মঙ্গলবার,  ১৭ জুলাই ২০১৮  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৬, ১৫:৫৭:৫২

শিক্ষকের কাজ ও শিক্ষার্থীর দায়

গোলাম কবির
একসময় শিক্ষা লাভের জন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। উৎসাহী মানুষ নিজের গরজে শিক্ষা লাভের পথ খুঁজে নিয়েছে। ইতিহাস বলছে, অতীত ভারতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগুরুর গৃহে গিয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করে আসত। অভিজাত ও সামন্তদের সন্তান শিক্ষা লাভের জন্য আসত দরিদ্র শিক্ষকের পর্ণকুটিরে। থাকা-খাওয়া ও শিক্ষা উপকরণ জোগান দিতেন শিক্ষক। বিনিময়ে কিছু নিতেন না। তাতে তাঁদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেত। কারণ শিক্ষকতা তাঁদের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন ছিল না। জীবিকা নির্বাহের কাজের ফাঁকে মহানব্রত নিয়ে শিক্ষাদানে নিমগ্ন হতেন।
 
গ্রিক সভ্যতার অভ্যুদয়ের যুগে গুরুকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রাধান্য ছিল। আমরা জানি, সক্রেটিস-এরিস্টটলরা ছিলেন গুরুশিক্ষক। ইসলামের আবির্ভাবের পর বাগদাদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তনের আগে গুরুগৃহে শিক্ষা লাভ করত শিক্ষার্থীরা। হজরত ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর ছাত্র ছিলেন হজরত ইমাম আবু ইউসুফ (র)। লেখা বাহুল্য, গৃহেই শিক্ষা দান করা হতো তখন। নানা দেশে বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষা লাভের এই যে তত্পরতা, তা আমরা অনেক পেছনে রেখে এসেছি। তখন শিক্ষা ছিল জ্ঞান আহরণ এবং গুরুর কাজ জ্ঞানদান। এখন অভিধাটি পরিবর্তিত হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা নিরঙ্কুশ জ্ঞান লাভের জন্য শিক্ষাগুরুর শরণে যায় না। উদ্দেশ্য, প্রতিপত্তি অর্জন।
 
এ সত্য অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের জটিল বিষয়গুলো সরল করে দেওয়াই শিক্ষাগুরুর একমাত্র কাজ নয়। জ্ঞানভারে অবনত ও মন্ত্রদাতার মতো সঠিক দিকদর্শন দিয়ে শিক্ষার্থীকে উজ্জীবিত করবেন শিক্ষক। যাকে আমরা শিক্ষাগুরুর স্বপ্ন বপন বলতে চেয়েছি। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিক্ষার্থীরা যেন আকাঙ্ক্ষা বড় করে। কেননা আকাঙ্ক্ষা বড় না হলে লক্ষ্যের শিখরে উপনীত হওয়া কঠিন। লেনিনও সংশ্লিষ্টদের স্বপ্ন দেখার উপদেশ দিতেন। সে স্বপ্ন উদ্ভট কল্পনা নয়। সুদৃঢ় সংকল্প মস্তিষ্কে ধারণ করা। শিক্ষকের কাজ সেই সংকল্পের বীজ শিক্ষার্থীর চেতনায় উপ্ত করা।
 
শিক্ষার্থীরা যদি উদ্দেশ্যহীনভাবে নানা বিষয়ের গ্রন্থের বোঝা বহন করে চলে, তবে তাদের মুল উদ্দেশ্য ঢাকা পড়ে যাবে। শিক্ষার্থীর জ্ঞানের প্রবণতা কোন পথে, শিক্ষক তা পর্যবেক্ষণ করবেন এবং সে পথ ধরিয়ে দিতে পারলে শিক্ষার্থী স্বাভাবিক গতিতে তার অধীত বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারবে।
 
কোন বিষয় আয়ত্ত করলে সহজেই অর্থকড়ির সন্ধান মিলবে, তা অভিভাবকরা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখেন। শিক্ষার্থীর সামর্থ্য কিংবা রুচির খোঁজ রাখেন না, জোর করে তার ওপর চাপিয়ে দেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর ফল ভালো হয় না।
 
শিক্ষকের কাজ জহুরির মতো। তিনি দিকনির্দেশনা দেবেন কোন শিক্ষার্থী কোন পথে অগ্রসর হবে। কাজটি নিঃসন্দেহে দুরূহ। এই দুরূহ কাজে শিক্ষককে ‘কঠিন পরিচয়’ দিতে হবে। এটা এখন আর হয়ে উঠছে না। কারণ আমরা যারা শিক্ষকতায় আসছি, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নয়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতাকে বেছে নিচ্ছি।
 
