সোমবার,  ২১ আগস্ট ২০১৭  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২২:৩৭:২৮
ফরহাদ মজহারের সা ক্ষা ৎ কা র

‘বাঙালি জাতিবোধ ও চেতনার মধ্যে এখনো উচ্চবর্ণের হিন্দুর ধ্যানধারণাই রয়ে গিয়েছে’

রওশন আরা মুক্তা
কেমন আছেন? বছর ঘুরে আবার শুরু হলো অমর একুশে বইমেলা, জাতীয় জীবনে এই মেলার তাৎপর্য কী বলে মনে হয় আপনার?
জাতি হিসেবে আমরা কোনো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী নই, ফলে অমর একুশে বইমেলাও বিভক্ত, বিভাজিত ও নানাভাবে খণ্ডিত রূপ নিয়ে হাজির হয়। তার তাৎপর্যও সেই প্রকার খণ্ডিত ও বিভাজিত মর্মের কথাই বলে। এটা এখনো একান্তই বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের অনুষ্ঠান হয়ে রয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্য যাদের হাতে তৈরি ও বিকশিত হয়েছিল তারা প্রধানত উচ্চবর্ণের হিন্দু। তারা ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে। এটা ব্রাহ্মণ বা হিন্দুর কোনো দোষ নয়। এটা ইতিহাস। কিন্তু আপদের দিক হচ্ছে উচ্চ বর্ণের হিন্দুর সাহিত্য ও সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত জাতীয়তাবাদের চরিত্রে অর্থাৎ বাঙালি জাতিবোধ ও চেতনার মধ্যে এখনো উচ্চবর্ণের হিন্দুর ধ্যানধারণাই রয়ে গিয়েছে। ফলে বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি চর্চার মধ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনারই প্রাধান্যই। একেই আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা হিসেবে চর্চা করি। নতুন সময় ও নতুন ইতিহাস নির্মাতা হিসেবে নতুন কবি, লেখক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এটা ভাঙতে না পারলে অমর একুশে বইমেলা ধরনের জাতীয় অনুষ্ঠানের তাৎপর্যও সেটাই হবে। ভিন্ন কিছু হওয়ার কোনো ঐতিহাসিক শর্ত হাজির দেখছি না।
এটা কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?
প্রথম কাজ হচ্ছে সাহিত্য, শিল্প, ছবিওয়ালা, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠা। দেখবেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখক, কবি, নাটুয়া, থিয়েটারওয়ালা, ছবি আঁকিয়ে ভান করেন তারা সেক্যুলার অথচ তারা হাড়ে হাড়ে চরম সাম্প্রদায়িক। এটা বোঝার ছোট লিটমাস টেস্ট হচ্ছে আপনি ইসলাম নিয়ে কিম্বা মুসলমানদের পক্ষে কিছু বলুন সঙ্গে সঙ্গে তারা আপনাকে জামাতি বলে ট্যাগ দিতে শুরু করবে। আপনার কথায় যুক্তি কিম্বা তথ্য আছে কি না, তারা বিচার করে দেখবে না। একাত্তরে জামাতের ভূমিকা অবশ্যই নিন্দনীয়। সমীকরণ হচ্ছে এ রকম যে ইসলাম মানেই জামায়াত আর জামায়াত মানেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা। অতএব ইসলাম নিয়ে কিম্বা মুসলমানদের স্বার্থ নিয়ে কিছু বলার অর্থই হচ্ছে জামায়াতি হয়ে যাওয়া। এই উপমহাদেশে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা আছে। কখনো অ্যান্টিকলোনিয়াল এবং জমিদার-মহাজন জাতপাতবিরোধী কখনো কখনো  চরম সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা একাট্টা ইসলামের বিরোধিতা করে। অজ্ঞতা, মূর্খতা, ইসলামভীতি, ইসলামবিদ্বেষ, ইতিহাস না জানা ইত্যাদি নানা কারণে এটা করে। এসব কাটিয়ে উঠতে হবে। বাঙালি মুসলমানের জীবন ও জগৎ বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্য বা সংস্কৃতির বিকাশ অসম্ভব। ঢাকা বদলাচ্ছে দ্রুত। আর এক দশকের মধ্যেই তার রূপ আমরা দেখব। আমাদের কাজ হবে শ্রেণির প্রশ্নকে সব সময় সামনে রাখা; জাতপাত বিরোধিতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সব নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়ানো এবং একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য অনুকূল শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করা।
বিশেষভাবে বলি, কোনো দলের লাঠিয়াল না হওয়া। সাধারণ মানুষের ভাষা, আবেগ, স্মৃতি, জীবন ও জগৎকে দেখার সহজ-সরল পদ্ধতি আয়ত্ত করার চেষ্টা আন্তরিক জারি থাকলেই আমরা মানুষের কাছে পৌঁছে যাব।
এটা কি সম্ভব?
