটি 'নিরাপদ ও শিশুবান্ধব শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ' সংক্রান্ত। এতে কেবল নিরাপদ ও শিশুবান্ধব শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ বলতে কী বোঝায় তার বর্ণনা রয়েছে। কোনো বিদ্যালয় বা শিক্ষা ব্যবস্থা যদি এই বিধান না মানে তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি-না বা তার শাস্তিইবা কী হবে সে সম্পর্কে খসড়া আইনে কিছু বলা নেই। আবার দেখা গেছে, বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক ও অন্যান্য লোকজনের কর্মকাণ্ডকেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে; উপজেলা থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বা অফিসের কর্মকাণ্ড নয়। এসব ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। শিক্ষা আইন থেকে এ ধরনের দ্বিমুখী বিধান পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।
 
আইন যদি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মকুশলীদের সমান চোখে না দেখে, তাহলে এর বাস্তবায়নে সমতার প্রত্যাশা করা যায় না। আর তা যদি করা না যায়, তবে এই আইন প্রণয়ন করার কোনো অর্থ হয় না। শিক্ষার্থীর স্বার্থ সমুন্নত রেখে আইনে অপরাধ নির্ণয় ও শাস্তির বিধানে সমতা রক্ষা করা হলেই কেবল শিক্ষা আইনটি তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে।
 
লেখক: সমীর রঞ্জন নাথ
কর্মসূচি প্রধান,
শিক্ষা গবেষণা ইউনিট গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ, ব্র্যাক
nath.sr@brac.net
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close