শিক্ষায় যদি মতবাদ প্রাধান্য পায়, তবে তা সর্বজনীন হয় না। মতবাদ থাকবে না তা নয়, তবে তা হবে সত্য, ন্যায় ও মানবভাগ্য উন্নয়নের মতবাদ। তাহলেই তা হবে সবার জন্য হিতকর।
 
আমাদের দেশে উনিশ শতকের আগে টোলপ্রধান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ওপর যে নির্মম আচরণ করা হতো তা ভয়াবহ। আমরা সেখান থেকে বহুদূর অগ্রসর হয়ে এসেছি। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এখন শিক্ষার্থীদের প্রতি জনক-জননীর মতো স্নেহশীল আচরণের পরামর্শ দিচ্ছে। স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীকে লালন করলে সে অভীষ্ট লক্ষ্য খুঁজে পাবে। এ দায়িত্ব প্রথমত শিক্ষকের, তারপর অভিভাবকের। মনে রাখা ভালো, বলপ্রয়োগ করে যা অর্জন করা যায় তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পক্ষান্তরে ভালোবাসা দিয়ে যা অর্জিত হয়, তার প্রভাব কালান্তরেও টিকে থাকে। এ কৌশল শিক্ষককে প্রয়োগ করতে হবে। এ গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য আগেকার দিনের শিক্ষকদের মতো আলো হাতে দ্বারে দ্বারে ফিরতে হবে, তা বলছি না। নিজের বাসায় শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করাকে আমরা কাম্য মনে করি না। শিক্ষক ব্যক্তিগত আচরণ, শিষ্টাচার, সঠিক জ্ঞান ও ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীকে জয় করবেন। ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও’ নীতিবাক্যটি শিক্ষক যত নিবিড়ভাবে শিক্ষার্থীর মনে প্রোথিত করতে পারবেন, অন্যের পক্ষে তত সহজ নয়। এ সত্য মনে রেখে আমরা শিক্ষকরা ধৈর্য ও সততাকে মূলধন হিসেবে ধারণ করে শিক্ষার্থীদের চেতনায় সত্যিকার স্মরণীয় হয়ে ওঠার স্বপ্ন বপন করতে পারি, তাহলে ব্যক্তি শিক্ষার্থীই নয়, জাতিও গর্বিত হয়ে উঠবে।
 
আমরা বলছিলাম, শিক্ষক হবেন সত্য, ন্যায় ও আদর্শের প্রতীক। না জেনে জানার ভান করা, গোঁজামিল দিয়ে শিক্ষার্থীকে বোঝানোর চেষ্টা অমার্জনীয় অপরাধ। একজন শিক্ষক সব জানবেন, এমনটি সম্ভব নয়। তবে যেটুকু পড়াবেন, তা যেন নির্ভুল হয় সেদিকে তিনি সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। শিক্ষক ভুল শেখালে শিক্ষার্থী ভুলের মধ্যে ঘুরপাক খাবে। স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না।
 
আমরা এতক্ষণ শিক্ষকের করণীয় সম্পর্কে বলছিলাম। এবার প্রাসঙ্গিক কিছু কথা বলি। লেখা বাহুল্য, শিক্ষকরাও সমাজের আর পাঁচজন মানুষের মানবিক সব অনুভূতি ধারণ করেন। তাঁরাও সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে সমাজে বাস করতে চান। এটা নিঃসন্দেহে স্বাভাবিক। তবে কিছুটা ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকবে। ব্যতিক্রম এই অর্থে যে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে সমাজে স্বতন্ত্র মর্যাদাবোধ নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এর জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় কম নয়। বাধ্য হয়ে শিক্ষকের খাতায় নাম লেখানোদের নয়, প্রকৃত শিক্ষক যেন আত্মসম্মান বজায় রেখে চলতে পারেন, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার সুদৃষ্টি দেওয়া। দুঃখের বিষয়, এখন আমাদের দেশে জাত শিক্ষকের বড় অভাব। বলা হয়ে থাকে, শিক্ষক শিক্ষক হয়েই জন্মান। গড়েপিটে শিক্ষক করা যায় না। আত্মমর্যাদাহীন ব্যক্তি শিক্ষকতার মতো মহানব্রতে সমাসীন হলে তাঁর পক্ষে স্বপ্ন বোনা কঠিন। আমরা চাই সৎ, নিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক, যাঁরা কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, সমাজকেও প্রভাবিত করবেন। তাঁরাই হবেন স্বপ্ন বোনার প্রতিভূ এবং তাঁদের সাহচর্যে শিক্ষার্থীরা হবে বলিষ্ঠ কর্মসাধনার নায়ক। এ সত্য ধারণ করতে না পারলে আমাদের মুক্তি ত্বরান্বিত হবে না।
 
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close