বাংলাদেশ বিস্তর এগিয়ে গিয়েছে। আমি নিশ্চিত, আর এক দশকের মধ্যেই ঢাকা আরও বদলাবে। একাত্তরের পর বাাঙালি জাতির বাইরে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার যেমন অস্বীকার করা হয়েছে, তেমনি এদেশের সাধারণ মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি, আবেগ, ইতিহাস ইত্যাদির প্রতিও চরম বিরূপ ভাব দেখানো হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাম্প্রদায়িক ও বিপজ্জনক চরিত্রটা এখানেই নিহিত। তার বাঙালি হওয়ার সাধনার মধ্যে কোনো অসুবিধা নেই। সেই সাধনা করতে গিয়ে সে কাকে কাকে এবং কী কী বাদ দিতে চায়, তার দ্বারাই তার সাম্প্রদায়িক মতলব ধরা পড়ে। ফলে একটা বিভাজন রয়ে গিয়েছে। এটা জাতপাত ও শ্রেণি প্রশ্নের সঙ্গে যেমন জড়িত, তেমনি একাত্তরে তো আমরা ইসলামকে পরাজিত করেছি, অতএব আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতিতে মুসলমানি কিছু থাকবে কেন?- এই ধরনের মনমানসিকতার চরম মূর্খামিও কাজ করে।
এই বিভক্তি ও বিভাজন কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখার কথা ছিল সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের। কিন্তু বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ছবির হাট, চারুকলা- অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠান কিম্বা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি ইত্যাদির আশপাশে আছে, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করে। সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্য ও বহুগামিতা এতে রুদ্ধ হয়ে রয়েছে। এগুলো সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ভাঙতে হবে।
আপনার বইমেলা নিয়ে অভিজ্ঞতা কেমন?
খারাপ নয়। কারণ, আমার বই তো বিক্রি হয়, পাঠকও মনে হয় কম নয়। তবে আমি ব্যস্ততার জন্য খুব একটা যেতে পারি না। তবে ঢাকায় থাকলে একবার-দুইবার যাওয়ার চেষ্টা করি।
বইমেলার আয়োজন নিয়ে আপনার নিজস্ব চিন্তা আছে কি কোনো?
আছে। আমি মনে করি প্রকাশকদের বই প্রচার ও বিক্রির মেলা প্রকাশকদের উদ্যোগে আলাদা করা উচিত, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বাইরে। বাংলা একাডেমির উচিত লেখক ও গুরুত্বপূর্ণ বই পরিচিত করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়া। বইয়ের ভিড়ে লেখকেরা হারিয়ে যায়। বই বিক্রির দোকানদারি করা বাংলা একাডেমির কাজ নয়। বরং তার কাজ ভালো প্রকাশকদের চিনিয়ে দেওয়া, পুরস্কৃত করা এবং সম্ভব হলে ভালো বই প্রকাশের জন্য লেখক ও প্রকাশকদের অনুদান দেওয়া। যেমন তরুণ লেখক তার পাণ্ডুলিপি জমা দিতে পারে বাংলা একাডেমিতে। বাংলা একাডেমি তা নিজে প্রকাশের দায়িত্ব নিতে হবে এমন নয়, তার উচিত লেখককে লেখা প্রকাশের জন্য অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
কোনো লেখক কিছু লেখার ধারণাপত্রও জমা দিতে পারেন। সেটা হতে পারে উপন্যাস, কবিতা, নাটক, দর্শন, অনুবাদ বা অন্য কিছু। তাকে এক থেকে তিন বছরের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা বাংলা একাডেমির কাজ।
লেখকদের নিজের কাজ পাঠকদের কাছে তুলে ধরা, কবিদের কবিতাপাঠ, বিভিন্ন বিষয়ে সমাজে যারা চিন্তাভাবনা করছে, তাদের বক্তব্য তুলে ধরা ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান বাংলা একাডেমির বিভিন্ন মঞ্চে একুশের মাসব্যাপী হতে পারে। বইয়ের বাজার না বসালে ভিড়ভাট্টা কম হবে। অর্থাৎ আমি চাই একে একটা সাহিত্য উৎসবে পরিণত করা হোক। যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীধারা, চিন্তা ও ভাবের মানুষের একটা জমজমাট ভাবের বাজার তৈরি হয়। বাংলা একাডেমি বস্তাপচা বই বিক্রির আখড়া হয়ে উঠুক, এটা আমার কাম্য নয়। বরং সাহিত্য উৎসব যেন সারা বছর বই কেনার প্রণোদনা জোগায়। শুধু এক মাসের নয়। বাংলা একাডেমি এভাবেই সাহিত্য, গবেষণা ও বই প্রকাশনাকে উৎসাহিত করতে পারে।
তরুণ কবিদের প্রতি আমার বিশেষ পক্ষপাত আছে। আমি মনে করি যারা আসলেই কবিতা রচনাকে ব্রত হিসেবে নিয়েছে, তাদের প্রতি সদয় হওয়ার দায় আছে বাংলা একাডেমির। তাদের জন্য বৃত্তি দাবি করি আমি।
বই নিয়ে আপনি কী ভাবেন? বই কি আসলে প্রোডাক্ট?
পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বই মানেই পণ্য। শুধু বই নয়, ধর্মগ্রন্থসহ সবকিছুকেই পুঁজি পণ্যে পর্যবসিত করে। সচেতন লেখককে এর সঙ্গে লড়াই করেই লিখতে হয়, যা তার লেখার শৈলী, বিষয়, উপস্থাপনার ভঙ্গি বহু কিছুকেই সজ্ঞানে-অজ্ঞানে প্রভাবিত করে। হুমায়ূন আহমেদ এই ক্ষেত্রে খুবই শিক্ষণীয় হতে পারে। বাজারের জন্য বই লিখব না বা বই প্রোডাক্ট না জাতীয় চিন্তা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রোমান্টিক সুড়সুড়ি তৈরি করে, কিন্তু শিল্প কিম্বা ব্যবসা কোনোটিরই কাজে আসে না। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা অপছন্দ হলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, রাজনীতি করুন সেটা ভিন্ন কাজ। জনপ্রিয় বইও সচেতনতার কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশে প্রোডাক্ট হিসেবে বই কিনে পড়ার মতো পাঠক আছে? লেখকেরা কি সে চাহিদা পূরণ করতে পারছেন?
না। পারছে না। তরুণদের বলি, বাজারের জন্য বা জনপ্রিয় বই লেখার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই। আমার প্রিয় বন্ধু আহমেদ ছফার সঙ্গে আমার বড় একটা সময় হুমায়ূন আহমেদকে ডিফেন্ড করতে ব্যয় হয়েছে। পাঠক পড়ে এমন বই লিখুন। বই লেখাকে জীবিকা করুন। আসলে লেখা তো জীবিকাও বটে। অস্বীকার করি কী করে! আমি গবেষক হিসেবে যা করি, সেটাও তো লেখালেখিই বটে। তাহলে লেখা সম্পর্কে রোমান্টিক ধ্যানধারণাগুলো ভেঙে ফেলা দরকার।
বছর বছর অনেক বই বের হয়, নানা ধরনের পুরস্কার আছে বইকে কেন্দ্র করে, পুরস্কার নিয়ে আপনি কী ভাবেন?
কিছুই না। কোনো মূল্য দিই না।
এবারের বইমেলায় আপনার কী কী বই আসছে?
একটা কবিতার বই আসছে : ‘তুমি ছাড়া আর কোন্ শালারে আমি কেয়ার করি’।
‘অনন্ত যুদ্ধের কালে আমি পদ্য লিখছি মেশিন গান ও বন্দুকের নলে, টমাহক ও ট্যাংকের গালে এবং সর্বোপরি বুশ ও ব্লেয়ারের পাছায়’- এই আর কি!
গত এক দশকে বাংলাদেশে বুশ-ব্লেয়ারের যেসব আন্ডা-বাচ্চা আমাকে গালিগালাজ করেছে, তাদের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি কবিদের সহবত অনুযায়ী। কুকুর কামড়ালে তো আপনি গিয়ে গিয়ে কুকুরকে কামড়াতে পারেন না, তাই না?
‘কবিতা আস্তিকতা নাস্তিকতার ধার ধারে না। সে জালিমের বিরুদ্ধে যখন জিহাদি, তখন খোদার কসম তার হাতে এসে যায় হজরত আলীর জুলফিকার। কারণ, সে তখন জগজ্জননী মা ফাতেমার সন্তান। উত্তরাধিকার সূত্রে জালিমের বিরুদ্ধে সব তরবারিতেই তার অধিকার। এমনকি নাস্তিক ও কমিউনিস্টদের খঞ্জরগুলোও উত্তরাধুনিক কালে তাদের খোদ মালিকের খোঁজ শুরু করে। তাদের আমি গ্রহণ করেছি।’- এই ধরনের কবিতা। বোধ হয় শাহবাগিদেরও ভালো লাগবে।
আমার কিছু কিছু বইয়ের প্রচ্ছদ করেছে এমন সব বাজে, সাম্প্রদায়িক ও ইসলামবিদ্বেষি হীনম্মন্য ব্যক্তি, যাদের আমি শিল্পী ভেবেছিলাম। দুঃখ রয়ে গেল প্রকাশকের ক্ষতি হবে ভেবে সেসব প্রচ্ছদ আমি এবার পাল্টাতে পারলাম না। তবে পরের সংস্করণে বুশ-ব্লেয়ারের ছানাপোনাদের চিহ্ন আমি বহন করব না।
এ ছাড়া আছে প্রবন্ধের বই : ব্যক্তি, বন্ধুত্ব ও সাহিত্য। কিছু জনপ্রিয় কবিতার বইয়ের পুনর্মুদ্রণও আছে। যেমন, কবিতার বোনের সঙ্গে আবার, অসময়ের নোট বই ইত্যাদি। বাতিঘর জগদীশ বইটি পুনর্মুদ্রণ করার কথা। কিন্তু আমি দেরি করে ফেলেছি একটি নতুন পরিশিষ্ট লিখব বলে। তবে দু-এক দিনের মধ্যে হয়ে যাবে, আশা করি।
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com

close